বিষ্ণুপদ খুব হাসল দুলে দুলে। তারপর বলল, সেই ভাল। তুমি ভাল, আমিও ভাল। দুজনেই দুজনের কাছে ভাল, কেমন তো?
নয়নতারাও হাসল, বলল, হ্যাঁ তো।
উঠোনের আগল ঠেলে এই সময় দুটি মানুষ ঢুকল উঠোনে। একটি বেশ ঝলমলে শাড়ি-পরা মেয়ে। সঙ্গে একজন পুরুষ। বিষ্ণুপদ চোখ কুঁচকে ঠাহর করে বলল, কে?
নয়নতারা কুলোটা নামিয়ে রেখে কলধ্বনি করে উঠল, ও মা! এ যে নিজের চোখকে বিশ্বাস হয় না! বীণাপাণি! আয় ७भाश।
বিষ্ণুপদ যে খুব খুশি হল তা নয়। এই মেয়েটি সম্পর্কে ভাল কথা শোনা যায় না। লোকে আজকাল খারাপ কথাই বলছে। তবু জলচৌকি ছেড়ে বিষ্ণুপদ উঠে দাঁড়াল।
বীণাপাণি দৌড়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরল, কেমন আছো মা?
তোকে নিয়ে খারাপ স্বপ্ন দেখে যে কী মন খারাপ। আমার! তোর বাবাকে নিয়ে বনগাঁয়ে যাবো বলে ঠিক করে ফেলেছিলাম। তারপর আর যাওয়া হল না।
বীণা আর নিমাই বিষ্ণুপদকে প্ৰণাম করে বারান্দায় মাদুর পেতে বসল। দুজনের কারও মুখেই সুখের ছাপ দেখতে পেল না বিষ্ণুপদ। নিমাইয়ের দিকে চেয়ে বলল, কেমন চলছে তোমার?
নিমাই শুকনো মুখ করে বলল, ওই টুকটাক করে চলছে।
জবাবটায় বিষ্ণুপদ খুশি হল না। ভ্রটা কেঁচকানোই রইল। বলল, কেন বাবা, তুমি কাজকর্ম কিছু করো না?
একটা দোকান র ইচ্ছে আছে।
বিষ্ণুপদ দেখল, বীণাকে নিয়ে নয়নতারা গিয়ে ঘরে ঢুকল। মেয়েদের নানা কথাবার্তা থাকে।
বিষ্ণুপদ বলল, দোকান তো তোমার একখানা ছিল।
ছিল। সে তুলে দিতে হয়েছে।
তাহলে তোমাদের চলছে কিসে?
বীণা কিছু পায়।
কথাটা শুনেছি। শুনে আমার ভাল লাগেনি। বীণা যাত্ৰাদলে কেন নামল বলতে পারো?
আজ্ঞে, আমি বারণ করেছিলাম। শোনেনি।
কেন শোনেনি?
তখন আমার বুকের দোষ হয়েছিল। রোজগারপাতি বন্ধ। পেটের দায়ে আর আমাকে বাঁচাতেই নেমেছিল।
বিষ্ণুপদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ওসব ভাল ব্যাপার নয়। চারদিকে মেয়েদের যে কত বিপদ।
বীণা তো আমার কথা শোনে না। আপনারা বলে দেখুন।
আমি! বলে বিষ্ণুপদ আকাশ থেকে পড়ল, আমার কথায় কি কাজ হয় বাবা? বলিও না কাউকে কিছু। তোমাকে বললাম, ধর্মভীরু মানুষ বলে।
ধৰ্মভীরু মানুষদের এখন ভাত জোটে না।
তাই দেখছি। একটা ভারি উল্টোপাল্টা রকম চলছে এখন। কী বলো?
আজ্ঞে।
অনেকদিন এদিকে আসো-টাসোনি। দেখতে ইচ্ছে যায়। তোমার মুখখানাই তো ভুলতে বসেছিলাম।
বড্ড আটকা পড়ে আছি। ওদিকে। বীণা মন করল, তাই আসা।
যাত্ৰাদলে কি ও অনেক টাকা পায়?
না, তেমন কিছু নয়। আগের চেয়ে এখন একটু বেশি পাচ্ছে।
একটা কথা কি জানো? মেয়েদের রোজগার হঠাৎ খুব বেড়ে গেলে লক্ষণটা ভাল নয়। ওর মধ্যে একটা কিন্তু ঢুকে থাকে।
নিমাই সামান্য লজ্জিত হয়ে বলে, তেমন কিছু বাড়েনি।
বিষ্ণুপদ সামান্য চুপ করে থেকে বলে, দুনিয়াটায় এখন টাকা আর মেয়েমানুষ ছাড়া যেন কিছু নেই। আর একটা জিনিসও দেখি, খুব বেড়েছে। নেশা।
তা যা বলেছেন।
বনগাঁ কেমন জায়গা?
