এমনভাবে বলছি যেন প্রেমে পড়া আর জলে লাফিয়ে পড়া একই ধরনের ব্যাপার। লাফ দিয়ে পড়লেই হল!
চারুশীলা একটু হাসল, তোমরা এ-যুগের ছেলেমেয়েরা কিরকমভাবে প্রেমে পড়?
আমরা মোটেই সহজ পাত্ৰপাত্রী নই। কত টেনশন আমাদের! কেরিয়ার আছে, প্ল্যানিং আছে, তারপর অ্যাডজাস্টমেন্ট, টেম্পারামেন্ট এসব ফ্যাক্টর আছে।
দূর! অত ফ্যাকরা থাকলে কি প্রেম হয়?
হয়। তবে আবেগটা বেশী থাকে না।
প্ৰেম তো একটা আবেগাই। তোমার নেই?
আছে হয়তো। তবে বুঝতে পারি না।
তুমি এ পর্যন্ত কারও প্রেমে পড়নি?
ঝুমকি ভীষণ লজ্জা পেয়ে বলে, প্রেমে পড়তে খুব ভয় পাই। আমি পড়লেও সে হয়তো পড়বে না। আমার তো চেহারা নেই!
কী নেই?
চেহারা।
তোমার মাথা! বলে চারুশীলা হেসে ফেলে, রোগা বলে বলছ? রোগা হওয়ার জন্য কত মেয়ে কত সাধ্যসাধনা করে। তা জানো? গায়ে একটু মাংস লাগলেই তুমি তো ভীষণ সুন্দরী!
যাঃ।
তা হলে দেখবে?
কী দেখব?
আমি আজ থেকে তোমার খাওয়ার চার্ট করে রোজ তোমাকে খাওয়াবো। সাত দিনের মধ্যেই তুমি আর তোমাকে চিনতে পারবে না।
মুখটা বিষণ্ণ করে ঝুমকি বলল, আমি তো খেতেই পারি না। মায়ের সঙ্গে খাওয়া নিয়েই তো আমার রোজ ঝামেলা হয়। মা বলে আমার পাকস্থলীটা নাকি একটা হাঁসের ডিমের মতো ছোট্ট।
চারুশীলা বলে, তোমাদের বয়সী রোগা মেয়েদের তো ওইটেই ভীষণ দোষ। খেতে চাও না।
ঝুমকি মৃদু হেসে বলে, মোটাসোটা হলেও আমি মোটেই সুন্দরী হয়ে উঠবো না। আমার ফেস কাটিং ভাল নয়।
চারুশীলা হঠাৎ আনমনা হয়ে গেল। ঝুমকি সুন্দর কিনা সেই পয়েন্ট নিয়ে আর মাথা ঘামাল না। কিন্তু ঝুমকির আর একটু শুনতে ইচ্ছে করছিল। চারুশীলা বলল, আচ্ছা, তোমার কি মনে হয় না ঘটনাটা ঘটা উচিত ছিল?
কোন ঘটনা মাসি?
হেমাঙ্গ আর রশ্মির একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং। ওদের তো বেশ ভালই মানাত।
তা মানাত, একটু ধৈৰ্য ধরো, হয়েও যেতে পারে।
হবে? বলে চারুশীলা খুব হতাশা মাখানো মুখে খানিকক্ষণ বসে থেকে বলে, যদি না হয়? না হলে আমার একটা হার হয়ে গেল।
হার কেন মাসি?
মনে মনে যে আমি একটা প্ৰতিজ্ঞা করেছিলাম, আমার ওই হাঁদা ভাইটার একটা গতি করেই ছাড়বো।
এমন কিছু বয়স তো আর হয়ে যায়নি।
চারুশীলা মাথা নেড়ে বলে, বয়সটা বড় কথা নয়। আসল কথা হল অ্যাটিচুড। ও মেয়েদের ভীষণ ভয় পায় এবং অপছন্দ করে। নরম্যালি বিয়ে দেওয়া প্ৰায় অসম্ভব। কিন্তু যদি প্ৰেমে-ট্রেমে পড়ত তাহলে হয়ে যেত। রশ্মিকে দেখে আমার মনে হয়েছিল, হয়তো হয়েই যাবে। রশ্মি কিন্তু ওর ওপর একটু উইকনেসও দেখাচ্ছে।
ভালই তো মাসি। এবার তুমি একটু ধৈর্য ধরো না!
