নিমাই হাঁ হয়ে গেল। কে লোকটা?
লোকটা কাছে এসে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বড় অবাক গলায় বলল, কখন এলে হে?
তবু নিমায়ের মনে পড়ছিল না যেন। তবে ভক করে কাঁচা মদের খানিক গন্ধ নাকে এসে লাগল। নিমাই দুপা পিছিয়ে দাঁড়াল বটে, কিন্তু সেজো সম্বন্ধী রামজীবনকে চিনতেও পারল।
এই একটু আগেই এসেছি।
কেলাটা মদ খেলেও মাতাল হয়নি। হাতের থলিটার দিকে চেয়ে বলল, তা থলি নিয়ে এখানে ঘোরাঘুরি করছ কেন? বাড়ি যাও।
নিমাই বিগলিত একটু হেসে বলল, গিয়েছিলাম। মা একটু বাজার করতে পাঠালেন।
রামজীবন অবাক হয়ে বলে, তোমাকে? মায়ের যে দিন দিন কী হচ্ছে! জামাই এসেছে, তাকে কেউ বাজারে পাঠায়?
জিব কেটে নিমাই বলে, আরে না। শ্বশুরমশাই নিজেই আসছিলেন, আমি তাকে আসতে দিইনি। বুড়ো মানুষ।
ছিঃ ছিঃ। বলে রামজীবন থলিটা প্রায় কেড়ে নিয়ে মুখটা ফাঁক করে দেখে ঠোঁট বেঁকিয়ে বলে, এই কি জামাইভোগ নাকি? মাগুর মাছ তো রুগীর পথ্যি।
নিমাই শশব্যাস্তে বলে, আজ্ঞে, জামাইয়ের যুগ আর নেই। আমিও কি আর তেমন জামাই?
রামজীবন বিরক্ত হয়ে বলে, নিজেকে সবসময়ে অত ছোট ভাব কেন বলো তো! তুমি কমটা কিসে? যত বৈষ্ণববিনয় দেখাবে তত লোকে পেয়ে বসবে। আর দাপে খাপে চলো, সবাই খাতির করবে।
নিমাই কি এই সার সত্য জানে না? খুব জানে। কিন্তু আরও যেটা জানে, তা হল, সকলের আর্ষ থাকে না। সকলে সবকিছুর অধিকারী নয়। সবাইকে মানায়ও না। তাহলে তো দুনিয়াটা অন্যরকম হত। সে মুখ নামিয়ে বলল, যে আজ্ঞে।
তোমার ওই মেনীমুখো স্বভাবের জন্যই তো বীণাটা বখে গেল। যাত্ৰাদলের নটী হয়ে যা খুশি করে বেড়াচ্ছে আর তুমি ঘর সামলে জেরবার হচ্ছ। বুক চিতিয়ে হাঁকডাক মারো দেখবে ভয়ে পেচ্ছাপ করে দেবে।
অভিজ্ঞতাবলে নিমাই জানে, নেশাখোরদের কিছু বোঝানোর চেষ্টা করতে নেই। যখন টং-এ চড়ে থাকে তখন তারা আর অন্যের কথা নিতে পারে না। নিজেরাই বকে যায়।
নিমাই তাই বিনীতভাবে বলল, চেষ্টা করব।
রামজীবনের অবশ্য নেশা হয়নি। সে এক পাত্র দুপাত্রে কাত হওয়ার লোকও নয়। তবে সব সময়ে একটু চাপান দিয়ে রাখে। তাতে মনটা বেশ চনমনে থাকে। ফুর্তি-ফুর্তি ফুরফুরে খোসমেজাজী একটা ভাবও পেয়ে বসে তাকে।থলেটা একটু নাচিয়ে নিয়ে বলল, এসো, ওদিকটায় মুর্গি পাওয়া যাবে।
মুৰ্গিা! বলে নিমাই যেন আঁতকে ওঠে।
কেন, খাও না নাকি? বৈষ্ণবপানা একটু ছাড়ো তো!
নিমাই মাথা নেড়ে বলে, সে কথা হচ্ছে না। গরিবের কি বাছাবাছি করলে চলে? সব খাই। কিন্তু মুর্গির বেজায় দাম পড়ে যাবে যে!
রামজীবন হেঃ হেঃ করে হেসে বলল, তোমাকে নিয়ে আর পারা যায় না বাপু! শ্বশুরবাড়ি বলে কথা! পয়সা খরচ নিয়ে তুমি মাথা ঘামাবে কেন? এসো এসো। ডিম তো নিশ্চয় খাও?
