সারাটা দিন আজ হালকা পায়ে নেচে নেচে বেরিয়ে গেল। বিকেলে মোহিনীদের বাড়ি।
মোহিনী অবাক হয়ে বলে, এ কী চয়নদা? কী হল?
মা চলে গেলেন।
ওমা! তা আপনি আজ এলেন কেন?
বসুন, বসুন। মাকে
মোহিনীর মা এসে দাঁড়ালেন।
ইস, কবে হল চয়ন?
কাল সকালে।
এখন কী হবে?
চয়ন ম্লান হাসল, মা একরকম বেঁচেও মরেই ছিল।
তা হলেও তো মা!
চয়ন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কেন কে জানে, এখন তার মায়ের জন্য কষ্ট হচ্ছে। কান্না পাচ্ছে।
রিয়া বলল, দাদা-বউদির সঙ্গে তো তোমার সম্পর্ক ভাল নয়। মায়ের ব্যাপারে দাদা সাহায্য করেছে তো!
করেছে।
রিয়া একটা শ্বাস ফেলে বলল, যাক। কিন্তু এখন কী করবে চয়ন? ও বাড়িতে থাকতে পারবে?
পারব। বাউদি বলেছে, থাকতে দেবে।
বলো কী! এ তো খুব ভাল কথা।
আজ্ঞে।
কিছু খাবে? তোমার তো অশৌচ, এখন অনেক রেস্ট্রিাকশন। তোমাকে বরং এক গ্লাস ফুট জুস দিই। মোহিনীর বাবা বিলেত থেকে কমলালেবুর রস এনেছিল। খাও। আর কিছু খাবে? সন্দেশ?
না। কিছু নয়।
ঠিক আছে। পড়াবে নাকি?
পড়াতেই এসেছি। আমার কষ্ট হবে না।
পড়াও তাহলে।
রিয়া চলে যাওয়ার পর মোহিনী বলল, চয়নদা, আপনার কান্না পাচ্ছে না?
না। কী জানো, মা চলে যাওয়ায় কেমন যেন ভারমুক্ত লাগছে।
সে কী চয়নদা!
বলছি তো। আমার শোকের চেয়েও যেন বেশী মনে হচ্ছে ফ্রিডম। মায়ের জন্য সারাক্ষণ উদ্বেগ ছিল, অশান্তি ছিল। রাঁধতে হত, খাইয়ে দিতে হত। সব সময় মনটা পড়ে থাকত ঘরে। গিয়ে মাকে বাঁচা দেখতে পাবো তো!
আপনার খুব কষ্ট ছিল, চয়নদা, না?
খুব কষ্ট। যখন ভাবি, আমার জন্য তো মা এর চেয়ে অনেক বেশী কষ্ট করেছে তখন নিজেকে খুব অকৃতজ্ঞ মনে হয়। আমি বোধহয় খুব হৃদয়হীন, না মোহিনী?
তা কেন চয়নদা? আপনি তো খুব নরম মনের মানুষ।
গরিবের মন বলে কিছু থাকে না। কতগুলো দারিদ্র্য আছে এতই খারাপ যে, মানুষকে নষ্ট করে দেয়।
আমার বাবাও খুব গরিব ছিল। ভীষণ গরিব। কিন্তু বাবা কখনও হার মানেনি।
তোমার বাবার কথা জানি মোহিনী। আমারও ওরকম হতে ইচ্ছে করে।
মোহিনী একটু হাসল। বলল, কিন্তু বাবা কখনও তার দারিদ্র্যের গল্প করে না।
০৪৩. আজকাল বড্ড ভ্রম হয়ে যাচ্ছে
আজকাল বড্ড ভ্রম হয়ে যাচ্ছে সব কিছু। এই যে সে বাজারে যাচ্ছে এ-কথাটাই তার দু-চার পা গিয়ে খেয়াল থাকছে না। হঠাৎ অবাক হয়ে ভাবছে, আমি এ যাচ্ছি কোথায়? কী করতে যাচ্ছি? মাথা ঝাঁকুনি দিয়ে নিতাই-গৌর স্মরণ করে তবে মনে পড়ে। রাস্তাঘাটে চেনা মানুষের সঙ্গে দেখা হলে নিমাই পট করে লোকটাকে যেন চিনতে পারে না। হাঁ করে চেয়ে থাকে। তারপর ঠাহর করে স্মরণ করতে হয়। খেতে বসে খাবারের স্বাদ পায় না তেমন। ডাল মনে করে ঝোল দিয়ে খেয়ে যায়। বীণাপাণির লুকানো বিলেতি টাকার পুঁটুলিটি পাওয়ার আগে সে ছিল একরকম। আর ওই ঘটনাটির পর এখন নিমাই আর একরকম। মন কেবলই বলছে, বড্ড পাপ হয়ে গেল, বড্ড অন্যায় হয়ে গেল। এ কি আমাদের সইবো?
