অথচ এমন কি ব্যাপারটা ছিল? কাকার দলের ছেলেদের সঙ্গে বীণাপাণির চেনাজানা অনেকদিনের। যাত্রার দলে তারাও মাঝে মাঝে ভিড়ে যায়। আবার বর্ডার পেরিয়ে মালও নিয়ে আসে রাতবিরেতে। তারা কে কেমন লোক অত জেনে দরকার নেই। বীণার। তবে তারা মাঝে মাঝে জিনিসপত্র গচ্ছিত রেখে যায় তার কাছে। একবেলা আধবেলা পর নিয়ে যায়। এদের একজন পগা। বীণা তাকে বেশ একটু পছন্দ করে। ভারী মিষ্টি তার কথাবার্তা। চোখ দুখানা বড্ড ভাবালু। তার কাছে অনেক টাকা থাকে, ডলার থাকে, পাউন্ড থাকে। সে টাকারই কারবারি। সোনার বিকিকিনিও করে বলে শুনেছে বীণাপাণি। তবে সে কারোরই হাঁড়ির খবর নিতে যায় না। বন্ধুর মতো সম্পর্ক রেখে চলে। পগা মাঝে মাঝে তার কাছে মস্ত এক-একটা প্যাকেট জিম্মা রেখে যায়। সন্ধের পর সে যায় জুয়া খেলতে আর মদ খেতে। সঙ্গে বেশি টাকা থাকলে চোট হয়ে যেতে পারে। বীণাপাণি রেখে দেয়, কোনও কৌতূহল প্রকাশ করে না।
এ ব্যাপারটা নিয়েই নিমাইয়ের বড় অশান্তি। বারবার বলে, ওসব ছোকরাদের জিনিস গচ্ছিত রাখা ঠিক হচ্ছে না। কোনটা কী জিনিস কে জানে। হয়তো অন্ত্রটন্ত্রই রেখে গেল একটা ন্যাকড়ায় মুড়ে, বা বোমা।
অস্ত্ৰও থাকে, তবে সেটা আর নিমাইকে বলেনি বীণা। সে শুধু বলল, এ জায়গায় থাকলে হলে এদের সঙ্গে ভাব রেখেই থাকতে হয়। এরা বন্ধু থাকলে ভয় নেই।
এ ব্যাপারটা আমার বড় অশান্তির কারণ হচ্ছে।
বীণাপাণি এই ঘ্যানঘ্যান শুনে শুনে পরশু আর সহ্য করতে পারেনি। খুব এক তরফা ঝেড়েছে নিমাইকে। মুখে কোনও কথা আটকায়নি। শেষ অবধি বলেছে, তুমি এ বাড়ি থেকে বিদেয় হও। এখানে আর জায়গা হবে না।
কথাটা বলার সময় খেয়াল হয়নি যে, নিমাইকে সে যেচে নিয়ে এসেছিল।
এখন নিমাই ওই বাক্স গোছানো শেষ করে চুপচাপ বসে আছে। চোখ দুটো ছলছলে। কিছু বলবে বলে মনে করছে, কিন্তু কথা আসছে না মুখে। এত রাগারগি করল সেদিন বীণাপাণি, একটিও জবাব দেয়নি। বড় নিরীহ।
আর এত নিরীহ বলেই রেগে যায় বীণাপাণি। সে শুধু চেয়ে আছে এখন। নিমাই চলে গেলে এ বাড়িতে একা থাকবে বীণাপাণি। একটু একা লাগবে। তা লাগুক।
এখন দুজনে ঝুম হয়ে বসে আছে। বীণা তাকিয়ে আছে নিমাইয়ের দিকে। চোখে জ্বালা, রাগ আক্রোশ; নিমাই চোখ নিচু করে বসে আছে মেঝোয়। ঘরে ছুচ পড়লে শোনা যায়। লোকটার কোনও দাম নেই বাইরের দুনিয়ায়। শুধু বীণাপানির কাছে কিছু আছে। এক কানাকড়ি হলেও আছে। তবু আস্পর্ধা দেখ।
চোখে জল আসছিল বীণাপাণির। আঁচলটা চোখে তুলতে যাবে, ঠিক এই সময়ে জানলা দিয়ে একটা মুখ উঁকি দিল। পাড়ার একটা ছেলে।
বীণাদি, খবর শুনেছো? পগা কাল রাতে বটতলায় খুন হয়েছে।
অ্যাঁ!
