দুর বোকা! কী সব বকছিস? বাইরের জগৎ হল বাইরেরই জগৎ। ভিতর আর বাইরের মধ্যে তফাৎ থাকবে না?
আমার কী মনে হয় জানোমা? শুনলে তুমি হাসবে। আমার মনে হয়, আমার যদি লক্ষ লক্ষ মা-বাবা থাকত, কোটি কোটি ভাই-বোন থাকত তাহলে বেশ হত।
অপর্ণা সত্যিই হেসে ফেলল। বলল, আচ্ছা, তোর মাথায় এমন অদ্ভুত সব কথা আসে কেন রে?
তাহলে আমি কত মানুষের আদরের ঝুমকি হতে পারতাম বলো তো!
আমি তো সাত দিন সাত রাত্তির ধরে বসে ভাবলেও এরকম অদ্ভুত কথা মাথায় আসত না।
আমার মাথায় এরকম অনেক কথা আসে মা। আচ্ছা আমি কি একটু ছিটিয়াল?
তোমরা সবাই একটু ছিটিয়াল। বিশেষ করে তোমার বাবাটি। বাবার কাছ থেকেই পেয়েছো তোমরা।
তুমি যে বাবাকে এত ভালবাসো তা তো বাবা একটু ছিটিয়াল বলেই! নরম্যাল গেরস্থ হলে এত ভালবাসতে পারতে?
অপর্ণা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ভালবাসার কথা তুই কী জানিস রে ঝুমকি? ভালবাসার মধ্যেও যে কত কাটা, কত জ্বলুনি তা যদি জানতিস!
০৪০. গত সাত দিন ধরে হেমাঙ্গ ভাবছে
গত সাত দিন ধরে হেমাঙ্গ ভাবছে। ভাবছে, একটা পারসোন্যাল কমপিউটার তার দরকার আছে কিনা। উইথ প্রিন্টার। সাদামাটাভাবে দেখতে গেলে, দরকার নেই। কারণ তার অফিসেই কমপিউটার রয়েছে। তার জীবিকার যাবতীয় তথ্য তার মধ্যেই স্কোর করা আছে। সুতরাং আপাতদৃষ্টিতে দেখতে গেলে তার পি-সি-র কোনও প্রয়োজন নেই। কিন্তু উপর-উপর চিন্তা করে সমাধানে পৌঁছানো না গেলে গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত। অনেকটা তলিয়ে দেখলে হয়তো ব্যক্তিগত কমপিউটার কেনার একটা যুক্তিসঙ্গত কারণ সে খুঁজে পাবে। লোকের কাছে জবাবদিহি বা অজুহাত খাড়া করাটাই তো সবচেয়ে বড় সমস্যা। তাই সাতদিন ধরে সে গভীরভাবে ভাবছে। ভাবতে গিয়ে চৌরঙ্গীর কাছে ট্রাফিক লাইট ভায়োলেট করে সে ট্র্যাফিক পুলিশের ধমক খেয়েছে। আনমনে আটকাতে গিয়ে একটা পুরনো আমলের পার্কার ড়ুয়োফোল্ড কলমের ক্যাপের প্যাঁচ কেটে ফেলেছে। এবং রশ্মি রায় একদিন ফোন করে আমি রশ্মি বলায় সে গভীর অন্যমনস্কতার সঙ্গে প্রশ্ন করেছে, কে রশ্মি।
এইসব দুর্ঘটনার পরও সে অন্যমনস্কতা কাটাতে পারেনি। তার চেয়েও বড় কথা পি-সি কেনার ব্যাপারে এখনও কোনও স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। আসতে পারেনি আরও একটা গুরুতর কারণে। বন্ডেল রোডে তার সেজদি নীলা থাকে। তার দেওরের বিয়ের জন্য একখানা বাড়ি দরকার। গড়িয়াহাটের আশেপাশে এবং বন্ডেল রোডের গা ঘেঁষেই বিস্তর বিয়ে বাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়। তা সত্ত্বেও সেজদি গর্চার বাড়িতেই বউভাত করার জন্য গো ধরেছে বলে প্রায়ই যাতায়াত করছে। সেজদি আবার হিসেবী লোক। হেমাঙ্গর ঘরে জিনিসপত্রের বহর দেখে ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। প্রথম দিনই সব দেখেশুনে বলে দিল, দাঁড়া, তোর এই অপব্যয়ের কথা বাবাকে বলে দেবে। এভাবে পাগল ছাড়া কেউ টাকা নষ্ট করে?
