এক ফাঁকে চারুশীলামাস তাকে পাশের ঘরে ডেকে নিয়ে গেল।
ঝুমকি, একটা সত্যি কথা বলবে?
কী হয়েছে মাসি?
তুমি তো এই আধুনিক যুগের মেয়ে, আমার চেয়ে অনেক মর্ডান। মেয়েটিকে তোমার কেমন লাগছে বলে তো!
মেয়েটা তো দারুণ মাসি।
দারুণ বলতে কি বলো তো! দেখতে ভাল, না বুদ্ধিমতী।
দেখতেও ভাল, বুদ্ধির তো কথাই নেই।
মুখের ডৌলটা দেখেছো ভাল করে?
দেখেছি। সারাক্ষণ তো চেয়েই আছি। বেশ ডৌল। ঢলঢ়লে।
বলছো? কিন্তু আমার যেন একটু রুক্ষরুক্ষ লাগছে। অবশ্য চটক আছে।
না মাসি, রুক্ষ কেন হবে? একটুও তো রুক্ষ নয়। বরং ভারি মিষ্টি। তবে সুন্দরী বলতে যা বোঝায় তা নয়। বড় টানা চোখ বা টিকোলো নাক তো নয়। এ হল আহ্লাদী চেহারা।
ঠিক বলেছে। বড় বেশী আহ্রাণী। একটু ন্যাকা নাকি? কি মনে হচ্ছে?
ঝুমকি খুব হাসল, তা একটু হতে পারে। বিলেতে থাকলে ওরকম হয়।
আচ্ছা, অহংকারী নয় তো! মোক থাকলে মুশকিল।
তা থাক না দেমাক। ওর দেমাক ওর কাছে। আমাদের কি?
আসলে হয়েছে কি জানো, তোমাকে খুলেই বলি, আমার যে ওই একটা হাবাগঙ্গারাম ভাই আছে, হেমাঙ্গ, ওর সঙ্গে একটা বিয়ের চেষ্টা করছি। ওর তত উদ্যোগী হয়ে বিয়ে দেওয়ার লোক নেই। ব্যাচেলার থাকারই মতলব। তাই আমি রশ্মির সঙ্গে ওকে ট্যাগ করার চেষ্টা করছি। তোমার কি মনে হয়, দুজনকে মানাবে?
ঝুমকি একটু ভাবল। তার মনে হল, চারুমাসি একটু বাড়াবাড়ি করছে। হেমাঙ্গর মুখে কোনও বোকামির ছাপ নেই। দেখতেও বেশ ভাল। লম্বা, ছিপছিপে, ফর্সা এবং তীক্ষ্ণ চেহারা। তবে মুখে একটু কেবলু-কেবলু ভাব আছে ঠিকই। তবে সেটা ইচ্ছাকৃত বলেই মনে হয় ঝুমকির। সে বলল, বেশ মানাবে মাসি।
চেহারায় মানালেই হবে না, অন্য দিকগুলোও দেখতে হবে। সবার আগে জাত আর গোত্র। কী করে জানা যায় বলে তো!
জাত আর গোত্র কি কোন বিরাট সমস্যা নাকি? ঝুমকি খুব ভাবল সেদিন। যদি জাত বা গোত্র না ঠিকঠাক হয় আর যদি দুজনের মধ্যে প্রেম হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে কী হবে? ঝুমকি খুব সরলভাবে জিজ্ঞেস করল, ওদের মধ্যে কি লাভ অ্যাফেয়ার আছে মাসি?
চারুশীলার মুখখানা চোখা করে বলে, তাই তো থাকার কথা। কিন্তু আমার ভাইটাকে তো দেখছো, একদম আনস্মার্ট। প্রেম করতে ভয়ে মরে।
হি হি করে হাসল, ঝুমকি, ভয়টা কিসের?
