বড্ড বাকো তুমি। অত কথা বললে মানুষের পেটে কথা থাকে না। তোমার জন্যই আমার একদিন মরণ লেখা আছে কপালে। কেবল নীতিকথা কইলে পেট চালাই কি করে? শোনো, ও টাকা কারও হাঙ্কের টাকা নয। কেউ ওর ওয়ারিশও নয়। আমার হাতে যখন আছে তখন ওটা আমার। কাউকে দানছত্তর করতে পারব না, মা-লক্ষ্মীকে তাড়াতেও পারব না। ওসব অলক্ষুণে চিন্তা মাথা থেকে তাড়াও। ও টাকাকে রক্ষা করতে হলে কী করতে হবে, সেইটে ভেবে দেখ। পালপাড়ায় গেলে আপাতত হয়তো কথা উঠবে না।
উঠবে। কাকার চাকরি ছেড়ে পালাপাড়ায় যেতে হলে জুতসই একটা অজুহাত চাই।
অত সব খুঁটিনাটি নিয়ে ভাববার সময় নেই। আমি টাকাটা এমন ভাবে লুকিয়ে ফেলতে চাই যাতে কেউ মাথা খুঁড়েও সন্ধান না পায়। কিন্তু এ বাড়িতে সেটা হবে না। বড্ড খোলামেলা বাড়ি।
নিমাই মৃদুস্বরে বলল, টাকাটার ফাঁদে ভাল করেই জড়িয়ে পড়লে বীণা!
আচ্ছা, তুমি কেমন ধারা মানুষ বলো তো! জীবনে এত দুঃখকষ্ট সয়েছে, এত হেনস্থ হয়েছে, তবু তোমার একটুও লোভ হয় না কেন? হ্যাঁ গো, তোমার মাথার ব্যামো নয়তো এটা!
নিমাই এই গুরুতর পরিস্থিতিতেও এ কথা শুনে হাসল। বলল, পাগল বলতে চাইছো তো! সে তো অনেকবার শুনেছি।
সনাতন দেখে ফেলেছে, এখন আমার বড় ভয় হচ্ছে। সনাতনটা ভীষণ পাজি।
অত ঘাবড়ে যেও না। সনাতন দেখেছে বটে, কিন্তু বুঝেছে কিনা তা এখনও জানি না। কথা হোক তখন যদি টানেটোনে কিছু বলে তো বোঝা যাবে।
পল্ট বুঝেছে। বনগাঁ আমার পক্ষে বিপদের হয়ে উঠছে।
পল্টু, তেমন লোক নয়। সনাতনের দোকানটা কিনেছে, জানো তো! পল্টুর হাতে এখন মেলা টাকা। ও নিজের কারবার নিয়ে ব্যতিব্যস্ত, তোমাকে নিয়ে ভাবছে না।
কি করে বুঝলে?
আমার ভীষণ ভাব যে ওর সঙ্গে। খুব খাতির করে। সে পেট-পাতলা লোক নয়।
কাউকে বিশ্বাস নেই গো। বনগাঁয়ে যা সব লোক থাকে!
নিমাই ফের মাথা নেড়ে বলে, বনের বাঘে খায় না, মনের বাঘে খায়।
আচ্ছা, আমি নয়। খারাপ। পচে গেছি, নষ্ট হয়ে গেছি। তবু এই দুর্দিনে দয়া করে আর শক্ৰতা কোরো না। আমি পাপ করি, তাপ করি, নরকবাস তো আমিই করব। তুমি তো করবে না!
শক্ৰতা কিছু করলাম নাকি?
ওটাই শক্রিতা। ওই যে আমাকে ভয় দেখাচ্ছে, টাকা নষ্ট করে ফেলতে বলছে, ওটাই এক ধনের শক্ৰতা।
আমি সাত দিন সাত রাত ভেবেও ঠিক পাবো না, কথাটা বলায় শক্ৰতা হল কি করে!
সে তুমি ভাবো গে। এখন শোনো, ওই সনাতন শয়তানটা কী দেখেছে আর কী আঁচ করেছে সেটা বুঝবার চেষ্টা করো। হুটপাট কোরো না। মাথা ঠাণ্ডা রেখে কথা বলে দেখো। হয়তো মুখ বন্ধ রাখতে ঘুষ চাইবে।
তাও দেবে?
