ভালবাসা কি বাইরের জিনিস কৃষ্ণজীবনবাবু? সেটা তো ভিতরের জিনিস। ভালবাসা আপনার ভিতরেই ছিল।
কৃষ্ণজীবন সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে সায় দেয়, ঠিক ঠিক। সব ঠিক কথা। একটা গ্রামের সঙ্গে সেই গ্রামের একটা ছেলের সম্পর্ক কোনও হাইল ফিলজফিক্যাল জিনিস নয়। আমি জানি। বিষ্টুপুর আমাদের দেশও নয়। আমরা উদ্বাস্তু ঢাকা জেলার আর একটা গ্রাম থেকে আমরা ওখানে এসে ডেরা বাধি। আমার বাবা এখনও দাখিল্যা গ্রামের কথাই বলেন, তার আজন্মকৈশোরের গ্রাম। কিন্তু বিষ্টুপুর হ্যাজ সামথিং ফর মি। আমি কি হিপনোটাইজড? কে জানে! আমার মনে হয়, সব জায়গা ছেড়ে আমি একদিন ওখানে ফিরে যাবো।
তা কেন? আপনার ফিল্ড তো অনেক বড়।
জানি, জানি। আমার ফিল্ড তো সারা পৃথিবী। তবু আপনাকে বলছি, বিষ্টুপুর আমাকে পৃথিবীকে চিনতে শিখিয়েছে। আমি তো অকৃতজ্ঞ নই।
মনে মনে হেমাঙ্গ বলল, আপনি একটি পাগল। মুখে বলল, ঠিক কথা। কেন বলল তা সে বুঝতে পারল না।
কৃষ্ণজীবন হঠাৎ খুব অন্যমনস্ক হয়ে গেল। ভাবালু গলায় বলল, দিনরাত লোকের ঝগড়া করত, দলাদুলি করত, প্রায়ই দাঙ্গাহাঙ্গামা হত, খুব কুটকচালি হত, ইস্কুলে লেখাপড়া একদম হত না। বিষ্টুপুরের সবই ছিল খারাপ। বিচার করে দেখলে, বিষ্টুপুরের কোনও সৌন্দৰ্যও ছিল না। তবু যখন আমি নিজের হাতে চাষ করতাম তখনই মনে হত বিষ্টুপুরের মাটির ভিতর থেকে একটা প্ৰাণের স্পন্দন লাঙল বেয়ে আমার শরীরে উঠে আসছে। বর্ষাকালে ভীষণ বাজ পড়ত, ঝড়বাদল তো ছিলই। কিন্তু ভয় করত না। খোলা মাঠের মধ্যে, ঝড়-বাদলে, বজপাতের মধ্যে খুব তুচ্ছ লাগত নিজেকে। মনে হত, এই তো এইটুকু মাত্র আমি। আমি মরে গেলেও তো কিছু নয়। ওই বিরাট আকাশ, ভীষণ বৃষ্টি, মস্ত নীল আগুনের ঝলক–এত ঘটনার মধ্যে আমার মৃত্যু এমন কীই বা! শুধু আমার মতো একটা পোকাকে মারার জন্য তো ভগবান এত আয়োজন করেননি। তিনি আমাকে দেখাচ্ছেন কত বড় তিনি, কত তাঁর ক্ষমতা। আমি কি বোঝাতে পারছি আপনাকে? আমি গুছিয়ে কথা বলতে পারি না।
আপনি বোঝাতে না পারলেও আমি কিন্তু বুঝতে পারছি। আপনি কি ঈশ্বর মানেন? কয়েকবার ভগবানের কথা বললেন, সায়েন্টিস্টরা তো নাস্তিক হয়।
কেউ কেউ হয়। আমি নাস্তিক কিনা তা কে বলবে? আসলে বিশ্বজগৎটা এত বিরাট, ইনফাইনিট যে, আমার ব্রেন ফেল করতে থাকে। একটা সময় আসে যখন আমরা সবাই স্তব্ধ ও মুক হয়ে যাই। আকাশটা কোথাও শেষ হচ্ছে না, আর সময় নিরবধি কেবলই বয়ে চলেছে। শুরু নেই, শেষ নেই। খুব গভীরভাবে ভাবলে আপনিও দেখবেন, স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়, কথা হারিয়ে যায়। ওই স্তব্ধতাই বোধ হয় ঈশ্বর। তাই না? নাকি আমি ফের গুলিয়ে ফেলছি। সব?
