এখন বাড়িটাও পাল্টাতে চায় দেখে ঝুমকি একটু অবাক হয়ে বলল, কেন মাসি, এ বাড়ির ডিজাইন তো ভীষণ মডার্ন। সেকেলে বলছি কেন?
চারুশীলা চারদিকে ঘুরে ঘুরে দেখে নিতে নিতে বলল, আমার কাছে বড্ড পুরনো হয়ে গেছে। একরকম প্যাটার্ন কি রোজ দেখতে ভাল লাগে?
ঝুমকি একটু হাসল, তোমার অনেকগুলো বাড়ি থাকা উচিত ছিল। ঘুরে ঘুরে থাকতে পারতে। চারুশীলা ঝুমকির দিকে চেয়ে ভ্ৰা ওপরে তুলে বলল, আরে, ঠিক তো! এজন্যই আগের দিনের লোকেরা অনেকগুলো করে বাড়ি করত। আসুক তোমার মেসো, কথাটা বলতে হবে তো! এত এত বাড়ি তৈরি করে দিচ্ছে লোককে, নিজের কেন তবে একখানা মোটে বাড়ি?
ঝুমকি ঠাট্টা করে বলে, কটা বাড়ি চাও? গোটা দশেক?
আরে না। করপোরেশনের কী সব আইন-টাইন আছে বোধ হয়। অতগুলো করতে দেবে না।
দেবে। শুনেছি নিজেদের বাড়ি থাকলে সরকারি ফ্ল্যাট বা বাড়ি পাওয়া যায় না।
বেজার মুখ করে চারুশীলা বলে, সেইজন্যই তো সল্ট লেক-এর প্লটটা নিয়ে ভয়ে ভয়ে থাকি। ওটা আমার নামে। এটা তোমার মেসোর নামে। সবাই ভয় দেখাচ্ছে, টের পেলে নাকি জমি কেড়ে নেবে। আমি অবশ্য সল্ট লেকে যেতে চাই না।
কেন মাসি, ফ্যান্টাস্টিক জায়গা তো!
মোটেই নয়। ভাল ডিজাইনের বাড়ি করব, দেখবে কে বলো! কটা লোক ওখানে? তা ছাড়া ওখানে থাকলে কেউ যাবে না।
কেন, নির্জনতা তোমার ভাল লাগে না? আমার তো খুব ভাল লাগে।
ও বাবা, নির্জনতা আমি দুচক্ষে দেখতে পারি না। আমি চাই সবসময়ে হই-চইয়ের মধ্যে থাকতে। নির্জনে থাকলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে, কান্না পায়। আরও একটা ব্যাপার আছে। শুনলে তুমি হাসারে।
কী গো মাসি?
হাসবে না তো! নির্জনে আমার ভীষণ ভূতের ভয় হয়।
ঝুমকি হেসে ফেলল, কলকাতায় আর ভূত কোথায় মাসি? তারা সব আলো আর শব্দের ঠেলায় পালিয়ে গেছে।
ভয়ের জন্য কি ভূতের দরকার হয়? ভূত নেই তা জানি, কিন্তু তার ভয়টা তো আর নেই হয়ে যায়নি। ফাঁকা বাড়িতে একা থাকলে আমার দিনের বেলাতেও ভূতের ভয় করে। আমাকে কেমন একা থাকতে হয় জানো তো। কর্তা হিল্লি-দিল্লিলন্ডন-নিউ ইয়র্ক করে বেড়াচ্ছেন। ছেলেমেয়েরা ইস্কুলে, তখন কী রকম যে লাগে! এই, আমি তোমাকে ডিস্টার্ব করছি না তো!
না, না। আমি তো তোমার সঙ্গে গল্প করতেই আসি।
রোজ আসবে। আমি তো ভীষণ বকবক করতে ভালবাসি।
তুমি সিনেমা করা ছেড়ে দিলে কেন?
চারুশীলা ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, বিয়ের পর আর করতে দিল কই? আর আমারও ভীষণ বোরিং লাগত। মোটিভেশন ছিল না তো! ভাল অভিনয় করব, টাকা রোজগার করব, সবাইকে অ্যাট্রাক্ট করব–একটা কোথাও অ্যাম্বিশন তো থাকবে! আমার কিছুই ছিল না। তার ওপর আমাদের বাড়িটাও তো খুব কনজারভেটিভ। আমার এক কাকা ডিরেক্টর ছিলেন, তিনিই নামিয়ে দিয়েছিলেন।
মোট কটা ছবি করেছিলে?
