মণীশ যদি চলে যায় তাহলে এ বাড়ির আলোটুকু, সুখটুকু, উত্তাপটুকু সব টেনে নিয়ে যাবে। এটা মণীশের দ্বিতীয় অ্যাটাক এবং ম্যাসিভ। ডাক্তার প্রথমে ছত্রিশ, তারপর আটচল্লিশ এবং তারপর বাহাত্তর ঘন্টার অনিশ্চয়তার সতর্কবার্তা দিয়েছেন। এগুলো কথার কথা। পদ্মপাতার জলের মতোই টলমল মণীশের আয়ু, অপর্ণা জানে।
শক্ত হওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছে। অপর্ণা। কিন্তু মুঠোয় ধরবার মতো কিছু পাচ্ছে না। যথাক্রমে কুড়ি, আঠারো এবং চৌদ্দ বছরের তিন ছেলেমেয়ে তাদের। বয়সের অনুপাতে তিনজনই কিন্তু ছেলেমানুষ রয়ে গেছে। সংসারের কোনও আঁচ ওদের গায়ে লাগতে দেয়নি। অপর্ণা আর মণীশ। আজ ওরা সবচেয়ে বেশী অসহায়, দিশাহারা।
জলের মতো টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে। মহার্ঘ টাকা, কিন্তু টাকার কথাটা একদম ভাবতে চাইছে না। অপর্ণা। টাকাটা তো আসল নয়, মণীশই আসল। টাকার অপচয়ের কথা ভাবাও বোধহয় মণীশের প্রতি অসম্মান।
ভাবতে চাইছে না। তবু ঘুরে ফিরে মাছির মতো একই জায়গায় এসে বসছে মনটা। কারণ আছে। গত কয়েক বছর মণীশ একটু টাকা ওড়াচ্ছিল। না, তার বাইরের কোনও দোষটোষ নেই। আসলে সে একটু বড়লোকের মতো থাকতে শুরু করেছিল। দামী জিনিসপত্র কিনে আনা, ভাল হোটেলে আকাশ-ছোঁয়া দামে সপরিবারে গিয়ে মাঝে মাঝে খাওয়া, সেকেন্ড ক্লাশের বদলে ট্রেনের এ সি কামরায় বেড়াতে যাওয়া। এসব বড়লোকী লক্ষণের পিছনে মণীশের প্রথম জীবনের অভাবকষ্টের স্মৃতি কাজ করে নিশ্চয়ই। কিছু টাকা হাতে আসার সঙ্গে সঙ্গে যেন সব পুষিয়ে নিতে উঠে পড়ে লাগল সে। ইদানীং অপর্ণা লক্ষ করেছে, ছেলেমেয়ে এবং মণীশের মধ্যে একটা ভাব এসে গেছে—আমরা বড়লোক।
এই ভাবটাই মিথ্যে। মণীশের চাকরিটা চমৎকার। বহুজাতিক প্রথম শ্রেণীর কোম্পানিতে সে চাকরি করে। বিশাল মাইনে। কিন্তু সেটা মাইনেই। আমাপা, অফুরন্ত টাকা তো নয়। মাইনে মানেই দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, বেধ সমন্বিত টাকা। সীমাবদ্ধ। বুদ্ধিমান মানুষ কখনও সীমাবদ্ধ টাকার ওপর নির্ভর করে বড়লোকী করতে যায় না। বড়লোকী করার জন্য যে টাকার প্রয়োজন তার দৈর্ঘ্য প্রস্থ আর বোধ থাকে না। তা মাসের শেষেও আসবে না।
এসব মণীশকে বোঝানো খুব সহজ কাজ নয়। মণীশ অবুঝ ও অত্যন্ত অভিমানী। কথায় কথায় সে বিগড়ে যায়। অপর্ণা তাই মণীশকে শাসন করতে হলে করেছে আদরের ছলে। বেশির ভাগ সময়ে ঘন আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে শ্বাসবায়ুতে শ্বাসবায়ু মিশিয়ে বলেছে, শোনো, আমরা কিন্তু বড়লোক নই। টাকা উড়িয়ে দেওয়াটা কি খুব ভাল? আমাদের না দুটো মেয়ে আছে, যাদের বিয়ে দিতে হবে?
