টাকাটা আমাদের তো নয়। বীণা ।
তাই বা বলছো কি করে? টাকার গায়ে কি কারও নাম লেখা আছে? পাগা তো আমাকে বলে যায়নি এ টাকা কাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। বলে গেলে দিতাম।
কিন্তু দুটো লোক যে খুন হল!
খুন হয়েছে তার আমি কী করব বলো? এক-আধবার ইচ্ছে হয়েছে কাকাকে গিয়ে টাকাটা দিয়ে আসি। পরে ভেবেছি, সময়মতো দিইনি, এখন দিলে হয়তো লোকটা রেগে যাবে, আমাকেও আর বিশ্বাস করবে না। সংসারে চলতে অনেক কূটবুদ্ধি চাই গো। শুধু ভালমানুষী নিয়ে চলা কঠিন।
নিমাই মাথা নেড়ে বলে, কথাটা মানতে পারি না। টাকাটা যখন আমাদের নয়। তখন ওটা লুকিয়ে রেখে নিজের অশান্তি বাড়াতে গেলে কেন?
তোমাকে বলব বলে ভেবেছিলাম। তবে আরও পরে। আমাদের যা অবস্থা তাতে চলে না। ভেবেছিলাম তোমাকে সব খুলে বলে এ টাকা দিয়ে তোমাকে একটা ভাল দোকান করে দেবো। তারপর নাটক-ফাটক সব ছেড়ে দিয়ে সংসার করব।
এরকম ভাবতে পারলে বীণা!
জানি তো, তুমি মানবে না। তবু টাকাটা ঘরে আছে বলে একটু যেন জোর পাই। আগে বলো, টাকাটা কি সরিয়ে ফেলেছো?
না বীণা। সরাবো কেন? যেখানে ছিল সেখানেই আছে।
আমাকে তোমার ঘেন্না হচ্ছে?
নিমাই সবেগে মাথা নেড়ে বলে, তোমাকে ঘেন্না করার সাধ্যিই আমার নেই। কিন্তু বড় মায়া হয়, দুঃখ হয়। লোভের জালে পড়লে মানুষের বড় কষ্ট।
তোমার কেবল ওই কথা!
আমি যা বলি তা যদি মানতে না পারো মেনো না। কিন্তু কথাটা বড় খাঁটি। তবে কিনা আমার মুখে মানায় না।
আমি তো বলছি তুমি ভাল লোক। তোমাকে কোনও পাপ করতে হবে না। পাপ শুধু এই পাপীয়সীই করুক! তুমি বাধা না দিলেই হল।
তাহলে কি তুমি আমার কেউ নাও? সম্পর্কটা কি এমন যে, তোমার মন্দ হলেও চুপ করে থাকব?
চুপ করে না থাকলে যে আমাদের উপায় নেই!
নিমাই কিছুক্ষণ দম ধরে থেকে বলে, টাকাটা নষ্ট করে ফেলবে বীণা?
বীণা চমকে উঠে বলে, বলো কী! লক্ষ্মী সেধে। ঘরে এসেছেন, নষ্ট করে ফেলব কেন?
নিমাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, লক্ষ্মী চোরাপথে এলে আর লক্ষ্মী থাকে না। কিনা। টাকাটা বড়ই অলক্ষুণে। পগা গেল, আর দু-দুটো তরতাজা লোক চলে গেল। সেই খুন-হওয়াদের একজনের চাকরিতেই তুমি ঢুকেছো। কেমন যেন অসোয়াস্তি হচ্ছে। লক্ষণ কিছু ভাল দেখছি না।
বীণা একটু নরম হয়ে বলল, টাকাটা নিয়ে তুমি যে অশান্তি করবে তা জানতাম। শোনো, ও টাকা যেমন আছে থাক, আমি ওটাতে হাত দেবো না। টাকাটা আমাদের ঘরে ঘুমিয়ে থাকবে। তাহলে তোমার আপত্তি নেই তো?
