রাখবে না?
রাখতে পারা যায়। তবে নিরাপদ হবে না। আমাদের তো সিন্দুক বা স্টিলের আলমারি নেই। তার ওপর বয়স হয়েছে। কবে চোখ বুজব আর সব ছেলেরা বউরা ভাগ বাটোয়ারা করে নেবে। আমাদের কাছে রাখা ঠিক হবে না রে মা।
তা অবশ্য ঠিক। কিন্তু গচ্ছিত না রাখলেই যে নয়।
এমন কী জিনিস রে?
আছে বাবা। সব বলা যায় না।
কেন বলা যাবে না? চুরি তো আর করিাসনি।
চুরি নয়। তবে জিনিসটার পিছনে অনেকে লেগেছে। রক্ষা করতে পারব না বোধহয়।
নিমাই জানে?
জানে বাবা। আর জেনেই তো বিপদ হল। এ মানুষটাকে নিয়ে চলা যে কী দায়!
০৪২. হেঁচকির শব্দ
ঘুমের মধ্যেই চয়ন একটা হেঁচকির শব্দ শুনতে পেয়েছিল। একটা বা দুটো। দুদিন হল সে ঘন-ঘন অজ্ঞান হচ্ছে। শরীর বড্ড দুর্বল। হেঁচকির শব্দে তার একটু সন্দেহ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ক্লান্ত অবসন্ন শরীরে সে উঠতে পারেনি। বিছানার সঙ্গে মিশে গিয়ে ঘুমিয়ে ছিল অতল ঘুমে।
সকালে যখন ঘুম ভাঙল তখন বড্ড দেরি হয়ে গেছে। মা চলে গেছে। মা চলে গেছে। পাখি ফুরুৎ। শুধু কয়েকখানা হাড়ের অবয়ব পড়ে আছে বিছানায়। মুখখানা হাঁ। তার সামনে মাছি উড়ছে।
চয়নের প্রথমে কোনও শোক হল না। বরং ভয় হল। এখন যে অনেক ঝামেলা। লোক ডাকো, সৎকার করো, শ্ৰাদ্ধ করো। চয়নের শরীর আজ এত ধকল সইতে পারবে কি? চয়ন মায়ের নাড়ি দেখল, শ্বাস দেখল। এত বড় একটা ঘটনা ঘটল কত ঘটনাহীনভাবে।
চয়ন মায়ের মৃত্যু নিয়ে প্রথমেই কোনও হই-চই করল না। তার মনে হল, এক কাপ চা দ্রুত খেয়ে নেওয়া দরকার। নইলে সে কিছুতেই কিছু পেরে উঠবে না। কিন্তু চা করতে গিয়ে দেখল তার হাত পা থারথার করে কাঁপছে। চা করা অসম্ভব।
সে বেরোলো। গলির মধ্যে একটা দোকান আছে। সেখানে বসে শান্তভাবে পর পর দু কাপ আগুন-গরম চা খেয়ে নিল সে। তারপর বাড়ি ফিরে খুব সন্তৰ্পণে দোতলায় উঠল।
দাদা!
অয়ন দরদালানের এক চিলতে জায়গায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিল। কাগজটা সরিয়ে তাকে দেখে বলল, কী?
একবার নিচে আয়।
অয়ন তটস্থ হয়ে বলল, হয়ে গেছে নাকি?
মনে হচ্ছে।
কখন?
টের পাইনি। সকালে উঠে দেখছি মারা গেছে।
অয়ন একটু স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর বলল, যা যাচ্ছি। ছুঁয়ে বসে থাক। সেটাই নাকি নিয়ম।
চয়ন নিচে নেমে এল। ঘরে ঢুকে মায়ের বিছানার একপাশে বসল। তাদের ঘরটা এমনিতেই চুপচাপ। এখন যেন পাথরের স্তব্ধতা। অয়ন এল, বউদি এল। নতুন আর একটি ঝি রেখেছে ওরা। সে গিয়ে ডাক্তার ডেকে আনল।
তারপর এল পাড়া-প্রতিবেশী কয়েকজন। মৃত্যু একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। নিত্যনৈমিত্তিক, তবু প্রতিটি মৃত্যুই মানুষকে কিছু বলতে চায়। কোনও একটি সত্যের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে চুপ করে থাকে। মৃত্যুর কোনও উচ্চারণ নেই, তবু অস্ফুট কিছু নীরবে বলেও যায়।
ডাক্তার একবার নাড়িটা ধরেই ছেড়ে দিয়ে ডেথ সার্টিফেকেট লিখে দিলেন। বললেন, এতদিন বাঁচবে বলে আশা করিনি। তোমাদের ভাগ্য ভাল। কিছুই তো ছিল না শরীরে!