তার পরও দিদিদের খবরদারি এবং অত্যাচার কবে বন্ধ হবে তা ভাবতে ভাবতে হেমাঙ্গ বলল, সব জিনিসই কাজে লাগে। মর্ডান টেকনোলজির খবর রাখিস না, সংসার করিস কি করে?
সেজদি রাগে গরগর করতে করতে বলল, খবর রাখি না তোকে কে বলল? ফিজিক্সে অনার্স নিয়ে বিএসসি কি এমনি এমনি পাশ করেছি? কিন্তু খবর তুই-ই রাখিস না। ওই ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে কী পরিষ্কার করিস তুই? ওতে ময়লা যায়? আমার ঘরেও একটা পড়ে আছে। গুচ্ছের টাকা নষ্ট। বিজ্ঞাপন দেখে কিনলেই হল?
হেমাঙ্গ তর্কের লাইনে না গিয়ে মোলায়েম গলায় বলল, তোর দেওরের কোথায় বিয়ে ঠিক হল রে? দেনা-পাওনা কি রকম?
বিয়ে এবং দেনা-পাওনা দুটো জিনিসকেই হেমাঙ্গ আদ্যন্ত ঘেন্না করে। কিন্তু সে এও জানে, মেয়েদের বিবাহ প্রসঙ্গে ডাইভার্ট করতে পারলে তারা আর অন্যান্য তুচ্ছ জিনিস নিয়ে মাথা ঘামাবে না। হলও তাই। নীলা ডাইভার্টেড হয়ে গেল। দেওরের বিয়ের এবং দেনা-পাওনার একটা বিস্তারিত বিবরণ দিতে গিয়ে হেমাঙ্গর অপব্যয়ের ব্যাপারটা চাপা পড়ে গেল। আপাতত।
মুশকিল হল, সেজদি আজকাল মাঝে মাঝে আসছে। একতলায় অনেক জায়গা। বিয়ে উতরে যাবে। সেখানে মজুর। লাগিয়ে সারাই, ঝাড়পপাঁচ এবং রং হচ্ছে। যতদিন বিয়েটা না পার হয় ততদিন পিসি কেনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েও কোনও লাভ নেই। কেনা যাবে না। সেজদি তাহলে ফ্যাসাদে ফেলে দেবে। কারণ, রোজ দুপুরে সেজদি মিস্তিরিদের কাজ দেখতে এসে তার ঘরেই জিরোয়। ড়ুপ্লিকেট চাবি চেয়ে নিয়েছে।
মাইকেলের কয়েকটা লাইন আজকাল প্রায়ই মনে পড়ে হেমাঙ্গর। কী কুক্ষণে তুই রে অভাগী, কাল পঞ্চবটী বনে কালকূটে ভরা দেখেছিলি এ ভুজগে। ভুলভাল হতে পারে, সেই ইস্কুলের পর মাইকেল আর পড়া হয়নি। তবে ব্যাপারটা মোদ্দা এরকমই। এই বুজগটি রশ্মি। কারণ চারুদি মারফত রশ্মি সম্পর্কে মেলা গুজব ছড়িয়ে গেছে তাকে জড়িয়ে। সেজদি-দেখা হলেই—নানাবিধ প্রশ্ন করছে। বিলিতি মেয়ে? মানিয়ে গুছিয়ে নিতে পারবে তো? সুন্দরী বলতে ঠিক কি রকম? রং ফর্সা না ফ্যাকাসে?
ব্যাপারটা জটিলতর করে তুলছে রশ্মি নিজেও। চারুশীলার সঙ্গে সে আজকাল প্রায় রোজ রাতে টেলিফোনে কথা কয় বলে খবর পেয়েছে হেমাঙ্গ। কি কথা হয় কে জানে! হেমাঙ্গর নিজের ফোন তিন চারদিন হল ডেড। চারুদির কাছ থেকে কোনও রানিং কমেন্টারি পাওয়া যায় না। কিন্তু উদ্বেগ রয়েছে। খুব উদ্বেগ। তার পায়ের তলায় কি ভূমিক্ষয় শুরু হল? দুটি মেয়ে যখন পরস্পরের সঙ্গে কথা বলে তখন কত কি হয়ে যেতে পারে। চারুদির সঙ্গে রশ্মির এত কিসের কথা? কেন কথা? তাকে নিয়েই কি কথা হয় ওদের?
