কচুরির কথায় হেমাঙ্গর খিদে চাগিয়ে উঠল। বলল, ব্যাচেলর মানুষ সব খাই।
রিয়া চলে যাওয়ায় কৃষ্ণজীবন মৃদু স্বরে বলল, আমি সত্যিই আজকাল বোধ হয় একটু বেশী কথা বলে ফেলি। আপনি কিছু মনে করেননি তো!
হেমাঙ্গ মাথা নেড়ে বলে, আপনার গলার স্বর এত অ্যাট্রাকটিভ এবং যা বলেন তাতে এত কনভিকশন থাকে যে শুনতেই হয়। আমি শহুরে মানুষ, তার ওপর মডার্ন টেকনোলজির অন্ধ ভক্ত। তাই বোধ হয় আপনার সঙ্গে আমার চরিত্রের একটু পার্থক্য আছে।
কৃষ্ণজীবন যে অভ্যন্তরের একটা অস্থিরতা সবসময়ে ঢেকে রাখে বা রাখতে চেষ্টা করে তা বুঝতে খুব একটা কষ্ট হয় না।
সেই অস্থিরতায় হঠাৎ মাথা নেড়ে কৃষ্ণজীবন বলে উঠল, টেকনোলজি! নিশ্চয়ই টেকনোলজিরও দরকার। সেই টেকনোলজি আমাদের লোভ দেখাবে না, অলস করবে না, বস্তুর ভার বাড়িয়ে না। টেকনোলজি হবে হেলপাফুল। অতিরিক্ত টেকনোলজি প্রকৃতির নিয়মকে গুরুত্বহীন করে দিতে চায়। আমাদের প্রকৃতিরও যে একটা ভূমিকা আছে সেটা কিছুতেই বুঝতে চায় না মানুষ।
কিন্তু এবার তাকে বুঝতেই হবে বুঝতেই হবে।
ডারলিং আর্থ বইটা আপনি কি এসব নিয়েই লিখেছেন?
হ্যাঁ, ওইসব, আরও অনেক কিছু। হয়তো পড়ে লোকে হাসবে। তবু আমার কথা তো আমাকেই বলতে হবে। তাই না?
তা তো বটেই। কবে বেরোচ্ছে বইটা?
হয়তো অক্টোবরের শেষে। আমাকে লস এঞ্জেলেসে যেতে হবে। ওরা যখন কোনও বই পাবলিশ করে তখন খুব একটা পাবলিসিটি দেয়। লেখককে সাংবাদিকদের মুখোমুখি বসিয়ে দেয়। অনেক রকম প্রশ্ন করা হয়। চোখা চোখা প্রশ্ন।
বলে খুব হাসল কৃষ্ণজীবন। যেন ব্যাপারটা খুব মজার।
হেমাঙ্গর কাছে মোটেই মজা বলে মনে হচ্ছিল না।
এই ক্ষ্যাপাটে লোকটা মার্কিন সাংবাদিকদের গোলমেলে, ক্ষুরধার সব প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে তো? পারবে হয়তো। কারণ কৃষ্ণজীবনকে যতই গ্ৰাম্য বা ক্ষ্যাপাটে মনে হোক, দুনিয়ার জ্ঞানীগুণীরা তো একে রাহাখরচ দিয়ে সম্মানের সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে এর কথা শুনবার জন্যই!
কিন্তু আডা মারার পক্ষে লোকটা ভাল কি? মোটেই নয়। সবসময়ে যেন অন্যমনস্ক, সবসময়ে মুখের ভাব পাল্টে যাচ্ছে। ভিতরকার একটা অস্থিরতার সঙ্গে যেন লোকটার নিরন্তর লড়াই। এ আড্ডাবাজ মানুষই নয়।
কৃষ্ণজীবন অনেকক্ষণ নীরবে বসে রইল। একটাও কথা বলল না।
হেমাঙ্গও চুপ করে বসে রইল।
এক সময়ে কৃষ্ণজীবনই নীরবতা ভেঙে প্রশ্ন করল, আপনি টেকনোলজির এত ভক্ত কেন বলুন তো!
আমি টেকনোলজি বা প্রকৃতি সব কিছুরই ভুক্ত। তবে আধুনিক যন্ত্রপাতি আমাকে খুব মজা দেয়। ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ, সোলার কুকার। হয়তো আমি নিজে টেকনিক্যাল লোক নই বলেই একটা বিস্ময় কাজ করে। আবার গাছপালা, সবুজ ক্ষেত, নদী এসবও ভাল লাগে। তা না হলে কি প্রায় প্রতি উইক-এন্ড এই গায়ে যাই শখ করে?