খাই। তবে দরকার নেই।
দরকার নেই কেন?
অত হজম হবে না।
খুব হবে। ডালের মুখে একখানা ডিমভাজা কেমন ওতরাবে বলো। হজম নিয়ে মাথা ঘামায় পয়সাওলারা। এই তো তুমিই বললে যে গরিবের বাছাবাছি করলে চলে না। আমিও তাই বলি। হজম হলে হল, না হলে না-ই হল, সেঁটে তো দিই। রামজীবন একরকম হাত ধরেই টেনে নিয়ে গেল তাকে। মুর্গিওলার কাছ থেকে দুখানা মুর্গি কিনে ফেলল। দশটা দিশি ডিম। এক সবজিওলার ঘর থেকে কুশি কুশি গুটি চারেক ফুলকপি, বরবটি, কয়েকটা মুলো। বড্ড বেহিসেবী কেনাকাটা হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল নিমাইয়ের। কিন্তু কিছু বলতে সাহস হচ্ছিল না। তবে হঠাৎ তার মনে হল, শাশুড়ি যেন সর্ষের তেলের কথা বলেছিলেন!
গলা খাঁকারি দিয়ে নিমাই বলল, বোধ হয় একটু সর্ষের তেলও লাগবে।
আহা, আগে বলতে হয়! তা শিশি কোথায়? থলিতে তো দেখছি না।
বোধ হয় ভুলে গেছেন। অনেকদিন বাদে মেয়ে আসায় খুব বেসামাল হয়ে গিয়েছিলেন তো!
কথাটা মানল না। রামজীবন। বলল, আরে না, মায়ের মাথাটাই গেছে। দাঁড়াও, একটা বোতল জোগাড় করি।
বলেই হাওয়া হয়ে গেল রামজীবন। কয়েক মিনিট বাদে যে বোতলটা নিয়ে ফিরে এল। তার তলায় তখনও ধেনোর তলানি টলটল করছে। নিমাই কথাটা তুলতে সাহস পেল না, সকলের কি আর্ষ থাকে?
শ্লেষ্ট বোতলেই মুদী যত্ন করে তেল ভরে দিল। রামজীবন তার পর পেয়াজ রসুন কিনল, আদা। কিনল, গরম-মশলাও বাদ দিল না।
একটু ঘি হলে হত, না?
এই গন্ধমাদন কেনাকাটা দেখে নিমাইয়ের বড় লজ্জা হচ্ছিল। সে একটা এমন কি মানুষ যার জন্য লোকে এত আয়োজন করবে? সে মাথা নেড়ে বলল, ঘি আমার লাগবে না।
দুর পাগল! ঘি না হলে মাংসে স্বাদ হয় নাকি?
মাতালের হাত খুব দরাজ হয়, নিমাই জানে। তবে অভিজ্ঞতা ছিল না। লোকটার মেলা পয়সা চলে যাচ্ছে দেখে তার মায়া হচ্ছে। তারা যেমন লোক, এত খরচপাতি করাটা তাদের মানায় না। সে একটা বানানো কথা বলেই ফেলল, ঘিয়ের গন্ধ আমার ঠিক সহ্য হয় না।
রামজীবন তার পিঠে একটা থাবড়া মেরে বলে, আসল ঘি খাওনি তাই বলছি। এখানে গবা ময়রার দোকানে সরবাটা ঘি হয়। একবার খেলে বুঝবে।
অতএব ঘিও হল। তার পর বাড়িমুখে রওনা দেওয়ার আগে রামজীবন বলল, আর কিছু ভুল হল না তো?
আজ্ঞে না। বেলা হয়েছে, দেরি করাটা ঠিক হবে না।
তুমি একটু কেপ্পন আছো, না?
হিসেব করেই বরাবর চলে আসছি তো। হিসেবী না হলে কম পয়সায় সংসার চালানো শক্ত কাজ। মাথাও খাটাতে হয় বিস্তর; কোনটা আজ না হলেও চলে, কোনটা বাদ দিয়েও হয়।
ওসব হচ্ছে মেয়েলী বুদ্ধি। মেয়েমানুষের বসে বসে কেবল হিসেব করে। আমি বাপু, ওরকম কঞ্জস্যপনা সহ্য করতে পারি না। পুরুষমানুষরা কি আর ওসব পোষায়?
