পরিচয় হয়েছে? কি করে?
রশ্মি যে প্রায়ই আসে চারুশীলার বাড়িতে। গতকালও এসেছিল।
কচুরিটা মুখে বিস্বাদ ঠেকছিল হেমাঙ্গর।
সে বলল, আমি এত সব খবর জানি না।
খিলখিল করে হেসে রিয়া বলল, আপনি অনেক কিছুই তো জানেন না দেখছি। এমন কি একটা মেয়ে যে আপনার প্রেমে পড়েছে সেই খবরটা অবধি নয়। আপনি তো দেখছি আমার কর্তটির মতোই আনমনা মানুষ।
আমি আনমনা নাই, তবে লেস ইনফর্মড। আমাকে না জানিয়ে পৃথিবীর ঘটনাবলী অনেক এগিয়ে গেছে।
আপনার কিন্তু এ খবরটা জানার কথা।
কিন্তু প্রেমের কথা বলছেন কেন? আমরা তো প্রেমে পড়িনি!
কি জানি বাবা! আমার তো মনে হল মেয়েটির আপনাকে ভীষণ পছন্দ। আপনার প্রসঙ্গ উঠলেই এমন লজ্জা পাচ্ছে, ব্লাশ করছে আর মিষ্টি মিষ্টি হাসছে যে, ভুল হওয়ার কথাই নয়।
খানিকক্ষণ স্তব্ধ থেকে হেমাঙ্গ বলল, এটা কি করে হল তা আমি একদম বুঝতে পারছি না।
এই ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমি প্রকাশ্যে বলে ফেললাম বলে কিছু মনে করবেন না। আমি তো জানতাম আপনাদের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।
হেমাঙ্গ বেশীক্ষণ বসতে পারল না। কচুরিগুলো খানিক ফেলে খানিক গিলে উঠে পড়ল।
তার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। অস্বস্তিটা মানসিক, কিন্তু সেটা শরীরটাকেও চঞ্চল আর অস্থির করে তুলেছে।
কোনওরকমে বিদায় নিয়ে সে নিচে এসে গাড়ি ছাড়ল। প্রথমে ভেবেছিল, চারুশীলার কাছে গিয়ে একটা জবাবদিহি চাইবে। কিন্তু সেটাও বিপজ্জনক। কে জানে হয়তো রশ্মি সেখানে এসে বসে আছে।
এমন নয় যে, রশ্মিকে তার অপছন্দ। এমনও নয় যে, বিয়ে করা তার পক্ষে একটা অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু যেটা বিস্ময়কর তা হল, রশ্মির পক্ষে তার প্রেমে পড়াটা। এরকমও হয় নাকি? এত অল্প পরিচয়ে?
০৪১. তৰ্পণের দিন
হ্যাঁ গো, তৰ্পণের দিন কি এসে গেল নাকি?
নয়নতারা একখানা পুরোনো জং-ধরা কৌটো খুলবার বৃথা চেষ্টা করতে করতে বলে, সে এখনও দেরি আছে।
পঞ্জিকাখানা দেখে রেখো।
পঞ্জিকা তো এ বছর আনাই হয়নি। রামজীবন প্রতিবার একখানা হাফ পঞ্জিকা এনে দেয়। এবারটায় বুঝি ভুলে গেছে।
তা হলে?
ও নিয়ে ভাবতে হবে না। ভুল তো কোনওদিন হয়নি। এবারও হবে না। বাংলা ক্যালেন্ডার আছে।
খেয়াল রেখো।
কৌটোটা একটু খুলে দেবে নাকি; বর্ষার পর কোটো-বাউটার মুখ জং ধরে বড় আট হয়ে বসে। দেখ তো পারে।
বিষ্ণুপদ কোটোটা হাত বাড়িয়ে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একটু দেখল। চাড় দিয়ে খোলার জিনিস নয়, প্যাচের ঢাকনাও নয়। এ হচ্ছে বসানো ঢাকনা। ভিতরে মাল আছে, বেশ ভারী। নাড়লে ঝুম ঝুম শব্দ হচ্ছে।
বিষ্ণুপদ খোলার চেষ্টা করতে করতে বলল, কী আছে। এর মধ্যে?
