সনাতন একটু যেন দমে গেল। তারপর বলল, আচ্ছ, প্লাস্টিকের ব্যাগের কারবারটা কেমন? ধরে যদি নিজের তৈরি করে বেচি?
সব ব্যবসাই ভাল। সব কিছুরই বাজার আছে। তবে অন্ধিসন্ধি জানা চাই।
কে একজন বলছিল সেদিন, এ তল্লাটে দেশলাই তৈরির কারখানা নেই। সেটা করলেও তো হয়।
হয় তো বটেই। ফেল কড়ি, মাখো তেল। দেশলাই করতেও কম হাঙ্গামা নাকি?
তুমি সব কথাতেই জল ঢেলে দিচ্ছে! সকালবেলাটায় তোমার কাছ থেকে দুটো ভাল কথা শুনতে এলাম।
নিমাই হেসে বলে, ভাল কথা আজকাল আর পেটে আসতে চায় না। ভাল কথা মানেই মিছে কথা। মন-রাখা কথা। কথা দিয়ে কীই বা হয়! তা বাড়ির অবস্থা কী তোমার? ঝগড়াঝাঁটি হচ্ছে না। তাহলে?
সনাতন একটা ভ্যাংচানি দেওয়ার মতো মুখ করে বলে, আমাদের সংসারে ঝগড়া দিয়ে দিন শুরু হয়, ঝগড়া দিয়েই শেষ হয়। ঘুম ভাঙল কি লেগে পড়ল। মানুষ যে মানুষের এত শক্র হয়, তা না দেখলে বিশ্বাস হবে না। ভাবি, একটা কাজ কারবার নিয়ে মেতে থাকলে সংসার থেকে একটু তফাতে থাকতে পারতাম।
সংসার মানেই ভেজাল। ও নিয়ে ভেবে কী হবে?
আজকাল আর ভাবি না। টাকা পয়সা দিয়ে দিয়েছি, এখন নিজের নিজের আখের দেখুক।
নিমাই হাসল, ওটা একটা কথা হল? সংসার যদি এত জঞ্জাল তবে তিন তিনটে বউ ঘাড়ে নিলে কেন?
সনাতন চুপ করে রইল। কৃতকর্মের জন্যই দুঃখেই বোধ হয়। তারপর বলল, একটা বড় রকমের কিছু আমাকে করতেই হবে। তখন তোমাকেও সঙ্গে নেবো।
নিও। বেকার বসে আছি, কোনও কাজে লাগলে ভালই হবে। তবে হঠাৎ করে বড় লাফ দিও না। মাজা ভাঙবে।
ভুঞ্জ। তেমন বড় করে না ফাঁদতে পারলে বেঁচেই বা কী সুখ হচ্ছে বলো তো! তোমার কাছে দুদণ্ড বসলে মনে বেশ শান্তি পাই।
সনাতন আরও খানিক আগড়ুম বাগড়ুম বলে বিদায় নিল। দোকানে গিয়ে এখন সময় কাটছে না তার। নিমাই হাতের কোজ সারাতে ফের উঠে পড়ল। ঘরের পিছন দিকটার ভিত ক্ষয়ে গেছে অনেক। বেড়ার নিচে বেশ বড় গর্ত। চোর এলে আর সিদ কাটতে হবে না। সেখানটায় মাটি চেপে বসানো কঠিন কাজ। অনেকটা সময় লাগল নিমাইয়ের। ঘরে আর একটা গর্ত বেরোলো মাটির একটা জালার নিচে। সেটায় মাটি ঠাসতে গিয়ে ভিতরে সাদামতো কী একটা নজরে পড়ে গেল তার। প্লাস্টিকে মোড়া একটা টিফিন বাক্সের মতো।
নিমাই হাত ঢুকিয়ে জিনিসটা টেনে বের করল। তারপর অবাক হয়ে দেখল, সাদা রঙের খুব বড় একটা টিফিন বাক্সই। কিছুদিন আগে তাকে দিয়েই এটা কিনিয়ে এনেছিল বীনা। বাক্সটা খুলে সে আরও হাঁ হয়ে গেল। ভিতরে বেশ একটা মোটাসোটা প্যাকেট। ওজন আছে। প্যাকেটটা খুলে এত হতভম্ব হয়ে গেল নিমাই যে, পাক্কা দশ মিনিট চেয়ে বজাহতের মতো বসে রইল। দরজা জানালা হাট করে খোলা। সেটা খেয়াল ছিল না নিমাইয়ের। তার মনে তো পাপ নেই। মৃদু একটা গলা খাঁকারির শব্দে একবার চেয়ে দেখল, সনাতন ফিরে এসেছে। দরজার বাইরে থেকে হাঁ করে দেখছে। তাকে। কিন্তু হঠাৎ কি মনে করে সে পট করে ঘুরে পা চালিয়ে চলে গেল।
এই সেই জিনিস যার জন্য এত খুনখারাপি, এত অশান্তি! এল কোথা থেকে? না, বেশী বুদ্ধি খাটাতে হল না তাকে। দুইয়ে দুইয়ে যোগ করলে যে চার হয় এটা এ যুগে কে না জানে?
