ঝুমকি তার রোগা করুণ মুখখানা তুলে বলে, আচ্ছা মা আমি কেমন মেয়ে বলো তো!
ও আবার কি কথা? কেমন মেয়ে আবার কি।
মা, আমি তো একদম গোল্লামাটা একটা মেয়ে তাই না?
গোল্লা আবার কিসে পেলি?
সব ব্যাপারে। চেহারায় গোল্লা, লেখাপড়ায় গোল্লা, কাজেকর্মে গোল্লা, স্মার্টনেসে গোল্লা। আমাকে নিয়ে কী করবে তুমি?
কম্পিউটারের পরীক্ষায় ফেল করেছিস নাকি?
সে না হয় করব। কিন্তু সে কথা বলছি না। আমি ভাবছি, আমার মতো একটা অপদাৰ্থ মেয়েকে দিয়ে কি হবে? আমার বেঁচে থাকারই কোনও মানে হয় না।
হঠাৎ এত নিজেকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিস কেন?
আজকাল আমি মাঝে মাঝে নিজের একটা অ্যাসেসমেন্ট করি। করতে গিয়ে সব ব্যাপারেই দেখি, আমি ভীষণ বাজে। এমনকি বুবকা আর অনুও কত ভাল আমার চেয়ে।
পাঁচটা ছেলেমেয়ে কি সমান হয়?
তা তো হয় না মা। কিন্তু যে খারাপ তার তো নিজের একটু করুণা হবেই। সে তো জানতে চাইবেই যে, সে কেন আর পাঁচজনের মতো ভাল নয়।
অপর্ণা বিছানায় বসে মেয়ের দিকে চেয়ে বলল, তোর মাথায় মাঝে মাঝে পোকা ঘুরে বেড়ায়। কেন, তোকে কি কেউ খারাপ বলেছে?
মুখের ওপর কি কেউ বলে? বুঝে নিতে হয়।
কার কাছ থেকে কি বুঝলি?
সে আছে।
তুই এত চাপা কেন বল তো! মায়ের কাছে মেয়েরা তো সব খুলে বলে। তুই কখনও কিছু বলিস না। কেন রে? আমাকে মা বলে মনে হয় না তোর?
তুমি খুব ভাল-মা। একটু রাগী, তবু ভাল।
ভাল হয়েই তো মরেছি। ভাল বলেই তো তোরা কেউ গ্রাহ্য করিস না আমাকে।
তা নয় মা। আমার সবসময়ে কথা বলতে ভাল লাগে না।
সে জানি, তোমার বুক ফাটলেও মুখ ফোটে না। কিন্তু এরকম কি ভাল! মানুষ মনের ময়লা কথা দিয়েই তো কাটিয়ে দেয়। কি হয়েছে তোর?
অমনি তুমি দুশ্চিন্তা শুরু করলে নাকি?
মা হলে বুঝবি, সন্তানের জন্য মায়ের বুক কেমন সবসময়ে দুরুদুরু করে।
দুর! দুরুদুরু করার মতো কোনো ঘটনাই নয়।
তাহলে বলতে দোষ কি?
ঝুমকি হেসে ফেলে বলে, কি হয়েছে জানো? আমার একটু পরশ্ৰীকাতরতা এসেছে।
সেটা আবার কি?
সেদিন চারুশীলামাসির বাড়িতে একটা মেয়েকে দেখলাম, সে বিলেতে জন্মেছে, পড়াশুনা করেছে, এরপর আবার ওখানেই গিয়ে থাকবে।
তা ওরকম তো কতই আছে। আজকাল কত ছেলেমেয়ে বিদেশে থাকে।
তা তো থাকেই। মেয়েটা দেখতেও দারুণ ভাল, লেখাপড়ায় ব্রিলিয়ান্ট, ব্যক্তিত্ব আছে। এত ভাল লাগল মেয়েটাকে। একটুও অহংকার নেই। সোশ্যাল ওয়ার্ক হিসেবে একটা গায়ের স্কুলে পড়ায়। এই মেয়েটার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর থেকেই কেমন যেন নিজের কথা ভেবে মনটা খারাপ হয়ে যায়।
কেন রে ঝুমকি, তুই কিছু খারাপ আছিস?
