রামজীবনের হাতে দড়িবাধা দুদুটো মুগি মাঝে মাঝে ঝটপট করছে, কোক ছাড়ছে। নিমাই চমকে চমকে উঠেছে। কেষ্টর জীব, একটু পরেই মারা পড়বে। মাছ-মাংস সে খায় বটে, তবে এ ব্যাপারটা সইতে পারে না!
পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে রামজীবন বলল, তা এখন রোজগারপাতি কী তোমার?
ম্লান মুখে নিমাই বলে, দোকানটা দেব-দেব করছিলাম। দেখি।
রামজীবন মুখটা একটু বিকৃত করে বলে, দোকান দিয়ে কী হবে শুনি? ক পয়সা আসলে? অন্য লাইন ধরে যেন হে।
নিমাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, লাইন তো কত ভাবছি। কিছু মাথায় আসছে না।
গাঁ-গঞ্জে লাইনও বড় একটা নেই। গুচ্ছের সেলামি দিয়ে দোকান যদি করেও ফেল, দেখবে পড়তায় ফেলতে পারবে না। যাদের ঘরে মেলা টাকা আছে, খাওয়া-পরার চিন্তা নেই, তারা দোকান খুলে বসে মাছি তাড়াতে পারে। আমি তো শুনি, বনগাঁয় দুনম্বরীর খুব রবারবা।
দুনম্বরী! সেটা কি রকম?
এই ধরো বাংলাদেশ থেকে মাল এনে বেচলে, নয়তো এদিক থেকেই ওদিকে মাল চালান দিলে। ওসব কারবারে বসে থাকতে হয় না।
নিমাই বিবৰ্ণ মুখে বলে, তা বটে।
আমি বলি কি, চোখ-কান বুজে আগে কিছু পয়সা পিটে নাও। তারপর ধর্মকর্ম করে পাপ কাটিয়ে নিতে পারবে।
নিমাই পাশ-চোখে একবার রামজীবনকে দেখে নিল। বেশ শক্তপোক্ত চেহারা। সে শুনেছে রামজীবনের রোজগারটা সোজা পথে হয় না। কী করে না-করে তা বাড়ির লোকও জানে না। তবে যা করে তা নিশ্চয়ই ঢাক বাজিয়ে বলার মতো নয়। সে এসব মানুষের সঙ্গ করতে একটু ভয় পায়।
মাঠটা পার হচ্ছিল দুজনে। হঠাৎ রামজীবন তার দিকে ফিরে বলল, না হে, কাজটা ঠিক হবে না।
নিমাই একটু আনমনা ছিল। চমকে উঠে বলল, কোন কাজটা?
তোমাকে যা করতে বললাম ও কাজ তোমাকে মানাবে না।
নিমাই তটস্থ হয়ে বলে আজ্ঞে।
রামজীবন একু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, দু-চারটে তোমার মতো লোকেরও দুনিয়ায় থাকা দরকার। এই যে আমার বাবাকে দেখ, এই বাবাকে দুনিয়াসুন্ধু লোক আহাম্মক বুরবক বলে জানে। লোকটা বাকা পথে যায়নি, তর্জন-গর্জন করেনি, চুরি-চামারি করেনি। গরিব থেকে গেছে। একদিক দিয়ে দেখতে গেলে আহাম্মকই। কিন্তু বাবার কাছটিতে বসলে আমার যেন মনে হয়। গঙ্গাস্নান হয়ে যাচ্ছে। কেন হয় বলো তো?
উনি বড় ভাল লোক।
রামজীবন মাথা নেড়ে বলে, ভাল বললে হয় না। ভাল মানে কি আহাম্মক? তা তো নয়। এই সেদিন সকালে বাবার কাছে বসেছিলাম। কথা হচ্ছিল, আমাকে আর বড়দাকে নিয়ে কথা। শুনে মনে হল, দেখতে বোকাসোকা হলে কি হয়, বাবা কিন্তু অনেক তলিয়ে দেখে। অনেক বোঝে।
নিমাই সায় দিয়ে গেল।
রামজীবনের গলাটা একটু উদাস হয়ে গেল। হঠাৎ। বলল, বড়দা কত বড় মানুষ সে তো জানো। আমার বড় হিংসে হয় বড়দাকে। বিদ্যেয় তো ছাড়াতে পারব না, তাই পয়সায় ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। আর এই দুনিয়ায় পয়সা করতে গেলে তো সাদা রাস্তায় হয় না।
যা বলেছেন।
কিন্তু কী হল জানো? জাতও গেল, পেটও ভরল না। জোচ্চুরি লাইনেও আজকাল জোর কম্পিটিশন। খারাপ লোকদের সঙ্গে ওঠাবসা করতে করতে পা থেকে ভদ্রলোকের গন্ধটাই উব গেল। কী হল বলো তো লাভটা?