হেমাঙ্গ মৃদু হেসে মাথা নাড়ল, গুলিয়ে ফেলেননি। তবে প্রসঙ্গ ছিল বিষ্টুপুর।
হ্যাঁ হ্যাঁ, বিষ্টুপুর। আমি বিষ্টুপুরের কথাই তো বলছি। আমি যখন ছোট ছিলাম তখন বিষ্টুপুরের বাইরের জগৎটাকে তো জানতাম না। কিন্তু ওখানকার জল-হাওয়া-মাটি আমাকে কিছু বলতে চাইত। আমার বন্ধুর মতো ছিল সব। আপনি শুনলে হাসবেন, আমি গাছের সঙ্গে, পোকামাকড়ের সঙ্গে, কুকুর-বেড়াল-গরুর সঙ্গে, পাখির সঙ্গে কথা বলতাম। খাওয়ার কষ্ট, পরার কষ্ট, অত পরিশ্রম, তবু মন ভাল থাকত। সবসময়ে যেন আনন্দ একটা নদীর মতো কুলকুল করে বয়ে যেত বুকের ভিতর দিয়ে। আমি কি ভাবালু হয়ে যাচ্ছি?
না। বেশ তো বলছেন।
আসলে তখন খুব মনে হত, আমি কখনও একা নই। আমার সঙ্গে বিষ্টুপুরের গাছপালা, পশুপাখি সবাই আছে। ওই যে ভালবাসা ওটাই আমাকে এখনও ধরে রাখে। বাঁচিয়ে রাখে। এখন তো বুড়ো হতে চললাম, কত বয়স হল, তবু মনে হয় এখনও এক যুক্তিহীন বাচ্চা ছেলে আমাকে হাত ধরে বিষ্টুপুরের দিকে কেবলই টানে। খুব টানে। S ay
হেমাঙ্গ মাথা নেড়ে বলে, এরকম হতেই পারে।
আচ্ছা, বসুন। আপনার সঙ্গে আমি খুব অভদ্রতা করছি। বাড়ীর কারও সঙ্গে বোধ হয় আপনার পরিচয় নেই!
হেমাঙ্গ মৃদু হেসে বলে, কেন থাকবে না। আপনার স্ত্রীর সঙ্গে আমার তো পুরনো আলাপ। ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম, মনে নেই?
ওঃ, তা হবে। বলে কৃষ্ণজীবন খুব হাসল, আমার কিছু মনে থাকে না।
শুধু বিষ্টুপুরের কথা খুব মনে থাকে, না?
কৃষ্ণজীবন যখন হাসে তখন তার মুখখানা সত্যিই শিশুর মতো হয়ে যায়। হাসিটা হেসে কৃষ্ণজীবন ঘর ছেড়ে চলে গেল এবং এক মিনিটের মধ্যেই ফিরে এল রিয়াকে নিয়ে।
দেখ, কে এসেছেন।
রিয়া তটস্থ হয়ে বলে, আগে বলবে তো? ডোরবেল শুনেছিলাম, কিন্তু বুঝতে পারিনি কে এসেছে। ছিছি, দেখুন তো, শুকনো মুখে এতক্ষণ বসে আছেন!
ব্যস্ত হবেন না। আমি এর কথা শুনছিলাম।
রিয়া হাসল, আজকাল খুব কথা বলে। আগে কিন্তু মুখ থেকে কথাই বেরোতো না। ভীষণ গভীর আর মুখচোরা ছিল। তবে সব বিষয়ে নয়, মনের মতো বিষয় পেলে তবেই বলে।
কৃষ্ণজীবন লাজুক মুখে বসে রইল, যেন অপরাধ হয়েছে।
রিয়া জিজ্ঞেস করে, কী খাবেন বলুন তো! নোনতা কিছু করে দিই?
বলতে নেই হেমাঙ্গ খেতে ভালবাসে। ফটিকের হাতের রান্না বা হোটেলে খেয়ে সেরকম তৃপ্তি নেই। বিশেষ করে ভোজনরসিকদের। সুতরাং কেউ খাওয়াতে চাইলে সে খুব একটা প্রতিবাদ করে না।
তবে পেটুক না ভাবে সেই জন্য নরম করে একটু আপত্তি করল, না না, ঝামেলা কেন করবেন?
ঝামেলা হবে কেন? আমার একজন ভাল। রাঁধুনী আছে। কচুরি খাবেন তো? আর হিং দিয়ে আলুর দম?
