এ সবই কূট চোখে লক্ষ করছিল চয়ন। লক্ষ করাই তার স্বভাব। তার হবি।
চয়ন! এখন তোর কী হবে বল তো ভাই! বলে দিদি একদফা তাকেও জড়িয়ে ধরে কাঁদল।
চয়নের বড় অস্বস্তি হচ্ছিল। সে বলল, সব ঠিক হয়ে যাবে।
দিদি অয়নের প্রতিও শোকপ্ৰকাশ করল। কাঁদল।
ফলে একটু দেরিতেই বেরোলো মা! ম্যাটাডর ভ্যানে একটি তুচ্ছ মৃতদেহ ভো-ভো করে শ্মশানমুখে যখন ছুটছে তখন কলকাতার রাস্তায় ঘাটে অফিসের ভিড়। মৃত্যুর মতো মহান ঘটনাও কলকাতার ব্যস্ততার কাছে তুচ্ছ। মৃত্যু কত অর্থহীন, কত গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে ডবলডেকার, বাস, ট্যাক্সির ব্যস্ত রাস্তায়।
মা একদম ঝামেলা করল না। শ্মশানে দাহ করার উনুন চট করে পাওয়া গেল। দাহ মিটে গেল মাত্র একঘন্টায়। শুকনো শরীরটা নিজেই যেন ইন্ধন হয়ে উঠেছিল।
বাড়িতে ফেরার পর অয়ন ডেকে বলল, কটা দিন ওপরেই হবিষ্যি করিস।
কৃতজ্ঞতায় নুয়ে সে বলল, আচ্ছা।
ঘরে গিয়ে শুয়ে থাক। তোর শরীর ভাল নয়। তোর বউদি সাগু ভিজিয়ে রেখেছে। খাওয়ার সময় ডাকবে।
আচ্ছা।
একা ঘরে ভয়-টয় পাবি না তো?
না। ভয় কিসের?
না, ভয় নয়। তবে ঘরে এসে এক সুগভীর ক্লান্তি ও শূন্যতাকে অনুভব করছিল চয়ন। এই শূন্যতাই কি শোক? শোক কেমন তা তো সে জানেও না ভাল করে। বিছানাটা এখনও পাতাই রয়েছে। শুধু চাঁদরটা নেই। আজ থেকে সে চৌকিতে শুতে পারবে। আজ থেকে তার আর কোনও বাড়তি কাজ রইল না। আজ থেকে নিশ্চিন্ত। এবং একা।
সে চুপ করে কিছুক্ষণ মায়ের বিছানাটায় নাঙ্গা তোশকের ওপরেই সটান হয়ে শুয়ে রইল। সে কি সুখী? না দুঃখী? না নির্বিকার? মাতৃবিয়োগের মতো বৃহৎ ঘটনার পরও কেন উথাল-পাথাল লাগছে না তার?
ওপর থেকে বউদি ডাকছিল।
চয়নের বিছানা ছেড়ে উঠতে কষ্ট হল। দরজার কাছে এসে ওপরের দিকে চেয়ে বলল, কী বলছো?