তা কি ছাই জানি? রাজ্যের কৌটো, কোনটার মধ্যে কী কে জানে। খুললে বুঝব। চাল, ডাল, তিল, পোস্ত কিছু একটা হবে। যা-ই থাক, ছাতা পড়ে আছে হয়তো। চনচনে রোদে একটু রেখে দিলে দোষ কাটে।
উঠোনের মাঝখানে চাটাই বিছিয়ে বিস্তর জিনিস রোদে দিয়েছে নয়নতারা। কিছু মশলাপাতি, ডাল, পুরোনো তেঁতুল অবধি।
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, হাত পিছলে যাচ্ছে। আঁচলটা দাও তো, সেঁটে ধরে খুলে ফেলি।
থাক বাপু, বেশি কসরতে কাজ নেই। রোমো আসুক, খুলে দেবে।
বিষ্ণুপদ নিজের ধুতির খুঁট দিয়ে আরও কয়েকবার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে বলে, এ একেবারে তোমার আমার মতো কৌটো আর ঢাকনা দুজনকে-দুজনায় সেঁটে ধরেছে। কেউ কাউকে ছাড়তে চাইছে না।
নয়নতারা বালিকার মতো একটু হাসল, শত্ত্বরের মুখে ছাই দিয়ে তাই যেন থেকো। কোটো আর ঢাকনা-তোমার মাথায় খেলেও বাপু সব অদ্ভুত কথা!
চাটাইয়ের দিকে চোখ কুঁচকে চেয়ে ছিল বিষ্ণুপদ। বলল, সাদামতো। ওটা কী দিয়েছে রোদে? সাগু নাকি?
হ্যাঁ, গেলবার পটলের জুরের সময় আনানো হয়েছিল।
বড় দানা?
বড়ই।
ভিজিয়ে লেবুপাতা, চিনি আর নুন দিয়ে খেতে ভারী চমৎকার। একখানা পাকা কলা আর একটু কোরানো নারকোল হলে তো কথাই নেই।
বড্ড নোলা হয়েছে আজকাল, না গো?
তা বুড়ো বয়সে একটু হয়। সাগুতে কোনও দোষ নেই। খেলে পেট ঠাণ্ডা থাকে। কী বলো?
দেবোখন ভিজিয়ে। কোটোটা খুলতে পারলে?
না। বুড়ো হাড়ে কি আর সেই শক্তি আছে? আগে হলে এক মোচড়ে খুলে ফেলতাম।
না গো, কৌটোর মুখে মরচে পড়লে বড্ড এঁটে যায়। কথায় কথায় বুড়ো বয়স এনে ফেল কেন?
বিষ্ণুপদ ফর্সা রোদের উঠোনে চোখ দুখানা ফেলে রেখে বলে, দিনে পনেরো বিশ মাইল সাইকেল চালোতাম, নিজের হাতে চাষ করতাম। শরীরে তখন হাতির মতো জোর ছিল। এখন কেমন ঝিম মেরে গেছি। মনে হয় ভেজা কথা জড়িয়ে বসে আছি।
জাতির কোণা দিয়ে মুখটা আলগা করে অবশেষে খুলে ফেলল। নয়নতারাই।
কৌটোর ভিতরে চেয়ে বলল, সর্ষে গো!
শুনে বিষ্ণুপদ খুব হাসল, আর ভাল জিনিস কিছু বেরোলো না। সর্বে আমি তো ভাবছিলাম সোনাদানা হীয়া-জহবত কিছু বেরোবে।
আমাদের কপালে কি তাই আছে গো! তা সর্ষেই খারাপ কি? রোদে মচমচে করে শুকিয়ে রাখলে বাঝ উঠে যাবে। কচুবাটা খাবে আজ? ছাইগাদা থেকে মানকচুটা। তবে তোলাই।
উদাসভাবে বিষ্ণুপদ বলে, বর্ষাকালটা তো কচুঘেচু খেয়েই কাটালাম। এ সময়ে নতুন ফুলকপি ওঠে, খুব স্বাদ।
এখানে কি আর ওঠে? সে কলকাতায়, দামও তেমনি।
বিষ্ণুপদ একটু খেদের সঙ্গে বলে, ওইটেই তো মুশকিল। ভাল জিনিসের দামটাও আবার ভাল। আজকাল শুনি, বড়লোকরা নাকি বেশী খায়-টায় না। বেশী খেলে নাকি কিসব হয়। প্রেসার, কোলেস্টোরাল, হার্টের ব্যামো। আর আমাদের দেখ, পেলাম তো খেলাম। মারি মরব, মরণ তো আর খণ্ডানো যাবে না, তা খেয়েই না হয় মরলাম। কী বলো?