লাশ ঘিরে দারুণ ভিড়। পুলিশ এসেছে। বলেই ছেলেটা চলে গেল।
নিমাই মুখ তুলে বীণার দিকে চাইল।
কাল রাতে পগা মস্ত একটা প্যাকেট রেখে গেছে বীণার কাছে। তাতে অনেক টাকা।
০০৪. একটা ন্যাকা বৃষ্টি
একটা ন্যাকা বৃষ্টি অনেকক্ষণ ধরে হয়ে যাচ্ছে। হয়েই যাচ্ছে। ধরছে না, কমছে না। জোরেও নয়, আস্তেও নয়। ঘ্যান ঘ্যান ঘ্যান ঘ্যান ঘ্যান ঘ্যান। একখানা পাতলা ঝরোকার মতো ঢেকে আছে চারপাশ।
বৃষ্টি খুবই ভালবাসে মণীশ। মুণীশের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলি ঘটেছে বর্ষাকালে। এমন কি অপর্ণার সঙ্গে তার, চমকপ্ৰদ প্ৰেমটাও। এখন মণীশ নার্সিং হোম-এ। শক্তিশালী ওষুধে আচ্ছন্ন। সেই গাঢ় কুয়াশার মতো আচ্ছন্নতার ভিতরে এই বৃষ্টির কোনও খবর পৌঁছোচ্ছে না। মাঝে মাঝে গভীর ব্যথায় এক একটা কাতর শব্দ উঠে আসে বুকের গহন থেকে।
মণীশের বাড়ির অবস্থাটা সন্ধে সাড়ে সাতটার সময় খুব স্নান ও স্তব্ধ। টি ভি-টা চলছে। বাংলা খবর একটু আগেই শুরু হল। টি ভি-র মুখোমুখি বসে মণীশের ছেলে অনীশ। বাবাকে নিয়ে দু রাত জাগার পর এখন তার চোখের পাতা চুম্বকের টানে জুড়ে যাচ্ছে বারবার। করুণ গলায় একবার বলেছিল অনেকক্ষণ আগে, মা, একটু চা দেবে? একটু কড়া করে?
অপর্ণা বলেছিল, দিই।
সাড়ে সাতটা নাগাদই ঝুমকি তার কমপিউটার ক্লাস থেকে ফেরে। ফিরে চা চায় বা নিজেই করে নেয়। অপর্ণা একটু দেরী করছিল চা করতে। এখনই তো ফিরবে ঝুমকি।
এ বাড়িতে কারও মন ভাল নেই বলে সংসারটাই যেন এলিয়ে পড়েছে। ছোটো মেয়ে অনু এ সময়ে রোজ স্টিরিওতে গান শোনে। রাজ্যের হিন্দি গান। অনুশীলা অর্থাৎ অনু দু রাতের টেনশনের পর বাইরের ঘরে ডিভানে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়েছে কখন।
বাচ্চা কাজের মেয়েটা রান্নাঘরের মেঝোয় বসে আটা মাখছে। রাতের রুটি হবে। ফ্রিজ খুলে অপর্ণা দেখে নিয়েছে, আনাজপাতি প্রায় কিছুই নেই। রান্না করা ডাল-ডালনাও নয়। দুদিন তাদের এসব খেয়াল ছিল না। কিন্তু আজ রাতে রাধতে হবে, খেতেও হবে-ভাবতেই গায়ে জ্বর আসছিল অপর্ণার। খিচুড়ি করলে ঝামেলা মিটে যেত। কিন্তু স্বাভাবিক বুদ্ধি তো কাজ করছে না মাথায়। খিচুড়ির কথা মনেই ছিল না।
মণীশ কি চললি? মণীশ চলে গেলে অপর্ণার কি করে চলবে?
আজ সব কাজ ফেলে রেখে অপর্ণার ইচ্ছে করছে কাউকে ডেকে গল্পটা শোনায়, তাদের প্রেম হয়েছিল কত অদ্ভুতভাবে, কী রোমান্টিকভাবে।
বৃষ্টির জন্যই দেরী হচ্ছে মেয়েটার, ভিজে আসবে বোধহয়। মেয়েটার সাইনাস, ঠাণ্ডায় এলাৰ্জি, ইসিনোফেলিয়া খুব বেশী। বাবার জন্য দুদিন ধরে মেয়েটা কেঁদোছে আর ছুটেছে। এখানে সেখানে। ঝুমকি বরাবর তার বাপের বেশী ন্যাওটা। এখনও বাপের হাতে ভাত খায়, বায়না করে, কোলে অবধি বসে।
