ছিঃ ছিঃ। ভীষণ পাজি তো! দাঁড়াও, এখনই টেলিফোন করছি।
না মাসি, না। ওসব করতে যেও না।
চারুশীলা বলল, কেন করব না? আমাদের একটা প্রেস্টিজ নেই? এত করে চিঠিপত্র দিয়ে, ষড়যন্ত্র করে তোমাকে পাঠালাম ওর কাছে, ও পাত্তা দেবে না কেন?
হয়তো পেরে উঠছেন না। চাকরি কি গায়ের জোরে হয়?
খুব হয়। ওর অনেক কানেকশন। দাঁড়াও তো।
এই বলে চারুশীলা উঠে গেল।
এই উজবুক, তুই এরকম কেন রে?
ওপাশ থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে হেমাঙ্গ বলে, কি রকম?
তুই এত গেতো, এত পাজি কেন?
দুনিয়ায় সবাই কি ভাল হয়?
ভাল না হোস, কথার দাম নেই কেন?
তোকে আবার কি কথা দিয়েছি?
তুই ওকে বলিসনি ওর জন্য চাকরির চেষ্টা করবি?
চাকরি কি ছেলের হাতের মোয়া?
হ্যাঁ, মোয়া, তুই চেষ্টা করলেই হয়ে যেত। তুই চেষ্টাই করিাসনি। আচ্ছা, একটা এত ভাল মেয়ে কম্পিউটার জানে, ভাল ছাত্রী, কী দারুণ সুন্দর স্বভাব, ওর একটা চাকরি হতে পারে না?
এগুলো কোনও কোয়ালিফিকেশন নয়। কম্পিউটার হাজার হাজার ছেলেমেয়ে জানে। চাকরির জন্য আরও কিছু শেখার দরকার ছিল।
তুই চেষ্টা করেছিস? সেরকমভাবে করিনি। তবে করলেও লাভ হত না। ওই কোয়ালিফিকেশন নিয়ে ভদ্র মাইনের চাকরি পাবে না। হয়তো
কোনও ফার্মে ঢুকিয়ে দিতে পারব, কিন্তু ওরা খাঁটিয়ে খাঁটিয়ে জান শেষ করে দেবে। যা খুশি মাইনে দেবে।
তাহলে তোর কিসের ক্ষমতা?
আমি খুব ক্ষমতাবান নাকি?
ওসব আমি শুনতে চাই না। এক মাসের মধ্যে ঝুমকির একটা চাকরি ঠিক করে দিতে হবে।
কেন, ওর হঠাৎ হল কি? এত জরুরি দরকার কেন?
দরকার আছে।
আচ্ছা, তাহলে কাল যেন অফিসে এসে দেখা করে।
কখন যাবে?
না থাক। অফিসে আসতে কষ্ট করতে হবে। তার চেয়ে বরং তোর বাড়িতে যেন আসে কাল সন্ধেবেলা। আমি তোর বাড়িতে যাবো।
উঃ, বাঁচালি! হবে তো!
তা বলতে পারি না।
এক কাজ কর না, এখনই চলে আয়। সুমকি এখানেই আছে।
এখনই!
কেন, তোর এমন কী কাজ? নিজেরই তো ফার্ম বাবা, চলে আয় না। বিকেলটা তাহলে তিনজনে মিলে কোথাও গিয়ে কাটিয়ে আসি। ডিনার সেরে ফেরা যাবে।
জ্বালালি!
আর না লক্ষ্মী ভাই আমার! আসবি?
দেখছি।
দেখছি-টেখছি নয়। আধাঘন্টার মধ্যে চলে আয়। গাড়িতে বেশী করে তেল ভরে নিস।
আচ্ছা।
বাঁচালি। থ্যাঙ্ক ইউ।
ফোনটা রেখে উজ্জ্বল মুখে চারুশীলা বলল, আসছে।
কিন্তু খবরটায় যেন ভীষণ ঘাবড়ে গেল ঝুমকি। বলল, এত ঝামেলা করতে গেলে কেন মাসি? উনি আমাকে ন্যাগিং বলে ভাববেন। চাকরির জন্য বেশি উমেদারি করা কি ভাল?
যাঃ, ওর কাছে আবার অত ফর্মালিটি কিসের? হেমাঙ্গ এমনিতে বোকা হলেও, এ নাইস ম্যান।
আমার ভাল লাগছে না মাসি।
ভাল লাগবে। দাঁড়াও, তোমার মাকে একটা ফোন করে দিই। যেতে দেরি হবে।
না মাসি, ডিনারে তোমরা যাও। আমি যাবো না।
তাই কি হয়? তিনজন না। জুটলে আনন্দই হবে না।
আমি খুব লজ্জা পাই মাসি।
অত লজ্জা কিসের? একটু স্মার্ট হও তো!
