অবাক হয়ে ঝুমকি বলে, কী হারায়।
হেমাঙ্গ মাথা নেড়ে বলে, তা বলব না। বলতে গেলেই দেখি ঝগড়া লেগে যায়। মেয়েরা তো সহজে কিছুই মেনে নেয় না।
ঝুমকি মৃদু হেসে বলে, মানাতে পারলে মানবে না কেন?
হেমাঙ্গ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আপনার সঙ্গে প্রথম আলাপেই একটা বিবাদ হোক, আমি তা চাই না। আজ আমার নার্ভাসও লাগছে।
ঝুমকি হেসে বলে, নার্ভাস কেন? আমার পাগলী দিদিটিকে কতদিন চেনেন? খুব বেশিদিন নয়।
চিনলে বুঝতেন কেন নার্ভাস। ওই যে মেয়েটি এসেছে ওটির সঙ্গে দিদি আমার একটা মধুর সম্পর্ক তৈরি করতে চাইছে। আমি সেটা টের পাচ্ছি আর ভিতরে ভিতরে রেগে যাচ্ছি। ও যে কেন এসব কাণ্ড করে কে জানে!
ঝুমকি খুব সাবধানে বলে, রশ্মিদি কিন্তু খুব ভাল মেয়ে।
সে তো বটেই। আমিও জানি। কিন্তু ভাল মেয়ে বলেই কি তার ওপর হামলা করতে হবে? চারুদি ভালই জানে ওর এসব চেষ্টায় কিছু হবে না।
ঝুমকির এ প্রসঙ্গে কথা বলা উচিত নয়। তাই সে চুপ করে রইল।
হেমাঙ্গ নিজেই বলল, আমি ঝামেলাহীন জীবন পছন্দ করি বলেই একা থাকি। ও যে কেন আমার শান্তিটা নষ্ট করতে চায়।
দুজনে এসে যখন দোতলার মেয়েলি বসার ঘরটায় ঢুকল তখন রশ্মি চা খাচ্ছে আর চারুশীলা তাকে নিজের বোকা ভাইটা সম্পর্কে নানাবিধ বড় বড় কথা বলছে।
রশ্মি হেমাঙ্গকে দেখে মুখ টিপে হেসে বলল, আপনি লন্ডনে কিছুদিন ছিলেন, বলেননি তো!
আজকাল বিলেত যাওয়াটা তো শক্ত ব্যাপার নয়। কে না যাচ্ছে বলুন।
তা অবশ্য ঠিক। আপনাকে এতক্ষণ দেখিনি কেন? কোথায় ছিলেন?
ভাগ্নে-ভগ্নীদের একটু সঙ্গ দিচ্ছিলাম। এ বাড়িতে তো আপনি ঠিক আমার অতিথি নন, আমার দিদির অতিথি। ও একাই এত কথা বলে যে আমরা কিছু বলার চান্স পাই না।
চারুশীলা হেসে একটা ধমক দিল, অ্যাই মিথ্যুক! কবে আমি বেশী কথা বলি রে?
যে বলে সে টের পায় না। আমরা পাই।
মারব থাপ্পড়! রশ্মি, খবরদার আমার ভাইটিকে বিশ্বাস করো না। ভীষণ ফাজিল।
রশ্মি হেসে বলে, আমি ওঁকে একটু জানি। উনি মেয়েদের সামনে খেতে লজ্জা পান, আর-নারী স্বাধীনতার পক্ষপাতী
নন।
ঝুমকি মুখ লুকিয়ে হেসে ফেলল।
হেমাঙ্গ একটা চেয়ার টেনে বসে বলল, সংখ্যালঘুদের প্রোটেকশনের ব্যবস্থা সব সরকারের আছে। আমারও প্রোটেকশন দরকার। আপনারা তিন মহিলা, আমি একা।
সেইজন্যই পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন?