নিমাই প্যাকেটটা সাবধানে মুড়ে ফের গর্তের মধ্যেই রেখে দিল। ওপরে মাটি ঠেসে দিল ভাল করে। গোবর মাটি গলে সারা ঘর নিকিয়ে দিল। আজ রোদ উঠেছে চড়চড়ে। তাড়াতাড়ি ঘর শুকিয়ে যাবে।
উঠোনে কলমের আমগাছটার তলায় বসে নিমাই আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবতে লাগল। অনেক কথাই মনে পড়ল তার। বীণা তাকে একদিন বলেছিল, হঠাৎ লটারির টাকা পেলে সেটা অধৰ্ম হবে কিনা! আরও অনেক কিছু।
বীণার নতুন চাকরিটা হওয়ার পর থেকে দিনের বেলাটায় নিমাইকেই রাঁধতে হয়। বীণা সময় পায় না। কাকার কারবার দুমাস ঝিমিয়েছিল, এখন আবার রমরম করে চলছে। বীণার এখন অনেক কাজ।
রান্না সামান্যই হয়। একটা ঝোল আর ভাত। বড় জোর তার সঙ্গে কিছু একটা সেদ্ধ। নিমাই সেটা করে ফেলল। স্নান করে চুপচাপ বসে রইল ফের গাছতলায়।
বীণা ফিরল দুপুর গড়িয়ে। মুখখানা বেশ হাসিখুশি। নতুন চাকরিতে নতুন রকমের সুখ আছে। শোনা যাচ্ছে স্মাগলিংটা ঠিকমতো চললে বিশ্ববিজয় অপেরার পালাও নামবে। সেটা পুজোর মধ্যেই।
খেতে বসে বীণা বলল, কী গো, মুখখানা আজ আমন কেলে হাঁড়ির মতো কেন? কী হল আবার?
বলতে সাহস হয় না।
বীণা একটু অবাক হয়ে বলে, কী এমন কথা!
জিজ্ঞেস করলে সত্যি কথা বলবে তো?
বলব না কেন? কী হয়েছে? আজ ঘর মেরামত করতে গিয়ে জালার নিচের গর্তে একটা জিনিস পেলাম। একটা প্যাকেট। তাতে মেলা ডলার আর
বীণার মুখখানা হঠাৎ ছাইবৰ্ণ হয়ে গেল। চোখের পলক নেই।
এ কি পাগার সেই জিনিস বীণা?
বীণা মাথাটা ধীরে নামিয়ে নিল। তারপর ক্ষীণ স্বরে বলল, হ্যাঁ।
সে রেখে গিয়েছিল তোমার কাছে?
হ্যাঁ।
বলোনি তো!
বললে তুমি রাখতে দিতে আমার কাছে?
না। কিন্তু সে পরের কথা। বলোনি কেন?
বলিনি, তোমাকে বিপদে ফেলতে চাইনি বলে।
নিমাই দুঃখ ছিলোছালো চোখে বলে, পরের জিনিস ফিরিয়ে দিলে না কেন? ওতে যে কত সর্বনাশ হয়ে গেল!
কাকে ফিরিয়ে দিতাম বলো তো! কার টাকা। ওটা? পাগা রেখে গিয়েছিল। সে খুন হল তো টাকার ওয়ারিশ কে? কাকে গিয়ে বলব যে, এই হল পগার টাকা, আপনি নিন?
কাকা যখন এল তখন দিলে না কেন?
ওকে দেব কেন? ও টাকা তো কাকার নয়, পাপা সিং-এর কিনা তাও ঠিকমতো জানি না। তবে পাপের টাকা, এটা ঠিক। তাই ভাবলাম, এ টাকা আসলে কারও নয়। যে পাবে তার। কাউকে বলিনি, লুকিয়ে রেখেছি। তবে তোমাকে বলতে মুমুক বার। কিন্তু তুমি অবুঝ মানুষ, সাধুসন্ত মানুষ, তুমি সংসারী মানুষের মাথা দিয়ে চিন্তা করবে না। তাই সাহস হয়নি।