না, দেবো না।
আমার মাথা গরম হওয়ার কারণ নেই। বীণাপাণি। কিন্তু তুমি বড় উচাটন হয়ে পড়েছে। সনাতন আমার মতোই অপদাৰ্থ লোক। বুদ্ধি নেই, চার চোরকো চালোকও নয়। সবচেয়ে বড় কথা ভীতু মানুষ। কিছু দেখে থাকলেও এখনই অস্থির হওয়ার কিছু নেই। শান্ত হও বীণাপাণি। খাও।
খাওয়া! তাই তো! দুজনে ভাত পাতে বসে আছি সেটাই যে খেয়াল ছিল না। এতক্ষণ!
তাই দেখছিলাম। সব ঠাণ্ডা মেরে গেল। ঝোলটা কেমন হয়েছে?
তুমি তো সুন্দর রাঁধো।
আজ স্বাদ পাচ্ছো?
পাচ্ছি গো।
বীণাপাণি কয়েক গ্রাস ভাত খেল। কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল যে জোর করে খাচ্ছে। তার খিদে নেই বা রুচি হচ্ছে না।
নিমাই হঠাৎ বলল, তোমার সবচেয়ে বেশী ভয় কাকে বীণাপাণি? সবচেয়ে অবিশ্বাস করো কাকে? সে কি আমি?
বীণাপাণি অবাক হয়ে বলে, ওমা! সে কি কথা?
সেইজন্যই না ওসব কথা চেপে রেখেছিলে! আমাকে তুমি বিশ্বাস করো না, না?
মোটেই তা নয়। আসলে তুমি দুর্বল লোক বলে তোমাকে সব কথা বলতে ভয় পাই।
বুঝেছি। ঠিকই করো। আমাকে বিশ্বাস করা বোধ হয় ঠিকও নয়।
আহা, আবার অভিমান করছে দেখ। আমার মন ভাল নেই, এখন অমন মুখ গোমড়া করে থেকো না তো! একটু বলভরসা দাও।
নিমাই বীণাপাণির দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে বলে, তোমার-আমার সম্পর্কটা ঠিক এরকম হওয়ার কথা নয়। বীণাপাণি। এ যেন, সে আর লালন একখানে রয়, লক্ষ যোজন ফাঁক।
০৩৯. কল্পনায় শহরটাকে ঠিকমতো সাজিয়ে গুছিয়ে
অনেক চেষ্টা করেও ঝুমকি কল্পনায় শহরটাকে ঠিকমতো সাজিয়ে গুছিয়ে বানিয়ে নিতে পারে না। সে যায়নি, কখনও যাবে না হয়তো কোনও বিদেশে; সে বড় জোর যাবে কুলু-মালানি, দক্ষিণ ভারত বা ঘাটশীলা। কিংবা কে জানে। কিন্তু বিদেশ তার কপালে লেখা নেই। বাঙালী মেয়েরা সুন্দর, মুখ, উচ্চ মেধা কিংবা দুর্দান্ত ভাগ্য থাকলেই মাত্র বিদেশ-টিদেশ যায়। তার কোনওটাই নেই। তবু কেন মনে মনে বারবার লন্ডন শহরটাকে তৈরি করতে চাইছে সে! কেন দেখতে চাইছে তার রাস্তাঘাট? বাড়ি ঘর? দোকানপাঠ? মিউজিয়াম? আন্ডারগ্রাউন্ড?
এক একদিন কথা বা প্রসঙ্গ একটা কিছুতে এমন মজে যায় যে আর অন্য প্রসঙ্গই উঠতে চায় না। চারুশীলামাসির বাড়িতে সেদিন নেমন্তন্ন করে আনা হয়েছিল রশ্মি রায় নামে একজন বিলেত-ফেরত মহিলাকে। দেখতে ফর্সা-টর্সা, ফিগারও ভাল, মুখখানা তেমন কিছু নয়। কিন্তু চেহারার চেয়েও যেটা বেশি ঝলমল করছিল সেটা হল মেয়েটির বিদ্যা, বুদ্ধি, স্মার্টনেস, পারসোনালিটি। এত মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল ঝুমকি যে, জীবনে এই প্রথম তার দুঃখ হয়েছিল, যে পুরুষমানুষ নয় বলে। পুরুষ হলে সে নিৰ্ঘাৎ রশ্মির প্রেমে পড়ে যেত। পুরুষ না হয়েও কিছু কম পড়েনি। আর সেই সঙ্গে রশির মুখে সেদিন লন্ডনের গল্প শুনে শুনে সেই অচেনা শহরটারও প্রেমে পড়ে গেল সে। লন্ডন শটাই যেন এটা দূরের ঘন্টাধ্বনি। ওই নামটার মধ্যে কত শিহরণ, কত বিস্ময়।