ভাল মন্দ মিশিয়ে।
দোকানটা কবে করবে। বাবা?
খোজা হচ্ছে। সুবিধেমতো পেলেই খুলে ফেলব।
তখন বীণাকে যাত্ৰাদল থেকে ছাড়িয়ে নিও।
আজ্ঞে, চেষ্টা করব।
জামাটামা খুলে তেলটেল মাখো। কুয়োয় চান করবে, না কি পুকুরে?
নিমাই একবার আকাশের দিকে চেয়ে বলল, এখনও বেলা অনেক আছে। এগারোটার বেশি বাজেনি। হবেখন সব।
বিষ্ণুপদর কথা ফুরিয়ে গেল। আজ দিম ধরে অনেক কথা বলে ফেলল। এত বেশী কথার মানুষ নয় সে। কথা বেরিয়ে যাওয়ায় শরীরটাও একটু কাহিল লাগছে। ঘামও হচ্ছে যেন একটু।
নয়নতারা বেরিয়ে এসে বলল, ওগো, একটু এধারে শুনে যাও।
বিষ্ণুপদ উঠল। কাছে যেতেই নয়নতারা চাপা গলায় বলল, জামাইকে তো আর কচুৰ্ঘেীচু খাওয়াতে পারি না। একবার বাজারপানে যাবে নাকি?
বাজার! কতকাল যাইনি।
আজ যে রেমোটাও বাড়ি নেই। পারবে না?
পারব। টাকা দেবে নাকি?
দেবো।
বাজারের দরদাম কিছু জানি না। ঠকিয়ে দেবে হয়তো। কী কী আনতে হবে বলে দাও। বুদ্ধি খাঁটিয়ে কিন্তু আনতে পারব না।
একটু মাছ তো লাগবেই। একটু সর্ষের তেল। কয়েকটা আলু আর দুটো বেগুন।
নয়নতারা টাকা বের করে দিল। একখানা ব্যাগ ধরিয়ে দিল হাতে, তারপর বলল, ছাতাটাও নিয়ে যাও। রোদ বেশ চড়া লাগছে।
বাজার করতে ছাতায় সুবিধে হয় না। ও থাক। তেমন গরম নয়।
চটিজোড়া পরে রওনা দিতে যাবে এমন সময় নিমাই হাঁ হ্যাঁ করে ওঠে, আহা আপনি বাজারে যাচ্ছেন কেন? কিছু নেই নাকি বাড়িতে?
নয়নতারা বলল, সে যা আছে তাতে জামাইকে দুটি ভাত বেড়ে দেওয়া যায় না।
নিমাই মাথা নেড়ে হেসে বলে, আজ্ঞে, ওসব বলে লজ্জা দেবেন না। আমি তালেবর লোক নই। গরিবের ছেলে, দুটি ডালভোতই অমৃত। বুড়ো মানুষকে এই দুপুরে বাজারে পাঠাতে হবে না।
বিষ্ণুপদ না-যেতে পারলে বাঁচে। ঘটনাটা কী দাঁড়ায় তা দেখার জন্য দাঁড়িয়ে রইল।
নয়নতারা বলল, পাঠাতে হতই বাবা। দুচারটে জিনিস না হলেই চলবে না।
হাত বাড়িয়ে ব্যাগটা বিষ্ণুপদর হাত থেকে নিয়ে নিমাই বলে, তাহলে দিন আমি এনে দিই।
সে কি হয়! তুমি জামাইমানুষ, ধুলোপায়ে বাজারে পাঠাবো?
নিমাই এক গাল হেসে বলে, দুগ্ৰাস ভাত না হয় বেশী খাবো। দিন, আমার খেটে অভ্যাস আছে।
বীণাপাণি দরজায় এসে দাঁড়িয়ে বলে, ওকেই দাও না। বাজার ভাল করে।
নিমাই বাজারে রওনা হয়ে যাওয়ার পর হাঁফ ছাড়ল বিষ্ণুপদ। জলচৌকিতে বসে ধুতির খুঁটে মুখের ঘাম মুছল, ফাঁড়াই কেটেছে বলা যায়। বাজারে যাওয়ার নামে যেন অকূল পাথারে পড়ে গিয়েছিল। বয়সকালে বাজারহাট এত ভাল লগত যে সারাদিন বাজারেই পড়ে থাকতে ইচ্ছে যেত। আর মনে হত গোটা বাজারটাকেই গন্ধমাদনের মতো তুলে বাড়িতে নিয়ে আসে। কিন্তু এখন যেন কোথাও যাওয়ার নামে কে যেন ভেজা কম্বল জড়িয়ে দেয় গায়ে।