খানিকটা সেইজন্যও। আর আমার এ দিদিটির জন্যও। ছেলেবেলা থেকেই লোকের সামনে ও আমাকে নাকাল করে আসছে। জনসমক্ষে তাই ওর কাছাকাছি থাকি না।
তাই বুঝি? আচ্ছা, আপনাকে আমরা কেউ অ্যাটাক করব না। নিশ্চিন্ত হয়ে বসুন।
সন্ধেবেলাটা বেশ কাটছিল ঝুমকির। এক একটা বাড়ির এক এক রকম পরিবেশ। এ বাড়ির পরিবেশ তার বরাবর খুব ভাল লাগে। চারুমাসি হাসিখুশি মজার মানুষ। দারুণ সুন্দরী। সিনেমায় নায়িকার পার্ট করেছেন। সব মিলিয়ে একদম ঝলমল করছেন সবসময়। মন-খারাপ নিয়ে এলে মন ভাল হয়ে যায়। তার চেয়েও ভাল লাগছে রশ্মি রায়কে। ঠাণ্ডা মেজাজের বুদ্ধিমতী মেয়ে। কথা বলে কী সুন্দর। পাশাপাশি যদি নিজেকে তুলনা করে ঝুমকি তাহলে সে কিছুই নয়। না আছে বিচক্ষণতা, না এদের মতো বুদ্ধি, না তেমন ব্যক্তিত্ব।
কিছুক্ষণ কথা-টথা হওয়ার পর চারুমাসি হঠাৎ ঝুমকির দিকে চেয়ে বলে, এই মেয়েটা, তুমি না গান জানো?
গান! বলে ঝুমকি অবাক হয়, কে বলল?
আমি জানি, তুমি নাকি খালি গলায় দারুণ গান দাও।
না, না বলে লজ্জায় মরে যাচ্ছিল ঝুমকি। এদের সামনে গান গাইবে কি, বসে থাকতেই তার সংকোচ হচ্ছিল।
শেষ অবধি অবশ্য আপত্তি টিকল না। গাইতে হল। খুব বেছে চিন্তা করে দুটি গান গাইল ঝুমকি। রবীন্দ্রসঙ্গীত। কেউ কিছু বলল না তাকে। কিন্তু গানের পর সবাই খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। অনেকক্ষণ বাদে রশ্মি বলল, গান জানি না বলে আজ আমার খুব দুঃখ হচ্ছে।
ব্যস, একটুই। হয়তো আরও কথা উঠত, তার গান নিয়ে তার আগেই ঝুমকি রশ্মির কাছ ঘেঁষে বসে বলল, আমাকে লন্ডনের কথা একটু বলবেন? আমার খুব বিদেশের কথা শুনতে ভাল লাগে।
রশ্মি একটু হাসল বলল, বিদেশের কথা শুনতে সবারই ভাল লাগে। গরিব দেশের মানুষদের ওটা একটা এন্টারটেইনমেন্ট।
তারপর ধীরে ধীরে কথায় কথায় লন্ডন শহরটা যেন একটা কুয়াশা ভেদ করে জেগে উঠতে থাকল ঝুমকির চোখের সামনে। সে মন্ত্ৰমুগ্ধ হয়ে শুনছিল। তারপর হেমাঙ্গ বলল। তারপর চারুশীলাও। এরা সবাই বিস্তর বিদেশে ঘুরেছেন। ঝুমকির ভারি দুঃখ হচ্ছিল নিজের জন্য। কত পিপাসা তার বুকে। কত ইচ্ছে। এই জীবনে কিছুই ঘটবে না তার।
গত চারদিন সে একটা ঘরের মধ্যে আছে। সে কখনও রশ্মির কথা ভাবছে। কখনও লন্ডনের কথা। মাঝে মধ্যে হু হু করছে বুকের ভিতরটা আত্মগ্লানিতে। কখনও খুব নির্জীব বোধ করছে সে। মাঝে মাঝে সে ভাবছে, আচ্ছা, এত ছোটো, এত সামান্য হয়ে বেঁচে থাকার কোনও মানে হয় নাকি? আমি তো একটু সুন্দর, একটু মেধাবীও হতে পারতাম। কিংবা আরও স্মার্ট।
অপর্ণা সকাল বেলায় ঝুমকির ঘরে এসে দাঁড়াল। মেয়ের দিকে চেয়ে বলল, তোর আজকাল কী হয়েছে বল তো! চা খেয়েছিল, এঁটো কাপটা পর্যন্ত বেসিনে রেখে আসিসনি। বাসি কাপড়টা ছেড়ে মেঝেময় ছড়িয়ে রেখেছিস, বাথরুমের বালতিতে রেখে না এলে ঝি ওটা কোনোদিন ধবে? ঘুম থেকে উঠে বিছানাটা তুলিনি। তোর হল কি?
মার সঙ্গে ঝুমকির সম্পর্কটা একটু আড়াআড়ির, আবার কখনও একটু ভালবাসাবাসিরও। হয়তো একেই লাভ-হেট রিলেশন বলে।
