এরকম অদ্ভুত ধরনের সমস্যায় পীড়িত হয়ে হেমাঙ্গর দিন কাটছে। না, সাদামাটাভাবে কাটছে না। তার মধ্যেই কাজ করতে হচ্ছে। বিস্তর ইনকাম ট্যাক্স থেকে বিপন্ন ক্লায়েন্টদের উজ্জ্বল উদ্ধার করতে হচ্ছে। আইন ও হিসেবের নানা জটিল, কুটিল এবং জটিলতর ফন্দিফিকিরে মন দিতে হচ্ছে। পেঁতে হাসি হাসতে হচ্ছে এবং ফাঁকে ফাঁকে ভাবতে হচ্ছে, কেন তার একটা পারসোন্যাল কমপিউটার দরকার। শুধু অন্যদের বোঝালেই চলবে না, নিজেকেও বোঝাতে হবে। টেকনোলজি-মুগ্ধ, বেহিসাবী হেমাঙ্গর মধ্যে আবার একজন হিসাবী ও সতর্ক যুক্তিবাদী হেমাঙ্গও বাস করে। কিছু কিনলেই তার দ্বৈত সত্তায় একটা দ্বৈরথ উপস্থিত হয়। তখন হেমাঙ্গ একটা আত্মগ্লানিতে কষ্ট পায়।
গাঁয়ের নাম বিষ্টুপুর। স্কুলেরও একটা বড়সড় নাম আছে। বাসরাস্তায় নেমে মাইলটাক হাঁটতে হল হেমাঙ্গকে। তারপর যথারীতি খাতির যত্ন এবং বিশ্রী গরমিলে ভরা হিসেবের খাতা নিয়ে বসতে হল। ব্যাপারটা একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে। স্কুল অডিটের কাজটা এবার ছাড়তে হবে তাকে ছেড়েই দিত, শুধু শহুরে গন্ধটা গা থেকে ঝেড়ে ফেলতেই মাঝে মাঝে গায়ে আসা।
কাজের ফাঁকে ফাঁকে হেডস্যার নানা গল্প ফেঁদে বসছিলেন। তার মধ্যেই হঠাৎ চেনা নামটা আচমকা জানালা দিয়ে উড়ে আসা একখানা পাটকেলের মতো পড়ল। কৃষ্ণজীবন। হেডস্যার বলছিলেন, এই স্কুল থেকেই পাশ করে গেছে ডিস্ট্রিক্ট স্কলারশিপ নিয়ে। স্ট্যান্ডও করেছিল। এখন দুনিয়াজোড়া নাম। মস্ত এনভিরনমেন্টালিস্ট। চেনেন নাকি?
হেমাঙ্গ একটু অবাক হয়ে বলে, বিলক্ষণ চিনি। এই গাঁয়ে বাড়ি?
আজ্ঞে। তার মা বাপ ভাই সব এখানে। আমেরিকা থেকে শিগগির একটা বইও বেরোবে শুনছি। ডারলিং আর্থ।
অতটা আবার হেমাঙ্গ জানত না। বলল, পাবলিক না জানুক আমি তাঁকে জানি।
কাজ শেষ করে কৃষ্ণজীবনের গ্রামটা একটু ঘুরে দেখল হেমাঙ্গ। আর পাঁচটা গায়ের মতোই গরিব সাধারণ গাঁ। গৌরব করার মতো কিছুই নেই। কৃষ্ণজীবনের মতো দু-চারজন লোকের জন্যই যা একটু অহংকার।
ফিরে এসে পরদিন অফিস থেকেই কৃষ্ণজীবনের বাড়িতে ফোন করল সে। এবং আশ্চর্যের বিষয়, কৃষ্ণজীবনকে বাড়িতেই পেয়ে গেল। অধ্যাপকদের ওই এক সুবিধে, সপ্তাহে একাধিক ডে অফ।
একটু উৎসাহিত গলায় হেমাঙ্গ বলল, আরে মশাই, আমি তো আপনার গায়ে ঘুরে এলাম। একটা অডিটে গিয়েছিলাম।
কৃষ্ণজীবনের গলায় একটা আলাদা মাত্রা যোগ হল, গিয়েছিলেন? কী দেখলেন?
কী আর দেখব? দেয়ার ইজ নেচার, মাঠ ঘাট পুকুর অ্যান্ড এভরিথিং।
কৃষ্ণজীবন মৃদু শব্দে হাসল, দেখেননি।
কী দেখিনি?
কিছুই দেখেননি। বাইরে থেকে কি দেখা যায়?
