মরবো কোন দুঃখে? বড়লোকদের ভাল খেয়ে খেয়ে অরুচি, তাই বেশী খায় না।
বিষ্ণুপদ যেন একটু অবাক হয়ে বলে, অরুচিটা হয় কি করে বলো তো! আমার তো অরুচি হয় না। কখনও। তেলাপিয়া মাছ থেকে গমের খিচুড়ি কোনটাই তো এ পোড়া জিবে কখনও খারাপ লাগেনি। খিদের ভাবটারও কখনও মন্দা হল না।
নয়নতারা হাসে, বড়লোকদের জিব! তুমি পাবে কোথায়? ওসব বড়লোকদেরই হয়। অরুচি, অখিদে ।
একবার বলে দেখো তো রেমোটাকে। বললে একদিন ঠিক এনে দেবে।
ফুলকপি তো! বলে দেখবখন।
আগে বাগানেই হত দুচারটে। আজকাল আর বাগান কেউ করে না। করলে আর বাজার থেকে দুনো দামে কিনতে হত না।
কে করবে বলো! কার দায়? যতদিন তুমি করেছে ততদিন হয়েছে। এখন বাগানে একখানা কুমড়োবিচিও কেউ পোতে না। আমি মরে মরে দুচারটে যা গাছ লাগাই, গরু ছাগলেই খেয়ে যায় সব। ভাগের জমি বলেই বুঝি কারও গা নেই।
বিষ্ণুপদ হঠাৎ বলল, বুঝলে, সামনের বন্ধুর অবধি যদি বাঁচি, তাহলে আমি বাগানটায় হাত লাগাবো। জলটল না হয় পটলকে দিয়ে দেওয়াবো।
খুব বাঁচবে। হেসে-খেলে এখনও মেলা বাঁচবে।
বিষ্ণুপদর মেজাজটা আজ ভাল।
নয়নতারা সর্ষে রোদে দিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই বলল, একখানা গরদ দিয়ে গেল না তোমাকে কৃষ্ণজীবন?
গরদ বলে গরদ! একেবারে আসল জিনিস।
কত দাম হবে মনে হয়?
তা কি আর জিজ্ঞেস করিনি! মিটমিটি হাসল শুধু, বলল না। দাম ভালই হবে মনে হয়। জীবনে গরদ কটা চোখে দেখেছি যে, দাম জানব?
একদিনও তো পরতে দেখলাম না!
বাপরে! পারব কি গো? সারা দিন গোবর-ন্যাতা, জলকাদা ঘাটছি, গরদ পরে বসে থাকলে তো চলবে না। ওসব বড়মানুষদের ঘরে হয়।
ওইটে কৃষ্ণজীবন ভুল করল। সাধ করে গরদ এনে দিল, কিন্তু বুদ্ধি করে যদি ও-টাকায় কয়েকখানা আটপৌরে শাড়ি এনে দিত তাহলে কত সুবিধে হত বলো তো!
শখ করে দিয়েছে। কী করবে বলো!
গলাটা একটু নামিয়ে বিষ্ণুপদ বলে, ও গরদ তোমার গায়ে তো উঠবে না, ও পরে বেড়াবে বামার বা রেমোর বউ। তুমি পটলটি যেই তুলেছে সেই থাবা মারবে সব জিনিসে।
নয়নতারা একটু হেসে বলে, এতদিনে তাহলে সংসার চিনতে শিখলে!
আগেই চিনেছি, চুপ করে থাকি বলে বোকা ভেবো না।
বোকা তো তুমি নও, তবে বোকা ভাবিব কেন?
তাই বলছি গরদটা দুচারদিন পরে নাও। আমাদের তো বেশি কিছু নেই। তোমাকে সারা জীবন দিতে-থুতেও পারিনি কিছু। মনে ইচ্ছে অনেক হয়েছে। পারলাম কই?
নয়নতারা বলে, ওরকম বোলো না তো! দাওনি তে কী হয়েছে? পারলে কি দিতে না? ছেলের দেওয়াই তোমার দেওয়া। ছেলে তো তোমারই।
তাই ধরে নিচ্ছি। কিন্তু একটু পরো। না পরলে কি দেওয়ার দাম থাকে?
