চয়ন মুখ নিচু করে বলল, হ্যাঁ। খুব ফাঁকা লাগছে।
আমাদের তবু সংসার-টংসার আছে। তোমার তো তা নেই।
চয়ন মাথা নেড়ে কথাটা সমর্থন করল। কিন্তু তার বুক দুরদুর করছে। এ সব হল কোনও অপ্রিয় প্রস্তাবের ভূমিকা। এর পর কিছু একটা আসছে। আজ মা মারা গেছে, আজই হয়তো বলবে না কিছু। কিন্তু গেয়ে রাখল। ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের কুরুর মতো ভুল আর দাদা-ইউর্দি করবে না। তবে এখন প্রতিরোধহীন চয়নকে কথার ফদে তুলিয়ে ঠিকই বের করে দেবে একদিন।
বউদি বসেই রইল। গেল না। চয়ন অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। একসময়ে, দাদার বিয়ের ঠিক পর পরই, বউদির সঙ্গে কত ভাব হয়ে গিয়েছিল চয়নের! একসঙ্গে বসে গল্প করা, সিনেমায় যাওয়া, বাপের বাড়ি যেতে সঙ্গী হওয়া, রেস্টুরেন্টে খাওয়া অবধি। তারপর ধীরে ধীরে সম্পর্কের নকশা পাল্টে গেল। সেটা হল, দাদা তার বাড়িওলার কাছ থেকে বাড়িটা কিনে নেওয়ার পর থেকেই।
চাকরি-বাকরির চেষ্টা করছে না চয়ন?
করছি।
তোমার তো শুনি অঙ্কে খুব মাথা।
চায়ন মৃদুস্বরে বলে, তাতে কিছু হয় না। আজকাল।
শুধু টিউশানি করে কি চলবে?
খুব চেষ্টা করছি।
করো। তোমার জন্য আমরা সব সময়েই চিন্তা করি। একটু বিশ্রাম করে নাও। তারপর ওপরে এসো।
বউদি চলে যাওয়ার পর চয়ন চায়ের কাপ শেষ করে আবার চিৎপাত হয়ে শুল। ঘরটা আজ থেকে তার একার। সামনে বন্ধনহীন জীবন। তার কি ভাল লাগছে? না খারাপ? কামুর আউটসাইডার উপন্যাসের নায়কেরও কি এরকম ভাবান্তরহীনতাই ছিল?
চূড়ান্ত ক্লান্তিতেই বোধ হয়। ঘুমিয়ে পড়েছিল চয়ন। দাদাদের ঝি এসে ডেকে তুলল। চোখ চেয়ে চয়ন দেখল, ঘুমের মধ্যে সে খুব কেন্দেছে। চোখের কোলে জল। বুকটা ভার।
সে বলল, আমি খাবো না। বউদিকে বলো গিয়ে আমার বড্ড বমি-বমি করছে। খেতে পারব না।
ঝি মাথা নেড়ে চলে গেল।
সারা রাত অকাতরে ঘুমোলো চয়ন। যেন আজ একটা অনির্দিষ্ট ছুটি পেয়েছে। কিরকম ছুটি, কেন ছুটি তা সে বুঝতে পারল না।
বউদি। আবার চা নিয়ে এল সকালবেলায়, চয়ন, আজ তোমার শরীর কেমন?
বড় দুর্বল লাগছে।
আজ তাহলে আর বেরিও না। হবিষ্যি খাবে তো? রাঁধছি কিন্তু।
কিছু তো খেতেই হবে। রাঁধো।
তোমার দাদা বলছিল, এ ঘরটার অনেকদিন কলি ফেরানো হয়নি। একটু মেরামতিরও দরকার।
চয়ন চারদিকে তার শিথিল চোখ একবার ঘুরিয়ে দেখে নিল। ঘরটার অবস্থা চূড়ান্ত শ্ৰীহীন। প্রচুর ঝুল জমে সিলিংটা প্রায় কালো হয়ে এসেছে। দেয়ালের চাপড়া যে কত জায়গায় খসে পড়েছে তার হিসেব নেই। জানালা দরজার অবস্থাও খুব খারাপ; পাল্লাগুলোর কাঠ ক্ষয়ে গেছে অনেকটা করে।
চয়ন নিরাসক্ত গলায় বলে, মেরামত আর রং করলে ঘরটা ভালই হবে। বউদি, তোমরা কি আমাকে আর এখানে থাকতে দেবে?
