ও বাবা! তুমি যে চিনতেই চাইছো না। আমাকে! কতকাল পর এলাম মুখে একটু হাসি অবধি দেখলাম না।
এই হাসছি মা। হাসতেই তো যাচ্ছিলাম, তোর মা কাজের কথা পেড়ে ফেলল যে!
বীণাপাণি তার দীর্ঘ বেণীটি খুলতে খুলতে কাছটিতে এসে ধাপ করে বসে পড়ল মেঝের ওপর, কত বুড়ো হয়ে গেছ বাবা! কেমন যেন দেখাচ্ছে তোমাকে!
অপ্রতিভ বিষ্ণুপদ মেয়ের সামনে কেমন যেন স্বস্তি বোধ করছিল না। বড় অপ্রতিভ লাগছে। মাথায় কথা আসছে না।
বীণা বাপের দিকে চেয়ে বলল, চুল পেকে শনের নুড়ি হয়েছে, গালের চামড়া ঢলঢল করছে, রোগাও হয়েছে অনেক। কই, মা তো তোমার মতো এত বুড়িয়ে যায়নি।
বয়স তো হচ্ছে।
সে তো বুঝলাম, কিন্তু মুখখানা অতি গভীর কেন? আমাকে দেখে একটুও খুশি হওনি। তুমি!
পাগল! কী যে বলিস! কতকাল পর এলি, খুশি হবো না কেন?
মাথা নেড়ে বীণাপাণি বলে, খুশি কেন হওনি। তা জানি। তুমি ভাবো, তোমার বীণাপাণি যাত্রায় নেমে নষ্ট হয়ে গেছে! হ্যাঁ বাবা, তাই ভাবো তুমি?
বিব্রত বিষ্ণুপদ বলে, ওই দেখ, কী কথা! আরে দুর! তা ভাববো কেন?
বীণাপাণির চোখ দুটো ছলছল করতে থাকে, তাই ভাবো বাবা, আমি জানি। তোমার মতো ভাল একজন মানুষের মেয়ে হয়ে কি আমি নষ্ট হয়ে যেতে পারি বাবা?
বিষ্ণুপদ আমতা আমতা করে বলে, তাই কি বলেছি?
আমার তো খবরও তোমরা রাখো না। তাই তো একটুখানি পথ পালপাড়া। একবার কেউ গিয়ে উঁকি মেরে দেখে আসত না আমাকে। ঠিক যেন বেড়াল পার করে দিলে! এক দুঃখী সংসার থেকে আর এক দুঃখী সংসারে গিয়ে পড়লাম। কীই বা আমার বয়স বলো! এক্কা দোক্কার কোট ছেড়ে গিয়ে একেবারে কুন্তীপাকে। সংসারটা বড় নয় বলে রক্ষে। তার পর তোমার জামাইয়ের হল অসুখ। কী দিনই গেছে। পথ্যির জোগাড় নেই, ওষুধ আনতে সংসারের ভাতে টান পড়ে যায়, গায়ে কাঁথা কানি জোটে না। হ্যাঁ বাবা, এমন জামাইয়ের মধ্যে তুমি কোন ঠাকুরটি খুঁজে পেলে বলো তো!
বিয়ের সময় তো চাকরি করত।
আহা, কী চাকরি! ঠিকাদারের গুদামের দারোয়ান। তাও উপরি নিলে কিছু হত। তাও নয়, ইনি হলেন চড়কচা-মোরা সাধুবাবা। এদিকে পেটে ছুচো বুকডন মারছে।
এহেন আক্রমণ জীবনে অনেক সয়েছে বলে বিষ্ণুপদ চুপ করে থাকতে পারল। মেয়ের এসব কথা বলার হক আছে। সত্যিই তো, নিমাইয়ের মধ্যে এমন কী দেখেছিল বিষ্ণুপদ? চেহারা নেই, চাকরি ভাল নয়, শুধু পাঁচজনে বলেছিল, ছেলেটি ভারি সৎ প্রকৃতির। দেখেও তাই মনে হয়েছিল বিষ্ণুপদর।
বীণার চোখের বাটি ছাপিয়ে গেল। টপ টপ করে গাল ভাসিয়ে জল আসছে। বিষ্ণুপদ অস্ফুট স্বরে বলে, কাঁদিস কেন?