ব্যাপারটা ঝুমকির একদম ভাল লাগছিল না। কারও কাছে এভাবে চাকরির দরবার করতে তার বড় অপমান লাগছে। কিন্তু চারুমাসি একটু অবুঝ, খামখেয়ালী। মনে মনে ঝুমকি স্থির করল, হেমাঙ্গ চাকরি দিলেও সে নেবে না। বিনীতভাবে প্ৰত্যাখ্যান করে দেবে।
হেমাঙ্গর এসে পৌঁছতে ঘণ্টাখানেক লেগে গেল। এসেই বলল, আজ বেরোনো অসম্ভব। মিছিলে মিছিলে সব রাস্তা জ্যাম। গলিখুঁজি দিয়ে অতি কষ্টে এসেছি।
চারুশীলা বলল, বেরোবি না! আমি যে সাজগোজ করলাম!
তুই তো সবসময়ই সেজে থাকিস। নিষ্কর্মাদের আর কীই বা কাজ।
মারব থাপ্পড়। বাড়ির অ্যাডমিনিস্ট্রেশন নেই বুঝি?
অ্যাডমিনিষ্ট্রেশন! হাসালি। তোর সংসার তো চালায় চাকর ঠাকুররা। তাদের মোটা রোজগার আর উপরি হয়। কোথায় কোন জিনিসটা আছে তা জানিস?
চারুশীলা একটু থমকে হেসে ফেলল, বলল, জানি ঠিকই। তবে মনে থাকে না। আমি তো তোর মতো বস্তুবাদী নই।
আসল কথাটা হল প্র্যাকটিক্যাল নোস। তোর মতো বোকা সুন্দরী বড়লোক মেয়েরা হয়ও না। যাক গে, মেয়েটা কোথায়?
ওকে একটু সাজতে পাঠিয়েছি। ভিতরের ঘরে। একদম সাজতে চায় না।
সাজের দরকারই বা কী? তুই সবাইকে নিজের মতো বানাতে চাস কেন?
কিন্তু সাজেরও যে রকমফের আছে, প্রয়োজন আছে, সেটা ঝুমকি ঘরে এসে দাঁড়াতেই হঠাৎ টের পেল হেমাঙ্গ। সাজোইনি বলতে গেলে, শুধু নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়েছে। তাতেই রোগা মেয়েটা যেন ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে।
০৪৫. হেমাঙ্গর কোনও ওয়ারিশন থাকবে না
হেমাঙ্গর কোনও ওয়ারিশন থাকবে না। তার জিনিসপত্র বা টাকা পয়সা দশ ভূতে লুটেপুটে খাবে। তার মুখাগ্নি বা শ্ৰাদ্ধ হবে কি? কজন কাঁদবে তার জন্য? একজন ব্যাচেলর মারা গেলে কান্নাকাটি করার লোক পাওয়া কঠিন। তবে মরার পরের অবস্থাটা নিয়ে হেমাঙ্গ চিন্তিত নয়। বরং মরার আগেই কিছু সমস্যা ও জটিলতা দেখা দেবে। মাঝরাতে স্ট্রোক হলে ডাক্তার ডাকবে কে? বেডপ্যান এগিয়ে দেওয়ার দরকার হলে কি হবে? কিংবা মাথা ধোয়ানো? কিংবা পাশে বসে একটু আহা-উঁহু করা? সুতরাং বুড়ো বয়সটাকে হেমাঙ্গ খুব ভয় পায়। ব্যাচেলরদের খুব বেশিদিন বেঁচে না থাকাই ভাল।
আজকাল বেঁচে থাকাটাকেই সে নানা প্রশ্নে কণ্টকিত করে তুলছে! এই বেঁচে থাকাটার মানেই বা কী? অধীত বিদ্যা ভাঙিয়ে উপার্জন। খাওয়া, ঘুম, কাজ। ব্যাঙ্কে টাকা জমছে নিয়মিত, প্রত্যেকটা দিনই যেন এক ছাঁচে ঢালা। ওঠা নেই, পড়া নেই, কিছু নেই! কপাল তার এমনই যে, জীবন-সংগ্রামটা অবধি করতে হয়নি। পয়সাওলা পরিবারে জন্ম হয়েছিল, নিজেও দিব্যি পাস-টাস করে গেল, পয়সা উপাৰ্জন করতে লাগল। যারা বেঁচে থাকার লড়াই করে, প্রত্যেকটা পয়সার জন্য যাদের ঘাম ঝরাতে হয়, যারা ছাপ্পড় ফুড়ে পায় না। তাদের কাছে বোধ হয় জীবন এমন অ্যালুনি নয়। হেমাঙ্গর অনেকদিন ইচ্ছে হয়েছে একদিন সকালে ঠেলাওলা সেজে বেরিয়ে পড়ে, বা এক সপ্তাহের জন্য ট্যাক্সি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে দেখে। ছেড়া জামাকাপড় পরে মাঝে মাঝে ভিক্ষে করতেও ইচ্ছে হয় তার।