হেমাঙ্গ যে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কিছুতেই রশ্মির সঙ্গে দেখা করাতে পারছি না।
হি হি করে হেসে ফেলে বলে, তোমার যে কী সব অদ্ভুত প্রবলেম। কে কার প্রেমে পড়ছে না বলে তোমার চোখে ঘুম নেই! তুমি কিন্তু খুব অদ্ভুত।
চারুশীলা একটু লজ্জা পেয়ে বলে, ঠিকই বলেছ। আমার সব সামান্য সামান্য ব্যাপার নিয়ে অকারণে টেনশন হয়। কেন বলো তো! এটা কি কোনও নার্ভ ডিজিজ?
ডিজিজ নয়। আসলে তোমার হাতে অনেকটা ফাঁকা সময় থাকে। কিছু কাজ করতে হয় না। তাই আবোল-তাবোল ভাবনা আসে।
কী করব বলো তো!
বেরিয়ে পড়বে। খুব ঘুরে বেড়াবে। সিনেমা থিয়েটার দেখবে, গান শুনবে, এগজিবিশনে যাবে। ইচ্ছে করলে কোনও একটা ট্রেনিং ও নিতে পারো।
সিনেমা থিয়েটার আমার বেশি ভাল লাগে না। তার চেয়ে জীবনে সিনেমা বা নাটকের মতো কিছু ঘটিয়ে তুলতেই আমার বেশি ভাল লাগে। ধরে একজনের সঙ্গে আর একজনের একটা প্ৰেম ঘটিয়ে দিলাম বা বন্ধুত্ব করে দিলাম বা বিয়ে—যা হোক একটা কিছু।
ও বাবা! তুমি তো সাংঘাতিক। ঝগড়া লাগিয়ে দাও না তো!
না রে মেয়ে। আমি বুঝি ততটাই খারাপ? আচ্ছা হ্যাঁ, তোমার প্রেমে সত্যিই কেউ পড়েনি?
ঝুমকি মুচকি হেসে বলে, তুমি ঘটাতে চাও নাকি একটা?
আগে বলো, কেউ পড়েছে
না, কেউ কখনও আমার প্রেমে পড়েনি।
চিঠি দেয়নি? পিছু নেয়নি? কথা বলার চেষ্টা করেনি?
না। একদম না।
বাজে কথা। সত্যি করে বলো তো!
সত্যিই বলছি।
হতেই পারে না।
কেন হতে পারে না মাসি? পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী আছে, সবাইকেই কি প্রেমে পড়তে হবে? ওটা ছাড়া বুঝি তাদের আর কোজ নেই?
যৌবনের একটা ধর্ম আছে তো!
যৌবনের ধর্ম অনেক বড়। প্রেমটা কোনও ফ্যাক্টরই নয়।
চারুশীলা ভ্রূ কুঁচকে ঝুমকির দিকে চেয়ে বলে, তাহলে যুগটা সত্যিই খুব পাল্টে যাচ্ছে।
যাচ্ছে নয়। গেছে। তা বলে প্রেম করা লোপাট হয়নি। আছে। তবে তোমাদের আমলের মতো নেই।
তুমি তাহলে বলছি যে আমি সেকেলে হয়ে গেছি?
ঝুমকি ফের মুচকি হাসল, চেহারায় বুড়ি হওনি, কিন্তু মনে মনে বড্ড প্রবীণা হয়েছ।
দাঁড়াও, তোমার ব্যবস্থাও হচ্ছে।
রক্ষে করো। আমার এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা বাবার পাশে দাঁড়ানো।
বাবাকে নিয়ে অত ভেব না। উনি ভাল হয়ে গেছেন।
গেছেন ঠিকই, তবে আমি চাই বাবাকে একটু নিশ্চিন্ত করতে। হার্ট অ্যাটাক হওয়ার পর থেকেই বাবার একটা দুশ্চিন্তা হয়েছে, যদি, দুম করে মরে যাই তাহলে আমার পরিবারটার কী হবে! আমি একটা চাকরি পেলে মনে হয় বাবা মনের দিক থেকে একটু রিলিফ পাবে।
চারুশীলা হঠাৎ সচকিত হয়ে বলে, আচ্ছা, তোমার চাকরির চেষ্টা হেমাঙ্গরই তো করার কথা ছিল? করেনি কিছু?
ঝুমকি চাপা হাসি হেসে বলে, পারলে করতেন নিশ্চয়ই, তুমি ব্যস্ত হয়ে না।
