নিমাইয়ের হঠাৎ কী যে হল কে জানে! মুখ নিচু ছিল। কোলের ওপর। টপটপ করে চোখের জল খসে পড়তে লাগল।
বিষ্ণুপদ। নিমাইয়ের দিকেই চেয়ে ছিল। হঠাৎ বলল, আমার চোখে ছানি আসছে বাবা। চারদিকটা কেমন অস্পষ্ট আর ধোয়া-ধোয়া দেখি। মাঝে মাঝে ভাবি, ছানিটা বোধ হয়। ভগবানেরই আশীৰ্বাদ। স্পষ্ট করে সব না দেখাই ভাল।
নিমাই উঠল। পায়ে পায়ে উঠোনের সীমানা ডিঙিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল। বুকের মধ্যে একটা যন্ত্রণা যেন বড্ড উথাল-পাথাল করছে। নিজের খামতি, দুর্বলতা, নিজের অপদাৰ্থতা আজ যেন আরও ঘুলিয়ে উঠল তার নিজের চোখে। মাথাটা কাজ করছে না।
সামনেই একটা নর্দমার মতো। পচা জল জমে আছে। কাঁচা রাস্তা গাছপালার ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেছে। ওপরে মন্ত আকাশটা যেন রোদের হাসি হাসছে তার দুর্দশা দেখে। নিমাই তার কাতর জলভরা দুখানা চোখ মেলে হাঁ করে চেয়ে রইল শুধু। বড় কষ্ট হচ্ছে তার। এরা আজ ভাল খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করেছে। তার মুখে কিছু রুচিবে না। আজ। তার খিদে মরে গেছে, বাঁচার ইচ্ছে মবে গেছে, বড্ড গ্রানি হচ্ছে মনে।
অনেকক্ষণ বাদে বীণা যখন এসে তাকে স্নান-খাওয়ার জন্য ডাকল তখন নিমাই একটা নিমগাছের গোড়ায় ঠেস দিয়ে বসে ঘুমিয়ে পড়েছে। চোখের কোলে তখনও জল।
রাতে তারা যখন ঘরে দুজনায় হল তখন বীণা বলল, তুমি এরকম করছি কেন বলো তো!
নিমাই বোধহীনভাবে বীণার দিকে চেয়ে বলল, আমি আমার বশে নেই।
বীণা চাপা হিংস্র গলায় বলল, তোমাকে একটা কথা বলেই দিই। তুমি যদি আমার টাকা নিয়ে বেশী মাথা ঘামাও তাহলে কিন্তু ভাল হবে না। তুমি ও-টাকার কথা ভুলে যাও। পাপ হোক কি আর যাই হোক, তোমার তাতে কী? এমন সব কাণ্ড করছি যে লোকে টের পেয়ে যাচ্ছে।
নিমাই ভয় পেল না। কিন্তু মেনেও নিল না। চুপ করে রইল।
বাবাকে কিছু বলোনি তো!
নিমাই মৃদু স্বরে বলল, বলতে হয়নি। উনি নিজেই কিন্তু সন্দেহ করছেন।
বাবা কী বলেছে তোমাকে?
কী জিনিস গচ্ছিত রাখতে চাইছ তা জানতে চাইলেন।
তুমি কি বললে?
বললাম তুমিই ওঁকে বলবে।
বীণার ঝংকারে ভরা গলা হঠাৎ কয়েক পর্দা নেমে গেল। বলল, কী বলব তা আমি ভেবে পাচ্ছি না। বাবা তো আর এক আহাম্মক। তোমার মতোই।
নিমাই বিছানার একটি পাশে বসে রইল বাজাহতের মতো।
বীণাপাণি তার দিকে কূট চোখে চেয়ে থেকে বলল, তুমি এর পর এমন বেফাঁস কিছু হয়তো করে ফেলবে যাতে আমি ধরা পড়ে যাবো।
নিমাই আস্তে করে বীণার দিকে মুখ ফেরাল। তারপর বলল, আমাকে এবার বিদায় দাও বীণা। আমার মনে বড় কষ্ট।
বিদায় নেবে তা তার জন্য আমার অনুমতির কি দরকার? নিলে নেবে।
অনুমতিরও দরকার হয়। তুমি আমার ওপর অত রেগে না থাকলে বুঝতে পারতে।
বীণাপাণি বিষ-গলায় বলল, ঢং কোরো না। একে তো তোমার জন্যই বনগাঁয় আমার বসবাস করা বিপদের ব্যাপার হয়ে উঠল, তার ওপর এসব ন্যাকামি আমার সহ্য হচ্ছে না। তুমি কাছে থাকলেই বিপদ।
নিমাই মাথা নেড়ে বলল, সে কথাই ঠিক। ভেবে দেখলাম, আমি বড় অপদার্থ। আমি থাকলেই তোমার অসুবিধে।
ওই লোকটা সেদিন যদি প্যাকেটটা দেখে না যেত তাহলেও ভয়ের কিছু ছিল না। কী যে কাণ্ডটা করলে তুমি!