সঞ্চায়ের কথা, মিতব্যয়িতার কথা শুনলেই মণীশ চটে যায়। এসব হিসেবী কথা সে একদম সইতে পারে না। ভবিষ্যতের ভাবনা তার একদম নেই। সে বলে, মেয়ের বিয়ে ফুয়ে হয়ে যাবে। আমি কত প্রভিডেন্ট ফাণ্ড আর গ্র্যাচুইটি পাবো জানো?
অনেক বলেও মণীশকে এ ব্যাপারে লাগাম পরাতে পারেনি। অপর্ণা। আর মণীশের ছায়াতে তিনটে ছেলেমেয়েও হল ওইরকম। টাকা-পয়সাকে টাকা-পয়সা বলে মনে করতে চায় না।
টাকা বোধহয় প্রতিশোধ নেয়। নার্সিং হোমের খাতায় প্রতিদিন মোটা টাকার অংক জুরের পারদের মতো ওপরে উঠে যাচ্ছে। ভাবতেও ভয় পায় অপর্ণা। এ সংসারে একমাত্র সে-ই বাস্তববাদী। সে একা। সে কখনও নিজেদের সীমাবদ্ধতা বিস্মৃত হয় না। সে জানে, মণীশের চিকিৎসার সব খরচ দেবে তার কোম্পানি। সেজন্য চিন্তা নেই। কিন্তু মণীশ যদি না ফেরে?
মণীশ না ফিরলে তার পিছনে চালচিত্রের মতো বহুজাতিক সংস্থাটিও মুছে যাবে। এককালীন কিছু টাকা গছিয়ে দিয়ে কোম্পানি তাদের সম্পূর্ণ ভুলে যাবে। আর তখনই কি শুরু হবে টাকার প্রতিশোধ?
চায়ের কাপে চামচে নাড়তে নাড়তে যখন সামনের ঘরে এল অপর্ণা তখন অনীশের মাথা ঝুঁকে পড়েছে বুকের ওপর। নাক ডাকছে। খুব আদর করে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে অপর্ণা নরম গলায় ডাকল, বুবকা, ও বুবকা! চা খাবি না?
অনীশ রক্তবর্ণ চোখ মেলে চাইল। তারপর লজ্জার হাসি হাসল।
ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, না?
ঘুমের আর দোষ কি? যা যাচ্ছে আমাদের ওপর দিয়ে!
আর এক কাপ চা করে ফেলেছে। অপর্ণা, কিন্তু ঝুমকি এখনও এল না। যদি দেরী করে তাহলে চা নষ্ট হবে। ঠাণ্ডা চা ফের গরম করে দিলে তা ছোবেও না। নতুন করে বানিয়ে দিতে হবে। অপর্ণার একটা কান উদ্গ্ৰীব রয়েছে ডোরবেল-এর জন্য। কুমকির বুক দুর্বল। সর্দিকাশি জ্বরে খুব ভোগে। বড্ড রোগা। তবু নানারকম অকাজের ট্রেনিং নিচ্ছে। অনার্স ছাড়া বি এ পাশ করেছে। এম এ পড়ার উপায় নেই। গাদা গুচ্ছের টাকা দিয়ে কমপিউটার এবং গান শিখছে। এই অপচয়টাও যদি রোধ করা যেত!
মাছিটা উড়ে উড়ে ঘুরে ফিরে একটা জায়গাতেই এসে বসছে। টাকা। অপর্ণ ভাবছে, টাকা কি প্রতিশোধ নেয়? টুকু দি অসম্মান, উপেক্ষা করা হয়, টাকাকে যদি যথােচিত মূল্য না দেওয়া হয়, তাহলে কি টাকা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে?
অপচয় এবং অপব্যয়ে বাঁধ দিতে চেয়েছিল অপর্ণা। পুরোপুরি পারেনি। সঞ্চয়মুখী করে তোলার অনেক চেষ্টা করেছে, মণীশ হয়নি। শুধু আয়কর থেকে বাঁচতে প্রতি বছর এন এস এস আর এন এস সি-তে যা একটু-আধটু জমা হয়। কিছু টাকা জমছে জীবনবীমায়। ব্যস।
নিস্তব্ধ বাড়িতে ডোরবেলের আওয়াজ প্ৰায় বজাঘাতের মতো চমকে দিল। অপর্ণাকে। ঝুমকি এল বুঝি! কত না জানি ভিজে এসেছে মেয়েটা!