প্রশ্নটা নিয়ে নিমাইও ভাবতে লাগল। সাদায়-কালোয় ভরা দুনিয়া। কোন রংটা গায়ে মাখবে মানুষ? বিশেষ করে গরিব মানুষেরা? নিমাই মাথা নেড়ে বলে, আমিও তো তাই ভাবি ।
আজ বুঝেছি, বড়দাকে হিংসে করতে যাওয়াটা আমার ঠিক হয়নি। সে আমাদের পাত্তা দেয়নি বটে, ভাইবোনকে মানুষ করারও চেষ্টা করেনি, কিন্তু সে দোষ তো তার একার নয়। আমরাই বা কোন মাথাওলা ছিলাম? বড়দার সময়ও ছিল না, পাস করেই চাকরি পেয়ে গেল। সময়টা দেবে কখন? উপরন্তু একটা দজাল বউ জুটল। সে-ই খেয়ে ফেলল মানুষটাকে। আজকাল তাই ভাবি, বড়দাকে হিংসে করাটাই মস্ত ভুল।
নিমাই চুপ করে রইল। ব্যাপারটা সে তেমন কিছু জানে না। তবে শুনেছি, কৃষ্ণজীবনকে এরা ভাইবোন মিলে একবার বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল।
বাড়িটা ফটকে এসে পড়েছে দুজন। রামজীবন হঠাৎ তার দিকে ফিরে বলল, না হে, পাপ পথে যেও না। একদিকে এক-আধজন রাশ টেনে না রাখলে চলে না।
বাড়িতে ঢুকে একটা হই-চই হাক-ডাক বাঁধিয়ে বসল। রামজীবন। জামাকাপড় বদল করে একটা লুঙ্গি পরে নিয়ে কামিনী ঝোঁপের নিচে মুর্গি কাটতে বসে গেল। বীণাপাণি মশলা পিষতে বসে গেল। ব্যস্ত হয়ে পড়লেন শাশুড়ি ঠাকরুনও।
নিমাই তার ভার হয়ে থাকা মনটা নিয়ে বারান্দার এক ধারে মোড়ায় বসে রইল। শ্বশুরমশাই স্নান করতে গিয়েছিলেন কুয়োর ধারে। বারান্দায় উঠে এসে ভেজা কাপড় নিংড়োতে নিংড়োতে বললেন, আজ নাকি পেল্লায় সব বাজার হয়েছে! রেমো কেনাকাটা করল বুঝি?
নিমাই মাথা নেড়ে বলল, যে আজ্ঞে। বারণ শুনলেন না।
ওর হাতটা খুব দরাজ, বুঝলে!
সে আর বলতে!
শ্বশুরমশাই ভেজা কাপড়টা উঠোনের তারে টান-টান করে মেলে দিয়ে গায়ে একখানা জামা চড়িয়ে বারান্দায় এসে বসলেন ফের। বললেন, একটা কথা ছিল নিমাই।
আজ্ঞে, বলুন।
বীণা একটা জিনিস আমার কাছে গচ্ছিত রাখতে চায়।
জানি।
আমরা দুজনায় বুড়ো হয়েছি, বাক্স-প্যাঁটরাও তেমন নেই। তুমি কি জানো বাবা জিনিসটা কী?
নিমাই অধোবদন হল। তারপর ক্ষীণ গলায় বলল, জানি।
কী জিনিস বলো তো!
নিমাই খুব নিরীহ গলাতেই বলল, সে আপনার মেয়েই আপনাকে বলবেখন।
স্পষ্ট করে বলছে না। তোমার ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে, কোথায় একটা কিন্তু আছে। খোলসা করে না বললে জিনিসটা রাখি কি করে বলো তো!