তা নয় মা। খারাপ কেন থাকবো? বেশ তোে আছি। কিন্তু মাঝে মাঝে ভীষণ মনে হয়, আমার আর কিছু গুণ থাকলে বেশ হত। অন্তত দেখতেও যদি সুন্দর হতাম।
তুই কি দেখতে খারাপ? একটু রোগা, এই যা। যার চোখ আছে সেই জানে, তোর মতো মুখচোখ খুব কম মেয়ের আছে।
মায়ের চোখ দিয়ে দেখোনা মা। মায়ের চোখ সবসময়ই ভুল দেখে। কোন মায়ের কাছে তার মেয়ে অসুন্দরী বলে তো! আর একটু ক্রিটিক্যালি দেখ তো!
খুব ক্রিটিক্যালি দেখেই বলছি। আমার মতো খুঁটিয়ে তো কেউ কখনও তোকে দেখেনি। যখন আঁতুড়ে ছিলি তখন থেকে তোর দিকে চেয়ে চেয়ে দেখতাম।
জানি মা। তুমি তোমার প্রথম সন্তানকে দেখবে, এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু কী দেখলে মা? বেশী ভালবাসা, আদর আর আবেগ থাকলে কি আসল চেহারা চোখে পড়ে।
আচ্ছা, তোর চেহারার সেদিন কেউ কোনও নিন্দে করেছে?
না তো! তাই কেউ করে? চেহারাটাই তুমি ধরছে কেন, আর কোন দিক দিয়েই বা আমি কি হয়েছি বলে তো!
তোকে নিয়ে আর পারি না বাপু। হঠাৎ যে কেন এত শোকতাপ!
মা, আমার খুব ইচ্ছে করে একটা বিদেশী শহরে গিয়ে থাকি। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, সুন্দর একটা শহর। শীতকালে বরফ পড়বে, বসন্তকালে গাছপালা ফুলে ভরে যাবে, খুব সবুজ হবে মাঠঘাট।
বিদেশে যেতে চাস? তোর বাবা কী বলে জানিস? বলে, আমার ছেলেমেয়েরা কেউ ইউরোপ বা আমেরিকায় গেলে আমার বোধহয় হার্ট অ্যাটাক হবে।
আমার জন্য বাবার হার্ট অ্যাটাক হবে না মা। আমি কোন গুণে বিদেশে যাবোবলো তো! কে আমাকে নেবে? কেন নেবে?
ও কথা বলিনি। যদি বিয়ে হয় বিদেশে?
ঝুমকি হেসে ফেলল, তোমার কল্পনারও বলিহারি।
অপর্ণা একটু কাছে ঘেঁষে এল, শোন ঝুমকি, সবসময়ে অত নেগেটিভ চিন্তা করতে নেই। নিজেকে যদি সবসময়ে হ্যাক-ছি করতে থাকিস তাহলে অন্য সবাইও তোকে হ্যাক-ছি করতে শুরু করবে। আমি মনে করি, যে যার নিজের মতোই হয়। তুই কেন অন্যের মতো হতে যাবি। তুই যেমন আছিস তেমনই ভাল।
ভাল তো!
নিশ্চয়ই ভাল। অন্যের মতো হতে যাবি কেন?
তাহলে তুমি কেন সবসময়ে আমাকে বকো আর বলো, তুই অমুকের মতো নোস, তমুকের মতো হলি না বলো না?
অপর্ণা হেসে বলল, রাগের মাথায় বলি।
রাগের মাথায় সত্যি কথাই তো বলো!
সত্যি হলেও হতে পারে। এই যে আপা বলে মেয়েটা, কী দস্য বল তো! আমার তো মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি ওর মতো সাহসী হলে বেশ হত। সব মেয়েরই এরকম হওয়া উচিত। আবার ভাবি, দুর! আপার মতো আপা হোক, সবাই কেন হতে যাবে!
আমি কদিন যাবৎ কী ভাবছি জানো? এই যে আমি, আমার যা আদর, যা ইস্পান্স তা শুধু তোমার আর বাবার কাছে, বুৰ্বকা আর অনুর কাছে। আমার যদি খারাপ কিছু হয় তোমরা গুটিকয় লোক দুঃখ পাবে। যদি আমার ভাল কিছু হয় তাও আনন্দ করবে শুধু তোমরাই। কই, বাইরের জগতে তো আমার কোনও গুরুত্বই নেই। কেউ তো ফিরেও তাকায় না আমার দিকে।