নিমাইয়ের মনের ভিতরটা কেউ দেখতে পায় না, নিমাই একা পায়। সেখানে সে এক জড়সড় মানুষ। মনের মধ্যে সর্বদা ভয়ের জুজুবুড়ি। ভগবানের চোখকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে ফল হয় কি? ভগবান তো সব দেখতে পান। বীণা কি সে কথা বিশ্বাস করে না? বীণার কি পাপের ভয় নেই? ও-টাকার জন্য অন্নদাতা কাকার কত ক্ষতি হল। গোটা তিনেক লাশ পড়ে গেল। ওই টাকার জন্য বীণা এখন বনগাঁ ছেড়ে পালাতে চাইছে। তবু টাকা সে ফেরত দেবে না।
ঝগড়া করে কোনও ফল হয় না। অনেক কথা ভেবে রাখে নিমাই, কিন্তু বীণা যখন মুখ ছোটায় তখন বেনো জলের সব কথা ভেসে যায় নিমাইয়ের। সে কি পারে বীণার সঙ্গে? ছেড়ে যাবে বলেও ভাবে নিমাই। কিন্তু যাবে-যাবে করেও কেন যেন যাওয়া হল না। আজও।
বড় আনমনা হয়ে সে একটা মাঠ পেরোলো। তারপর বটতলার এলাকায় এসে উঠল। হ্যাঁ, বাজারের কথাই বলেছিলেন বটে। শাশুড়ি ঠাকরুন। কিন্তু কী কী কিনতে হবে তা যে বেবাক ভুলে বসে আছে সে!
তবে বাজার-হাট খুব ভাল জায়গা। পাঁচজনের সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়, শিক্ষালাভ হয়। নানা দুঃখের কথা একটুক্ষণ ভুলে থাকা যায়। বটতলা তেমন বড় জায়গা নয়। দোকানপাট আছে। সব্জী বাজার তেমন নেই। এখানে সেখানে আলু বেগুন কচু-টাচু নিয়ে দু-চারজন বসে আছে। বেলা হয়েছে বেশ, এত বেলায় কি আর ব্যাপারীরা থাকে?
দরদস্তুর করে নিমাই পাঁচশ গ্রাম আলু আর সরু সরু বেগুন কিনল। কয়েকটা। একটু কাঁচা লঙ্কাও। পটলের দামটা বেশী ঠেকল বলে নিতে সাহস পেল না। কয়েকটা উচ্ছে কিনে ফেলল। মাছের বাজার বলে কিছু নেই। একজনকে পেয়ে গেল, জিয়ল মাছের একটা কানা উঁচু গামলা নিয়ে বসে আছে। দুখানা মাগুর মাছ কিনতে শাশুড়ির দেওয়া পয়সা ফুরুৎ তো হলই, নিজের ট্যাকের পাঁচটা টাকাও বেরিয়ে গেল। তা যাক। শ্বশুরবাড়ি তো এসেছে একেবারে শুধু হাতে।
বটতলার তেমাথায় দাঁড়িয়ে নিমাই ভাবছিল, কিছু ভুল হল কিনা। আরও যেন কিছু বলে দিয়েছিলেন শাশুড়ি। মনে পড়ছে না। জরুরি জিনিসই যেন! কিন্তু আজকাল গবেট মাথাটায় নানারকম ভয় আর দুশ্চিন্তার বুজকুড়ি। কোনও কথাই মাথার মধ্যে ভাল করে বসে না।
বটতলা মানে আসল বটতলাই। পেল্লায় একখানা বটগাছ ঝুরিটুরি নামিয়ে মৌরসীপাট্টা গেড়েছে। তারই তলায় শীতলার থান। থানের গা ঘেষেই নানারকম দোকান-টোকান। বনগাঁর মতো জমজমাট নয়, তেমন ঝা-চকচকেও নয়। তবে এখানে কিছু লোকজন আছে। ওরকমই একটা দোকান থেকে একজন ফুলপ্যান্ট আর সবুজ হাওয়াই শার্ট পরা লোক হঠাৎ বেরিয়ে এসে তার দিকে চেয়ে বলে উঠল, নিমাই নাকি হে!