তা ও-ই জানে।
হেমাঙ্গ কাছাকাছি ছিল না। ভাগ্নে আর ভাগ্নীকে নিয়ে অন্য ঘরে গল্প করছিল। পাশাপাশি ওদের কেমন দেখাবে কে জানে। ঝুমকি বলল, আপনি বোধহয় ঠিকই বলেছেন। উনি পালিয়ে আছেন তখন থেকে।
কী অভদ্রতা হচ্ছে দেখ। ডাকো তো ওকে। ওপরে আছে বোধহয়।
বাড়িটা বিরাট এবং বাড়ির মধ্যে নানারকম খোপ, খোদল, বিচিত্র ঘর, বিচিত্ৰতর বারান্দা। একেই বোধহয় ভুলভুলাইয়া বলে। তিনতলাতেও সেই ধাধা। ছেলের জন্য একখানা অদ্ভুত ঘর বানানো হয়েছে। দেয়ালে রঙের বদলে মজাদার সব ছবি। একটা দেয়ালে পুরো একটা কমিকস আঁকা রয়েছে। বিছানার ডিজাইন নৌকার মতো, টেবিল চেয়ার সবই পশু-পাখির আকৃতির। রঙচঙে সিলিং। ঢুকলেই মনে হয়, বুঝি রূপকথার দেশ। সেই ঘরে দেখা গেল, ভাগ্নে-ভগ্নীকে নিয়ে এয়ারগানে টার্গেট প্র্যাকটিস করছে হেমাঙ্গ।
ঝুমকি খুব মৃদুস্বরে বলল, শুনছেন, আপনাকে মাসি ডাকছেন।
হেমাঙ্গ তার ঐ কুঞ্চিত মুখ ফিরিয়ে বলল, ডাকছে, কেন বলুন তো?
আপনাদের অতিথি অপেক্ষা করছেন।
হেমাঙ্গ এয়ারগান রেখে উঠে পড়ল। বলল, চারুদিটা একদম যাচ্ছেতাই।
ঝুমকি লোকটাকে ভাল করে দেখল। প্ৰেমে-পড়া মানুষের মুখ কেমন দেখতে হয় তা ঝুমকি জানে না। এ লোকটার মুখে তেমন কোনও বিশেষ বিলক্ষণ দেখতে পাচ্ছে না সে। একে যত বোকা বলে জাহির করে মাসি, ততটা বোকাও বোধহয় হেমাঙ্গ নয়।
চলুন, বলে হেমাঙ্গ তার আগে আগে হাঁটতে লাগল। সিঁড়ির মুখে এসে হঠাৎ তার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, আপনি কি চাকরি পেয়ে গেছেন?
না তো।
চাকরি কেন করবেন? বাড়িতে খুব অভাব, না কি শখ?
না, শখ নয়। বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেল। বাবা আর কদিন চাকরি করতে পারবেন কে জানে!
ওঃ হা, সেদিন তো বলছিলেন এসব কথা। খুব দরকার কি?
হলে ভাল হত।
অনেক মেয়ে স্বামীর অধীন থাকবে না, পরিবারের অধীন থাকবে না বলে চাকরি চায়।
আমি সেরকম নই।
না হলেই ভাল। যারা চাকরির মধ্যে স্বাধীনতা খোজে তারা কেন বোঝ না যে চাকরিটাও অধীনতা?
অধীনতা হলেও তার কতগুলো নিয়মকানুন আর সিকিউরিটি আছে। সংসারি মেয়েদের সেটা থাকে না।
সিকিউরিটি? প্রাইভেট কোম্পানিতে ওসব থাকে না। বিশেষ করে ছোটো ছোটো কনসার্নলোয়।
মেয়েরা শখ করে চাকরি করে না। বাধ্য হয়েই করে।
হেমাঙ্গ কথাটা মানতে চাইল না। ল্যান্ডিং-এ দাঁড়িয়ে হঠাৎ তার দিকে মুখোমুখি হয়ে বলল, একটা কথা বলি আপনাকে। চাকরি করতে হয় তো মাস্টারি করুন। অনেক সেফ, অনেক ভাল।
ঝুমকি মৃদু হেসে বলে, স্কুলের চাকরি আরও দুর্লভ। কলকাতায় বা আশে পাশে তো নয়ই, এমন কি আজকাল গাঁয়ের স্কুলে পর্যন্ত মেয়েদের চাকরিতে ভীষণ কম্পিটিশন।
আপনি বি-এড পড়েছেন?
না।
পড়ুন না! রশ্মি রায়ের স্কুলে হয়তো হয়ে যেতে পারে। নাহলেও ক্ষতি নেই। আমার সঙ্গে অনেক স্কুলের চেনাজানা আছে। কম্পিউটার শিখে কী করবেন?
আমার কম্পিউটার খুব ভাল লাগে।
মুশকিলে ফেললেন।
স্কুলের চাকরিতেও আমার আপত্তি নেই। কিন্তু আমি তো তার জন্য তৈরি হইনি।
হঠাৎ হেমাঙ্গ বলল, চাকরি করলে মেয়েদের অনেক কিছু হারিয়ে যায়, তা জানেন?