নিমাই কাহিল মুখে বীণার দিকে চেয়ে থেকে বলে, কিসে পাপ হয়, কোথা থেকে কোন ফুটো দিয়ে কর্মফল এসে ঢোকে, তা কে জানে! আমি বোকাবুদ্ধির মানুষ। সাদামাটা কী বুঝি জানো? ওসবের মধ্যে জড়াতে নেই! রাস্তায় পয়সা পড়ে থাকলেও আমি কখনও কুড়োই না। পয়সা বড় মারাত্মক জিনিস।
তুমি ভয়েই মরলে। ভয়-ভয় ভোব সবসময়ে থাকলে মনটা দুর্বল হয়ে যায়। অত ভয় পেয়ো না তো! আমরা গরিব মানুষ, আমাতের অন্ত খুঁটিনাটি পাপ ভগবান ধরবেন না। গরিবের পাপ তাপ ভগবান মকুব করে দেন।
ওরকম বুদ্ধি ভাল নয়। বীণা। পয়সা জিনিসটাই খারাপ। কত লোভী, পাপী, খুনী, কৃপণের হাত ফেরতা হয়ে তবে আমাদের হাতে আসে। আমার কী মনে হয় জানো? পয়সার মধ্যে ওসব মানুষের ছাপ থেকে যায়। এক একটা টাকা যেন অনেক লোভা পাপ দীর্ঘশ্বাস ধরে রাখে।
তোমাকে যে পাগলামিতে ধরেছে গো!
তা হবে। আমার মনটা বড় খারাপ। তার ওপর সনাতনটাও দেখে গেল।
বীণা ভয়ঙ্কর চমকে উঠে বলল, সনাতন দেখে গেল মানে?
আজ সকালে এসেছিল বুদ্ধি পরামর্শ করতে। নতুন কারবার খুলতে চায়। সে চলে যাওয়ার পর ঘর সারতে গিয়ে বাক্সটা পেলাম। পেয়ে যখন মাথায় হাত দিয়ে বসে আকাশ-পাতাল ভাবছি, তখন কী মনে করে সনাতন ফিরে এসেছিল। দরজার বাইরে থেকেই নজর করেছে বোধ হয়। কিছু না বলে তাড়াতাড়ি চলে গেল।
সর্বনাশ!
নিমাই মাথাটা বুঝদারের মতো নেড়ে বলে, সর্বনাশেরই কথা কিনা! টাকা বড় সর্বনেশে জিনিস। তার ওপর এ হল বেওয়ারিশ টাকা, অধর্মের জিনিস। যতক্ষণ ঘরে থাকবে ততক্ষণ তোমাকে ভয়ের বাঘে খাবে, লোভের ভালুক এসে সাপটে ধরবে। সনাতন জেনে গেল বলে ভয় পাচ্ছে, হাক্কের টাকা হলে ভয়ের কিছু ছিল, বলো?
তুমি ভাষণটা একটু থামাবে? কত বড় বিপদ ডেকে আনলে বলো তো! আহাম্মকের মতো সব বের করে রসেই বা ছিলে কেন? এখন কী হবে!
নিমাই মুখ কাচুমাচু করে বলে, আমি তো জন্ম-আহাম্মক। আমার কথা বাদ দাও।
বীণা কাঁদো-কাঁদো হয়ে বলে, পল্ট খানিকটা জানে। একবার ওকে কয়েকটা ডলার বেচে যে কী বোকামিই করেছি! নাঃ, বনগাঁয়ে আর থাকা যাবে না। হ্যাঁ গো, পালপাড়ায় যাবে?
পালপাড়া! সেখানে গিয়ে কী হবে?
হবে কিছু একটা।
পালাতে চাইছো নাকি? ওতে সুবিধে হবে না। পালপাড়া তো আর তেমন দূরের জায়গা নয়। এদের পাল্লার মধ্যেই।
বীণা কাঁদো-কাঁদো মুখ করে বলল, তাহলে কী হবে? আমার যে সব গেল। কাকার কানে কথাটা গেলে যে সর্বনাশ হয়ে যাবে।
নিমাই খুব শান্ত ঠাণ্ডা গলায় বলল, মানুষ ভয় পেলে নানা আগড়ম বাগড়ম ভাবতে থাকে, উল্টোপাল্টা সব চিন্তা আসে। বীণাপাণি, ভয়টাকে যে কেন ঘরে পুষে রেখেছে সেটা ভাল করে ভেবে দেখ।
সব নষ্টের গোড়া তো তুমি! কেন যে মাটি খুঁড়ে বের করলে লুকোনো জিনিসটা!
নিমাই মাথা নেড়ে বলে, সব ভবিতব্য। আমার তো ও বস্তুর খোঁজ পাওয়ার কথাই নয়। কিন্তু দেখ ভবিতব্য এমন যে, তুমিই আমাকে কদিন ধরে কেবলই বলে যাচ্ছে, ওগো, ঘরদের যে গেল গর্তগুলো এবার বুজিয়ে ফেল। জানোই তো ঘর সারতে গেলে ওটা চোখে পড়ে যেতে পারে! মাটির নিচে যে তোমার প্রাণভোমরা রয়েছে সে তো আমার জানার কথা নয়! খুলে দেখে তো আমার ভিরমি খাওয়ার জোগাড়।