কৃষ্ণ জীবন একটু হাসল। বলল, নিশ্চয়ই। ভালবাসাটাই আসল জিনিস।
নিশ্চয়ই এবং ভালবাসাটাই আসল জিনিস এ দুটো কথাকে মেলাতে পারল না হেমাঙ্গ। কথাগুলো তার কথার প্রকৃত জবাবও নয়। কৃষ্ণজীবন কি তাহলে নিজের সঙ্গে কথা বলছে? তার সঙ্গে নয়? এ কি সলিলোকি? হেমাঙ্গ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কৃষ্ণজীবনের মতো লোকেরা একটা ভিন্ন স্তরে বাস করে। এরা ঠিক তার লেভেলের মানুষ নয়।
রিয়া যখন কচুরির থালা নিয়ে এল তখন ঘরের আবহাওয়াটাই গেল পাল্টে। নীরবতার বলয়টা ভেঙে স্বাভাবিক হল আবহ। খেতে খেতে আর একটা ব্যাপারও লক্ষ করল হেমাঙ্গ। কৃষ্ণজীবন খেতে ভালবাসে। খুব প্যাশন নিয়ে, আবেগ নিয়ে খায়। উপভোগ করে না, ক্ষুধার্তের মতো আক্রমণ করে খাদ্যবস্তুকে।
রিয়া বলল, আচ্ছা, আপনি কেন একা থাকেন বলুন তো? নিজের বাড়িঘর ছেড়ে একা একটা মস্ত বাড়িতে থাকেন, তাই না?
একা থাকার একটা আলাদা মজা আছে।
ভয়-ভয় করে না?
কিসের ভয়? ভূতের নাকি?
রিয়া খুব হাসল, বলল, আমার কিন্তু খুব ভূতের ভয়। এই যে ফ্ল্যাট দেখছেন। এখানেই একা থাকতে হলে আমি ভয়ে মরে যাবো।
না, আমার ভূতের ভয় নেই।
চারুশীলা খুব আপনার কথা বলে। মুখে বাউণ্ডুলে লক্ষ্মীছাড়া বললেও ভীষণ ভালবাসে আপনাকে।
হ্যাঁ, তা বাসে। কিন্তু মাঝে মাঝে সেটা প্রায় আমার গলার ফাঁস হয়ে ওঠে।
বিয়েতে নেমন্তন্ন করবেন তো?
বিয়ে! বলে হেমাঙ্গ হা করে রইল, কার বিয়ে?
আপনার।
আমার? এ খবর কে দিল আপনাকে?
কোন চারুশীলাই তো বলছিল।
কী বলছিল?
একজন বলোতফেরত সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে আপনার বিয়ে। নামটাও জানি। রশ্মি রায়।
কী সর্বনাশ! দোষী জানিল না। কী দোষ তাহার, বিচার হইয়া গেল!
ও মা, আপনি জানেন না নাকি?
না তো! রশ্মির সঙ্গে আমার একটুখানি মাত্র বন্ধুত্ব। তাও অডিট করতে গিয়ে। নাথিং সিরিয়াস।
কিন্তু চারুশীলা যে খুব জোর দিয়ে বলল।
ওর কথা একদম বিশ্বাস করবেন না। দিনকে রাত করতে পারে।
আচ্ছা যা হোক, আমি তো ধরেই নিয়েছিলাম যে আপনার বিয়ে।
লোককে বোকা বানাতে চারুশীলার জুড়ি নেই।
রশ্মি কিন্তু ভীষণ ভাল মেয়ে। বিয়ে করলে বেশ মানোত আপনার সঙ্গে।
বিয়ের প্রশ্নই ওঠে না।
কেন বলুন তো!
এমনিই। রশ্মির মতো মেয়ে আমাকে বিয়ে করতে চাইবে কেন? চারুন্দির যত সব আকাশ-কুসুম চিন্তা।
এলূর শুধু অবাক হয়ে রিয়া বলল, ও মা, সে কি কথা! কে বলল আপনাকে যে রশ্মি আপনাকে বিয়ে করবে না?
এ মা! আপনি কিছুই জানেন না। রশ্মির সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে যে।