নিমাই কান্না সামলে ধরা গলায় বলল, কাল সকালে আমি বিদেয় হয়ে যাবো। কিন্তু একটা কথা বলে যাই। হঠাৎ করে উধাও হয়েছ এটা নিয়ে বনগাঁয় কথা হবে।
কেন হবে? আমি তো বাপের বাড়ি এসেছি। কাকাকে বলেওছি, সে কথা।
চিরকাল তো এখানে থাকতে পারবে না। ফিরতে হবে।
আমি তোমার মতো বোকাও নই, আহাম্মকও নই। আমি মাথা উঁচু করেই ফিরব।
নিমাই ক্লিষ্ট মুখে বসে রইল।
কী চাও তুমি বলো তো! তুমি চাও টাকাটা আমি কাকার হাতে তুলে দিই? ও টাকার ওয়ারিশ কি কাকা?
আমি যা বলেছিলাম তা ভুলে যাওয়াই ভাল। ওসব আগড়ম বাগড়ম কথা। আমার মাথায় ওরকম সব বোকা-কথাই আসে।
তার গেঞ্জিটা বুকের কাছে হঠাৎ খামচে ধরে বীণা একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, ফের ন্যাকামি হচ্ছে!
নিমাই একটা অর্ধস্ফুট যন্ত্রণার আওয়াজ করল। সে দুর্বল মানুষ। বীণা বড় হিংস্র মুঠিতে তার বুকের লোম অবধি খিমচে ধরেছে। ঝাঁকুনিতে তার ঘাড়ে মট করে লাগল। নিমাই জলভরা চোখে বীণার দিকে চেয়ে বলল, আমাকে সত্যিই ছেড়ে দাও বীণা। আমি আর পারি না।
০৪৪. লিভিং রুমের ঠিক মাঝখানটায়
বেলা দুটোর সময়ে চারুশীলা তার লিভিং রুমের ঠিক মাঝখানটায় কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত বিরস মুখে চারদিকে চেয়ে দেখে নিয়ে ঘোষণা করল, বাড়িটার আর্কিটেকচারাল ডিজাইন ভীষণ সেকেলে আর যাচ্ছেতাই। তোমারও নিশ্চয়ই তাই মনে হয় ঝুমকি? কী বিচ্ছিরি সব কোণ আর খাজ! জানালাগুলো যথেষ্ট প্যানোর্যামিক নয়। ফ্লাশ ডোরের চেয়ে অনেক ভাল কি জানো? ডেকোরেটিভ ডাবল ডোর। আর ফ্লোরিংটাও দেখা। এ তো আর আসল মার্বেল নয়, অনেকটা মার্বেলের মতো দেখতে। নাঃ, আর একটা মডার্ন বাড়ি করতেই হবে মনের মতো।
চারুশীলার বরের একটা পারসোনাল কম্পিউটার আছে। সেটা বিশেষ ব্যবহার হয় না। ভদ্রলোক দেশ ও বিদেশে এত বনাবন কর ঘুরে বেড়ায় যে নিজের বাড়িতে থাকার বা জিনিসপত্র ব্যবহার করার সুযোগই হয় না বড় একটা। এই পিসি-তে প্রায়ই এসে প্র্যাকটিস করে ঝুমকি। চারুশীলাই বলেছে, রোজ দুপুরের দিকে চলে আসবে। তোমার প্র্যাকটিসও হবে। আর আমিও কথা কয়ে বাচবো।
ঝুমকির আত্মসম্মানবোধ প্রবল। একটু অনাদর বা উপেক্ষা বুঝতে পারলেই সে হাজার হাত তফাত হয়ে যায়। হয়তো অভিমান আর হীনম্মন্যতা থেকেই সে এরকম। অন্তত তার বাবা একদিন এরকমই বলেছিল তাকে। তবু ঝুমকি তার নিজেরই মতো। চারুশীলার পাগলামি এবং অপচয় দেখে সে অবাক হয়। অনেক টাকা আছে চারুশীলাদের, কিন্তু টাকার অহংকার নেই। চারুশীলা পাগলের মতো টাকা খরচ করে। ঝুমকি আসছে যাচ্ছে মাত্র কয়েক মাস হল। তার মধ্যেই সে অন্তত বার পাঁচেক দেখল, চারুশীলা জলের দরে পুরনো আসবাব কিছু না কিছু বিক্রি করে নতুন আসবাব আনছে। পাল্টে ফেলছে সোফার কভার, জানালার পর্দা, বাসনপত্র। বাইরের ঘরের মেঝের পুরনো মার্কেল টালি তুলে ফেলে নতুন টালি পাতা হল এই তো সেদিন।