আগুন আর লোহা ছুঁয়ে ঘরে যেতে হয়। নিমু। যাচ্ছে নিচে লোহা আর আগুন নিয়ে। তারপর চান করো। ধড়া পরতে হবে।
ধর্মের সঙ্গে, শাস্ত্ৰাচারের সঙ্গে কোনও যোগ নেই চয়নের। তবু সে যন্ত্রের মতো কাজগুলো করে গেল। স্নানের পর শরীরটা বেশ স্নিগ্ধ লাগছিল তার। সারাদিন কিছু খায়নি বলে শরীরটা বড্ড দুর্বল।
বউদি এক কাপ চা নিয়ে এল। ঘরে ঢুকে বলল, চা খেয়ে একটু বাদে ওপরে এসো।
সাগ্রহে চায়ের কাপ হত বাড়িয়ে নিল চয়ন। এখন যেন ঠিক এই জিনিসটুকুরই প্রতীক্ষ্ণ ছিল তার। বলল, যাবো বউদি। একটু জিরিয়ে নিই।
নাও। তোমার তো রোগা শরীর, তার ওপর কত ধকল গেল আজ। একবার ভেবেছিলুম তোমাকে শ্মশানে যেতে বারণ করব। মুখাগ্নি তো তোমার দাদারই করার কথা।
তা হোক বউদি। মার জন্য তো আর কোনওদিন কিছু করতে হবে না। এই একটা দিন, কষ্ট কিছু নয়।
বউদি কোনওদিনই সুন্দরী ছিল না। এখনও নয়। তবে এখন কেন জানে না চয়নের কাছে বউদির মুখশ্ৰী খারাপ দেখাল না। এলো চুল পিঠময় ছড়িয়ে আছে। একটু শ্যামলা রং। মুখখানা গোলপানা। কোথাও বোধ হয় একটু শ্ৰী ছিল কখনও। এখনও রেশটা আছে।
বউদি জানালার তাকটায় একটু বসে বলল, বনুর কাণ্ডটা দেখলে? মা মারা গেছে, কিন্তু এল যেন পাড়া-প্রতিবেশীর মতো। হুশ করে এল, হাউমাউ করে একটু কাঁদল, শ্মশানযাত্রীরা রওনা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফিরে চলে গেল। বলল, ছেলেমেয়েদের নাকি পড়া আছে।
বনু তার দিদির ডাকনাম। কারও কাছ থেকেই কোনও প্রত্যাশা নেই বলে মানুষকে একটু নিরপেক্ষভাবে বুঝতে পারে চয়ন। দিদি আসলে এ সংসারের সঙ্গে একদম জড়াতে চায় না নিজেকে। চয়ন যতদূর জানে, দিদির সংসারটি বেশ সুখের। টাকাকড়ি আছে, ভরা সংসার। ওইটুকুর মধ্যেই দিদি নিৰ্ব্বঞাটে থাকতে চায়। মা বা ভাই তার কাছে দূরের ও বাইরের লোক।
চয়ন জবাব দিল না দেখে বাউদি বলল, তোমাদের হবিষ্যির জন্য কত দিয়ে গেছে জানো? মাত্ৰ দশটি টাকা।
চয়ন মাথা নত করে বলে, কীই-বা? আর হবে বলো!
কথাটার কোনও মানে হয় না। বউদি। অবশ্য কথাটার মানে খুঁজল না, নিজের মনেই বলল, টাকা তো ওর কাছে কেউ চায়নি। কিছু না দিলেও তো পারত। আরও একটা কাণ্ড করেছে। তোমরা রওনা হওয়ার পর এ ঘরে ঢুকে জিনিসপত্র হাঁটকে দেখে গেছে।
কেন?
বোধ হয় সোনাদানার সন্ধানে ছিল।
আমাদের ঘরে সোনাদানা কোত্থেকে আসবে?
সে ও—ই জানে। কী খুঁজেছে জানি না। তবে ঢুকেছিল।
চয়ন ম্লান হেসে বলে, যা ছিল কবে বিক্রি হয়ে গেছে।
আমি তো তোমার চোখে খারাপই চয়ন, কিন্তু বোধ হয় বনুর মতো নাই।
চয়ন সভয়ে বলল, খারাপ কেন হবে বাউদি? খারাপ তো ভাবি না।
বউদি ধরাগলায় বলে, খারাপ তো আর এমনি হয়নি। পরিস্থিতির চাপেই হয়েছি। আমাদের সংসারের ব্যাপারে বাইরের লোক নাক গলাতে এসেছিল বলেই তো এত অশান্তি। তুমিই বলো!
চয়ন ম্লান মুখে বসে রইল। সে তো আর বলতে পারে না, পাড়ার ছেলেদের নিয়ে পল্টু সেদিন হামলা না করলে তাকে সেদিন মা-সহ এ বাড়ি থেকে বের করেই দিচ্ছিল দাদা আর বউদি।
বউদি। বলল, চা খাও। ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।
চয়ন চায়ের তেমন স্বাদ পেল না। এই যে বাউদি ঘরে এসেছে, তার মনে হচ্ছে এর পিছনেও একটা উদ্দেশ্য আছে। সে এখন একা। এবং অসহায়। মা থাকতে যে খুব একটা সহায় হত তা নয়। তবে মা ছিল বলেই দাদা, বউদির হয়তো একটু চক্ষুলজ্জা ছিল। পাড়ার ছেলেদের ভয়ও ছিল। কিন্তু এখন চয়নের আর কোনও আড়াল নেই, বৰ্মা নেই।
বউদি হঠাৎ খুব করুণ গলায় বলল, তুমি খুব একা হয়ে গেলে, না চয়ন?