আচ্ছা পাগলামি শুরু করলে দেখছি। গরদটাকে একটু জুড়োতে দাও।
বিষ্ণুপদ মৃদু স্বরে বলে, আমাদের এখন ভাটির বয়স। কোনও কাজে দেরী করা ভাল নয়।
আজ বাড়ি ফাঁকা। রাঙা তার দুই ছেলে নিয়ে দিন কয়েকের জন্য বাপের বাড়ি গেছে। বামাচরণের বউ নিজের ঘর থেকে বড় একটা বেরোয় না। আজকাল। তার হাঁড়িও আলাদা। তারা বুড়োবুড়ি একটু একা হয়েছে। সকালের দিকটায় দুজনে কথা হচ্ছে।
নয়নতারা আর একটা কোটো খুলে কী যেন দেখছিল। বলল, ঠিক আছে, পরব না হয়। শীতলামন্দিরে গিয়ে একটু পুজোও দিয়ে আসব। গরদ পারে। কতকাল যাই না। ওদিকে।
আজ রাঁধবে-বাড়বে কি?
সেই তো ভাবছি। রেমো তো সকালে বেরিয়ে গেল। বাজার করলে হত একটু। তেমন কিছু নেই। তেলেরও টান রয়েছে।
বিষ্ণুপদ একটু হাসল, তাতে কি তোমার আটকায়? চিরটা কাল তো টানাটানির সংসারেই হাত পাকালে। সেদ পোড়া ছাড়া দিয়ে দিব খেয়ে গেলাম আমরা। কিছু লাগলে বলো, এনে দিই। কৃষ্ণজীবন তো কিছু টাকাপয়সা দিয়ে গেছে।
নয়নতারা চোখ পাকিয়ে বলল, ওতে হাত দেবে কেন? আছে কাটা টাকা থাক না। দুর্দিনে কাজে লাগবে।
বিষ্ণুপদ একটু দুঃখের হাসি হেসে বলে, তোমার বড় সরল মন। দুর্দিন আর আসবে কি? চিরটা কাল তো দুর্দিন মাথায় করেই কাটিয়ে এলে। তার চেয়ে খারাপ আর কী হবে? তাই তো বলি, চোখ ওল্টালে ছেলেরা বউরা সব হাঁটকে মাটকে নিয়ে নেবে। ভূতভূজ্যিতে যাবে সব কিছু। তার চেয়ে ও টাকা নিজেরা খরচ করাই ভাল।
তোমার কেবল খরুচে বুদ্ধি। ও বুদ্ধি ভাল নয়। চলছে চলুক না।
আচ্ছা কেপ্লন মানুষ তুমি।
পদ আর কথা বাড়াল না। বসে বসে নয়নতারার কাজ দেখতে লাগল। জিনিসপত্রের কী যত্ন মানুষটার। একটা
দানা যত্নে আবার কোঁটোয় ভরে রেখে দেয়। গরিবের সংসারে কত অভাব থাকে। সাধ্যমতো নয়নতারা চিরকাল গতির খাঁটিয়ে ফুটো নৌকো সামাল দিয়েছে। অনুযোগ করেনি, ঝগড়া করেনি। এই একজনের কাছে নিজেকে বড় ঋণী লাগে বিষ্ণুপদর। বড্ড মায়াও হয়। এই মানুষটাকে কোনওদিন হাতে করে একখানা ভাল জিনিস। এনে দেয়নি। কী খেতে ভালবাসে, কোন রঙের শাড়ি পছন্দ সেই খোঁজটাও নেয়নি কখনও।
তুমি বড় ভাল মানুষ গো!
বিষ্ণুপদর কথাটা শুনে কুলো থেকে মুখ তুলে নয়নতারা একটু হাসল, তুমি ভাল বলেই আমিও ভাল। মেয়েমানুষ জলের মতো, যে পাত্রে থাকে তার মতোই হয়।
সে তো তুমি বললে। একালের মেয়ে-বউরা বলবে?
আমাদের আর একাল দিয়ে দরকার কি? ওরা ওদের মতো থাক।
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, সে কথা তো আমিও তোমাকে বলি। তোমার মতো মানুষ হলে সংসারে অশান্তি হয় না। সব দিক বুঝে, ঠিক রেখে চলতে জানা চাই।
মেয়েদের কথা বলছে! পুরুষগুলোরও হাল একবার চেয়ে দেখ। তুমি যেমন মানুষ তেমনটা একালে পাবে খুঁজে? নেশা-ভাঙি নেই, বায়নাক্কা নেই, তর্জন গর্জন নেই, মেয়েমানুষের দোষ নেই। তা আমার ভাগ্য সেদিক দিয়ে বড্ড ভাল। খাওয়া-পরার কষ্ট সয়ে নিয়েছি শুধু তুমি ভাল বলে।