তারা দুই ভাই নয়, কিন্তু বিউদি বেশ কাদছিল। চোখভরা জল। একটু ফোঁপানি। খুবই সময়োপযোগী কান্না। তবে বিশ্বাসযোগ্য নয় একেবারেই। তা হোক, মায়ের জন্য একজন কেউ কান্দছে—এটা চয়নের খারাপ লাগল না।
চয়ন কাঁদছে না, তার কারণ, তার কান্না আসছে না। জ্ঞানবয়সে সে কখনও কেঁদোছে বলে মনেই পড়ে না তার। বিরল সৌভাগ্যই বলতে হবে, বউদি একবার তার কাছাকাছি এসে কাঁধে হাত রাখল। কান্নাভেজা গলায় বলল, কী খারাপ লাগছে বলো তো!
চয়ন সন্তাপ মেশানো গলায় বলল, হ্যাঁ।
পাড়ার ছেলেদের ডাকতে হয় না। চলে আসে। গায়ে গেঞ্জি, কোমরে গামছা, মুখে একটু ক্যাজুয়াল ভাব।
মৃতদেহ ফেলে রাখার মানেই হয় না। তাদের আত্মীয়স্বজন কিছু আছে বটে, কিন্তু কে গিয়ে খবর দেবে? আর তারা আসবে কিনা তারই বা ঠিক কী?
চয়ন শুধু বলল, দিদিকে জানানো দরকার।
অয়ন বলে, আমাদের দরকার? না তার? গত বছরখানেকের মধ্যেও তো সে আসেনি।
চয়ন মুখ নামিয়ে নিল। বাস্তবিকই তাই। দিদির একটা ভয় ছিল, অয়ন চয়নের ঝগড়া পাকিয়ে উঠলে চয়ন আর মা গিয়ে তার ঘাড়ে ভর করতে পারে। ভয়টার কথা বলেওছে দিদি নিজের মুখেই।
পল্টু পাড়ায় একটা ক্লাব করেছে। পরোপকারী ক্লাব। সে এসে বলল, কী দাদা, ঘাটখরচা দিতে পারবেন তো! না পারলে বলুন, আমাদের সৎকার ফাণ্ড থেকে দিয়ে দিচ্ছি।
এই পল্টুর সঙ্গে ফাটাফাটি ঝগড়ার কথা ভোলেনি। অয়ন। সে গম্ভীর মুখে বলল, ঘাটখরচা আমরাই দেবো।
খাট এল, ফুল এল, ম্যাটাডর এল। মায়ের জন্য আজ কত আয়োজন!
বউদি জিজ্ঞেস করল, চা খাবে চয়ন?
চা?
খাও। তোমার মুখ শুকিয়ে গেছে। শ্মশানবন্ধুদেরও দিতে হবে। সকালেই তো সব চলে এসেছে।
চয়ন চা খেল। এত ডামাডোলেও বুঝতে পারছিল, তার দাদা বেশ ভাল কোয়ালিটির চা খায়।
একটা কর্তব্যবোধ খোঁচা দিচ্ছিল চয়নকে। দিদিকে না জানানো ঠিক হবে না। তারা মোটে তিন ভাই-বোন। দিদি। একটু গা বাঁচিয়ে থাকে বটে, কিন্তু খবর না দিলে পরে অশান্তি হবে। চয়ন অশান্তিকে ভয় পায়।
একটা পুরোনো ডায়েরিতে দিদির পাশের বাড়ির ফোন নম্বর পাওয়া গেল। খবরটা টেলিফোনেই দিয়ে দিল পল্টু। ফলে, অপেক্ষা করতে হল কিছুক্ষণ।
দিদি এল। আলুথালু হয়ে মায়ের বুকের ওপর পড়ে কাঁদল। সঙ্গে দুই ছেলেমেয়ে। তারা কিছু হতভম্ব। জামাইবাবু ভারিান্ধী গভীর মানুষ। মুখচোখে শোক ফুটিয়ে রাখছিলেন।