তা অবশ্য ঠিক। আমার তো সেন্টিমেন্টটা নেই, আপনার মতো।
সেন্টিমেন্ট এক মস্ত জিনিস। খুব মূল্যবান। লোকে কেন যে আজকাল আর এর মূল্য দেয় না।
একটু দেয়। এখনও দেয়।
দেয় না হেমাঙ্গবাবু। লোকে শিকড় ভুলে যাচ্ছে।
জানি কৃষ্ণজীবনবাবু।
দুঃখের বিষয় কী জানেন? যারা ওই গাঁয়ে থাকে তারাও গ্রামটাকে ভাল করে চেনে না। কূটকচালি নিয়ে মেতে আছে।
সে কথাও ঠিক। কিন্তু আমার একটু হলেও সেন্টিমেন্ট আছে। আমি গাঁয়ে যাই শহরের গন্ধ গা থেকে মুছে ফেলতে। কিছুক্ষণের জন্য।
আজ অফিসের পর চলে আসুন, আড্ডা মারা যাবে।
আপনার সময় নষ্ট হবে না তো! শুনেছি আপনি খুব ব্যস্ত মানুষ।
তাতে কি? আপনার কাছে আমার গায়ের গল্প শুনব সেটা কি কম লাভ?
আপনি সত্যিই বিষ্টুপুরকে ভীষণ ভালবাসেন, না?
ভীষণ।
আপনার কি আমেরিকা থেকে বই বেরোচ্ছে একটা।
লাজুক কৃষ্ণজীবন সংকুচিত গলায় বলে, বেরোচ্ছে একটা। ওরকম কত বেরোয়।
বইটার নামও আমি শুনে এসেছি। ডারলিং আর্থ।
কৃষ্ণজীবন মৃদু স্বরে বলল, ওরা খবর রাখে বুঝি?
খুব রাখে। আপনার কথা বলতে তারা গর্ব অনুভব করে।
চলে আসুন, কথা হবে।
হেমাঙ্গর সময়ের অভাব নেই। অফিসের পর কোথাও যেতে তার খারাপও লাগে না। দুটো কথা শুনলে বা বললে সময়টা কাটে। অফিস থেকে বেরিয়ে একটা মিষ্টির প্যাকেট কিনে নিল হেমাঙ্গ। তারপর সোজা গাড়ি চালিয়ে চলে এল গোলপার্কের কাছে।
কৃষ্ণজীবন তাকে সোজা নিয়ে গেল নিজের ঘরে। বসাল। পাখা খুলে দিল। তারপর খাপ পেতে বসল। তার মুখোমুখি। লোকটা পণ্ডিত মানুষ, কিন্তু চেহারাখানা গুলবাগের মতো। এখনও মাসকুলার, শক্তিপোক্ত এবং দুর্দান্ত হ্যান্ডসাম। চোখ দুখানা ঝলমল করছে অভ্যন্তরী জীবনীশক্তি এবং উদ্দীপনায়।
বলুন কেমন দেখলেন বিষ্টুপুর। ওই গাঁয়ে আমি বড় কষ্ট করে বড় হয়েছি। খাওয়া পরার কষ্ট, মানুষের ব্যবহার দেখে কষ্ট, দারিদ্র্য দেখে কষ্ট। কিন্তু সব সত্ত্বেও কিছু একটা ছিল। সেটা আজও অজানা থেকে গেছে। কিছুতেই বুঝতে পারি না। বিষ্টপুরের ওপর কেন আমার এত মায়া।
সেটাই তো স্বাভাবিক।
সোৎসাহে ঘাড় নাড়ল কৃষ্ণজীবন, হ্যাঁ হ্যাঁ, সে তো ঠিকই। আপনি সেন্টিমেন্টের কথা বলছিলেন। এটা সেই সেন্টিমেন্টই হবে। কিন্তু সেন্টিমেন্টেরও একটা লজিক থাকে, রুট থাকে। আমি সেইটে খুঁজে পাই না। আপনার চোখ দিয়ে কি দেখলেন বলুন।
হেমাঙ্গ লোকটার ছেলেমানুষের মতো আবেগ দেখে একটু হাসল। অবাকও হল। বলল, আর পাঁচটা গাঁয়ের মতোই তো।
সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে সায় দিল কৃষ্ণজীবন, সে তো ঠিক কথা। বরং আরো অনেক গ্রামের চেয়ে বিষ্টুপুর আরও শ্ৰীহীন। আরও গরিব, আরও কম সবুজ। নাম বিষ্টুপুর। লোকে তাচ্ছিল্য করে বলে বিষ্টুপুর। তবু বিষ্টুপুর আমাকে শিখিয়েছে কি করে পৃথিবীকে ভালবাসতে হয়।