চারটে। দুটোয় নায়িকা। সে দুটোই ফ্লপ। আর দুটোতে সাইড রোল। সে দুটোও চলেনি।
এই বলে চারুশীলা খুব হাসল।
ঝুমকি বলল, আমি একটাও দেখিনি।
দেখবে কি করে? সুপার ফ্লপ যে। রি-রান তো হয় না।
তুমি যদি আজও সিনেমা করতে তাহলে একজন নায়িকার সঙ্গে পরিচয় আছে বলে গল্প করতে পারতাম বন্ধুদের কাছে।
আমার কিন্তু ভাই একদম ভাল লাগত না। বড্ড একঘেয়ে। শুটিং-এর মতো বোরিং জিনিস হয় না। তার ওপর আবার নায়িকাদের পাবলিক লাইফ নেই। দোকানে বাজারে যেতে পারে না, রাস্তায় বেরোতে পারে না।
তোমার হয়েছে সেরকম?
চারুশীলা মুচকি হেসে বলে, নায়িকা বলে নয়, তবে এককালে রাস্তায় বেরোলে সবাই তাকাত।
এখনও তাকায়। তুমি এখনও যা সুন্দর! কী ফিগার!
যাঃ। কত মুটিয়ে গেছি!
একটুও মুটিয়ে যাওনি।
তোমাকে আর মন-রাখা কথা বলতে হবে না। কত বয়স হল বলো তো!
তোমার বয়স বোঝাই যায় না।
খুব যায়। আয়নায় যখন নিজেকে দেখি তখন দেখতে পাই মুখের চামড়া কত লুজ হয়ে গেছে।
ওটা তোমার সাইকোলজিক্যাল ব্যাপার। মোটেই চামড়া লুজ হয়নি। তুমি তো মোটে আর্লি থার্টিজ।
মিড থার্টিজ। এখন আর হিসেব করি না। ভয় করে। কর্তা কী বলে জানো? আমার একটা চুল পাকলেই নাকি ডিভোর্স করবে।
ওটা তো ঠাট্টা।
পুরুষমানুষদের বিশ্বাস নেই ভাই। কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, কত সুন্দরীদের দেখছে।
ঝুমকি লজ্জার হাসি হেসে বলে, যাঃ। মেসো তোমাকে যা ভালবাসে!
একটা জিনিস শিখে রাখো, পুরুষমানুষকে বেশী একা ছেড়ে দিতে নেই।
তুমিই-বা ছাড়ো কেন? সঙ্গে থাকলেই পারো!
আগে সঙ্গেই থাকতাম। সঙ্গে সঙ্গে সারা পৃথিবী ঘুরে বেরিয়েছি। এখন ছেলেমেয়ে স্কুলে পড়ছে, আমার হাত-পা বাঁধা। বিয়ে হলে বুঝবে।
বিয়েতে আমার কোজ নেই বাবা।
চারুশীলার ভ্রূ হঠাৎ কুঁচকে গেল। চিন্তিত মুখে হঠাৎ একটা চেয়ার টেনে এনে ঝুমকির মুখোমুখি বসে বলল, আচ্ছা, তোমার কি মনে হয় যে ওরা দুজনে দুজনের প্রেমে পড়েছে?
কারা মাসি?
আহা, আমার ভাই হেমাঙ্গ আর রশ্মি। কী মনে হচ্ছে?
অবাক হয়ে ঝুমকি বলে, কি করে বলব বলো তো!
কিছু মনে হয় না। ওদের দেখে?
তোমার ভাই মেয়েদের বেশ ভয় পায়।
আর রশ্মি?
রশ্মি খুব চালাক।
একটু দমে গিয়ে চারুশীলা বলে, তাহলে কি ব্যাপারটা হয়ে ওঠেনি বলছ!
আমি বুঝতে পারি না মাসি। দুজনেই হাইলি এড়ুকেটেড, দুজনেই অ্যাডাল্ট, আন্ডারস্ট্যান্ডিং।
চারুশীলা হতাশ গলায় বলে, আমারও কি রকম মনে হয়, ওরা ঠিক প্রেমে পড়ছে না। দেয়ার ইজ এ সুইট রিলেশন, বাট নাথিং মোর দ্যান দ্যাট। কিন্তু কেন বলো তো? ওরা প্রেমে পড়ছে না-ই বা কেন?