কাঁদব না? অত অভাবের সংসারে দিলে বলেই তো আমার এত হেনস্থা হল। যাত্রায় নেমেছি বলে ঘেন্না করো? যাত্রায় নামালাম বলেই তো প্ৰাণে বাচলাম! নইলে মরতে হত যে!
বিষ্ণুপদ একবার হাঁ করল। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে নাকি? দমটা কম পড়ছে কেন হঠাৎ?
বীণা আঁচলে চোখ চেপে ধরে কাঁদছে। বিষ্ণুপদর বড় আত্মগ্লানি হচ্ছে তাতে। সে বড় নির্বোধ, বড় আহাম্মক। কত ভুলের জালে জড়িয়ে ফেলল নিজেকে আর সন্তানদেরও। সারাজীবন ধরে কত ভুল দেখল, ভুল বুঝল, ভুল করল। আজ তাই বেঁচে থাকতেই ভয় হয়। ভয় হয়, আরও বেঁচে থাকলে পরের পর আরও কত ভুলভাল হতে থাকবে!
এ গায়ে হরিশ বলে একজন লোক থাকত। এখন সে আর এখানে থাকে না। তারই লতায়-পাতায় ভাই হল ওই নিমাই। হরিশের সঙ্গে তখন খুব দহরম মহরম চলছে বিষ্ণুপদর। এক একটা সময় আসে যখন এক একটা লোক এসে যেন ভর করে। তখন হরিশ যা বলে তাই ছিল বিষ্ণুপদর কাছে বেদবাক্য। হরিশই একদিন সম্বন্ধ আনল। বলল, পাত্র জজ ম্যাজিস্ট্রেট নয়, তবে এমন চরিত্রের ছেলে পাবেন না। সংসারটাও ছোটো। শুধু, বুড়োবুড়ি। হরিশের কথায় অন্য সকলের মত খানিকটা অগ্রাহাই করেছিল বিষ্ণুপদ। পাত্ৰপক্ষ এক পয়সা পণ বা আর কিছু দাবি করেনি। পাত্রটিকে বিষ্ণুপদ দেখেছিল। লম্বা-চাওড়া মিলিটারি নয়। কিন্তু ভারি কমনীয়, নরম-সরম মানুষ। বড্ড মিঠে কথাবার্তা। চোখের দৃষ্টিতে একটা দেবভাব ছিল। এখনও কি আছে? কে জানে।
বিষ্ণুপদ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, ওরে, জামাই কি খারাপ ব্যবহার করে?
মুখঢাকা বীণাপাণি মাথা নাড়ল, না। সে মুরোদ আছে নাকি?
কোন দিক দিয়ে খারাপ বল তো! পয়সা নেই তা তো জানি। সে তো আমারও নেই। তা বলে তোর মা আমার নামে বলে বেড়ায় না।
বীণাপাণি আরও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মুখ তুলল। একটু ঠাণ্ডা হয়েছে। ধরা গলায় বলল, ওরকম সৎ মানুষ হয় না। কিন্তু সেটাই কি সব বাবা? পুরুষের আর কিছু গুণ থাকতে নেই? বড্ড ভীতু আর মুখচোরা। সাহস করে কোনও কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে না। কিছু একটা ফলিয়ে তুলতে পারে না। সব সময়ে কেমন জলে-ডোবা ভাব। ওরকম মেনিমুখো মানুষের ঘর করতে গেলে একটু উল্টো রকমের না হলে চলে? বলো তো!
বিষ্ণুপদ অবাক হয়ে বলে, সৎ-এর উল্টো যে অসৎ! ভালর উল্টো যে খারাপ!
তাই বললাম বুঝি! আর কাকেই বা বলছি! তুমিও তো আর ভিন্ন রকমের নও!
বিষ্ণুপদ একটু হাসল, আমি নিমাইয়ের চেয়েও আর এক কাঠি সরেস রো।
হ্যাঁ বাবা, আমার একটা জিনিস গচ্ছিত রাখবে?
জিনিস! কী জিনিস রে?
একটা ছোট প্যাকেট।
দামী জিনিস নাকি?
দামীই। তবে কাউকে কিছু বলতে পারবে না। খুব লুকিয়ে রাখবে। তুমি জানবে, আর মা।
বিষ্ণুপদ আবার আতান্তরে পড়ে গিয়ে বলে, আমি গচ্ছিত রাখব কোথায় বল তো! বাক্স-প্যাঁটরা যা আছে সব খোলামেলা। তালাটালা নেই। চাবিও সব হারিয়ে গেছে।