বউদি একটু অবাক হয়ে বলে, কেন বলো তো!
চয়ন ভীষণ লজ্জা পেয়ে বলে, না, মানে এখন তো মা নেই। একটা ঘর আটকে আমি পড়ে থাকব। তোমাদের অসুবিধে হবে না?
বউদি একটু চুপ করে থেকে বলল, আমরা ভাবছিলাম, নিচের তলাটা ভাড়া দিয়ে দেবো। যদি দিইও তুমি জলে পড়বে না। ছাদে একটা চিলেকোঠা তো আছেই। থাকতে পারবে না সেখানে?
চয়ন হাঁফ ছাড়ল। চিলেকোঠা! সেও তার কাছে স্বর্গ। চিলেকোঠার পাকা ছাদ নেই, অ্যাসবেস্টস। একটু গরম হবে। তা হোক, একটা নিশ্চিন্ত আশ্রয় তো। কলকাতার বাড়ি ভাড়া যেখানে উঠেছে চয়নের মতো লোকের পক্ষে তার নাগাল পাওয়া শক্ত। কৃতজ্ঞতায় ভরে গিয়ে চয়ন বলল, খুব পারব বউদি। খুব পারব।
আরও কয়েকবার আনমনে সে খুব পারব কথাটা উচ্চারণ করল।
বউদি বলল, ওপরে অ্যাসবেস্টস হলেও ঘরটা কিন্তু ভালই।
জানি বিউদি। একসময়ে ওই ঘরে আমি পড়তে যেতাম।
হ্যাঁ, তুমি তো জানোই। সংসারের খরচ যা বেড়েছে, নিচের তলাটা ভাড়া না দিলে চলছে না। তোমার দাদা অফিস থেকে অনেক টাকা লোন নিয়েছিল, মাইনে থেকে কেটে নিচ্ছে।
হ্যাঁ, বউদি, ভাড়া দেওয়াই ভাল।
বউদি একটু হাসল, এর আগেও অনেকে ভাড়া নিতে এসেছে, কিন্তু এ ঘরটা দেওয়া হবে না জেনে ফিরে গেছে। পুরো একতলাটা হলে ভাড়াটাও ভাল পাওয়া যাবে। তুমি কিছু মনে কোরো না। কিন্তু।
চয়ন কৃতজ্ঞতায় মরে যেতে যেতে বলল, না বউদি, কিছু মনে করার নেই। চিলেকোঠায় আলো-হাওয়া আছে। আমার ভালই হবে। তবে আর একটা কথা বলব?
বলো না কেন? লজ্জা কিসের?
টিউশনি করে আমি যা পাই তা খুব খারাপ নয়। মা চলে যাওয়ায় আমার খরচ কমেও গেল। আমার কাছ থেকে ভাড়া হিসেবে কিছু কিছু নেবে?
কী যে বলো!
কিন্তু বিউদির গলায় একটা আনন্দের চাপা ভাবও শুনতে পায় চয়ন।
চয়ন মিনতির স্বরে বলল, না বউদি, আমার কোনও কষ্ট হবে না। সামান্য কিছু দিতে আমার কষ্ট হবে না।
আচ্ছা, সে পরে ভেবে দেখা যাবে। কাল থেকে খাওনি, তোমার শরীর ওইজন্যই দুর্বল লাগছে। কিন্তু এমন সব নিয়ম। এক কাজ করো সাগু ভেজানো দুগাল খেয়ে নাও। খাবে? তাহলে পাঠিয়ে দিই।
দাও। আমি একটু টিউশনির বাড়ি যাবো। খবর দেওয়া নেই তো!
পারবে?
পারব বউদি।
বউদ্দি চলে গেল। একটু বাদে কলা, নারকোল কোরা আর চিনি দিয়ে মাখা বাটি ভরা সাপ্ত দিয়ে গেল। চয়ন পেট ভরে খেল। তারপর বেরোলো। ঘরে বসে থেকে লাভ নেই। একঘেয়ে লাগবে। তার চেয়ে পড়াতে বসলে মনটা ভাল থাকবে।
আজকের দিনটা কেমন যেন। রোদ হাওয়ায় হালকা একটা দিন। মনটা ফুরফুর করে পতাকার মতো। অনেক ওপরে উঠে নড়ে। মন থেকে একটা ভার নেমে গেছে আজ। দাদা-বউদি এখনই তাকে তাড়িয়ে দিচ্ছে না। আপাতত সে রয়ে গেল। চিলেকোঠা তো কী হয়েছে?
