নিমাই উদার গলায় বলে, বিছানাতেই বোসো না। জলচৌকি আর মোড়া উঠোনে, ডালের বড়ি রোদে দেওয়া হয়েছে। তা কি খবর-টাবর বলো।
খবর বিশেষ কিছু নেই। দোকানখানা বেচে দিতে হল। চলছিল না তেমন।
নিমাই একটু অবাক হয়ে বলে, বেচে দিল! এখন দোকানই হল বাধা লক্ষ্মী। আমি কতকাল ধরে চেষ্টা করেও দোকান দিতে পারলাম না। আজও। আর তুমি বেচে দিলে!
বাজারে বা জমাটি জায়গায় দোকান হলে কি বেচতাম নাকি! তেমন আহাম্মক পাওনি। পাড়ার মধ্যে ছোট্টো কারবার। বাকি না দিলে দোকান চলে না, আদায় উসুল করতে নাভিশ্বাস ওঠে। ডিমসুতো থেকে জ্বর পেট-খারাপের অ্যালোপ্যাথি ওষুধ অবধি রাখতে হত। মাল কিনবার পয়সাটা কোত্থেকে আসবে বলো! তার ওপর ঘরে তিনখানা চামুণ্ডা খাড়া হাতে সর্বদা আমার মুণ্ডু খুঁজে বেড়াচ্ছে। তাই দিলাম বেচে। যা দাম উঠল তা ভাগ বাটোয়ারা করে দিয়ে দিয়েছি। এখন ঘরে খানিক শান্তি হয়েছে। মেয়েমানুষের মন্তর হল টাকা। যখনই লাফঝাঁপ করবে কিছু টাকা ফেলে দাও, মুখে কুলুপ।
তা নয় বুঝলুম, কিন্তু তোমার এখন চলবে কিসে?
আরে, সেই পরামর্শেই তো আসা তোমার কাছে। হাত পা ধুয়ে বোসো জুত করে। একটু বুদ্ধি বের করি দুজনায়।
নিমাইয়ের মনটা প্ৰসন্ন হল। তার সঙ্গে পরামর্শ খুব কম লোকই করে। সে হাত মুখ ধুয়ে গামছায় কষে হাত পা মুছে আলগোছে বিছানায় বসল। বলল, তারপর বলো।
সনাতন খুব নিবিষ্ট হয়ে ভাবছিল। বলল, দুনিয়ায় মেলা লোক করে-কর্মে খাচ্ছে, চোখের সামনে সব ধ্যা করে বড়লোক হয়ে যাচ্ছে, দেখছো তো! কিন্তু নিমাইচরণ, আমরা কমতিটা কিসে বলতে পারো? আমাদের কিছু হচ্ছে না কেন!
সকলের কি সব হয়? না। সয়?
তুমি একটা সাধু-বোষ্টম মানুষ, ওকথা বলতে পারো। কিন্তু আমার বৈরাগ্য নেই। আমার দুটো পয়সার মুখ দেখতে ইচ্ছে যায়। তিনখানা সংসার বলে নয়, একটু মনের মতো থাকব—এ আমার অনেক দিনের ইচ্ছে। কিন্তু কি করলে যে হবে, তা বুঝতে পারি না।
এক আহাম্মক এলেন আর এক আহাম্মকের কাছে বিষয়বুদ্ধি নিতে। সে বুদ্ধি থাকলে আমিই কি বসে থাকতাম নাকি!
সেইটো ভাবি বলেই তো তোমার কথাই আমার মনে পড়ে সবসময়ে। ভাবি কি জানো, আমারও ভিতরে মাল আছে, তোমারও ভিতরে আছে। একবার তেড়েফুড়ে লাগলে আমরাও কম যাই না। কি বলো?
গামছাখানা কোল থেকে তুলে নিমাই নিজের মুখটা মুছে বলে, কী করতে চাও বলো তো!
দোকান-টোকান আর করে লাভ নেই ভায়া। বড় ভ্যাদভ্যাদে কাজ। পয়সা নেই, তার ওপর রোজ লোকজনের সঙ্গে আদায় উসুল নিয়ে ঝগড়া-কাজিয়া হচ্ছে। ও আমার আর ভাল লাগে না। একটু বড় কিছু ফাঁদতে না পারলে জীবনটাই বৃথা।
নিমাই একটু চুপ করে থেকে বলে, বড়লোক হতে সাধ হয়েছে বুঝি? কাজটা শক্ত।
সনাতন তার সরু মুখখানা ষড়যন্ত্রের ভঙ্গিতে এগিয়ে এনে বলে, শক্তটা কিসের? আমাদের কোন জিনিসটা নেই বলো তো!
আমার কথা বলতে পারি। আমার টাকা নেই, বড় হওয়ার তেমন তেজালো ইচ্ছেও নেই। সেইজন্যই বীণার হাতেতোলা হয়ে বসে আছি। মনে হচ্ছে আমাকে দিয়ে তেমন কিছু হবে না।
সনাতন একথায় যেন বসে বসেই নেচে উঠল, কেন হবে না? বুদ্ধি করে, মাথা ঠাণ্ডা রেখে ঠিকমতো টাকা খাটালে না। হবে কেন? চারদিকে দুনিয়াটা ধাঁ-ধাঁ করে বেড়ে উঠছে, আমি যেন পিছিয়ে পড়ছি। অথচ ভেবে দেখেছি, আমার কিছু কমতি নেই। তোমারও নেই।
বললাম যে, আমার টাকা নেই। টাকা হলে ভেবে দেখতাম।
তোমার বউয়ের কিন্তু টাকা আছে।
তোমার মাথা! বউ কত টাকা মাইনে পেতে জানো? বড়লোকের কুকুরের পিছনেও তার চেয়ে ঢের বেশী খরচ হয়। এই সবে দুদিন হল কাকা অন্য একটা কাজে লাগিয়েছে, কিছু বেশী পাচ্ছে
নুন-পান্তার জোগাড়াটুকু তো আছে। তাই বা কম কিসে? আমি বলি কি এরকম জড়ভরত হয়ে থাকার চেয়ে কিছু একটাতে নেমে পড়ি চল।
কিসে নামবে? ভেবেছে কিছু?
না। তোমার সঙ্গে সেই নিয়েই কথা। কিছু একটা ঠিক করো তো! এভাবে আর পারা যায় না।
দোকান বেচে কত টাকা পেলে?
ও দোকানের দামই বা কী? মালের দাম সমেত দোকানঘরের জলেরই দাম ধরো।
কে কিনল?
লটারিওলা পল্টু। পাড়ার মধ্যে দোকান বলে দরটাও উঠল না।
না বেচলেই ভাল করতে।
ও কথা বোলো না। বাজারে চার হাজারেরও বেশী অনাদায়ী টাকা পড়ে আছে। মাল তুলতে পারছিলাম না। আন্দেকের ওপর বাকির খদের। পটু কিনল দোকান করবে বলে নয়। সে অন্য কারবার ফাঁদবে। এটাকে গুদামঘর করবে। তা তার যা-খুশি করুকগে। আমার আর ওসব ছোটখাটো কারবারের দিকে নজর নেই। তুমি কথাটা গ্রাহ্য করছে না। কিন্তু!
করছি। কিন্তু মাথায় বুদ্ধি খেলছে না। সময় লাগবে।
সময় কি আর বসে থাকবে ভায়া! বয়সও বসে পান-তামাক খাবে না, জিরোবে না। কলঘড়ি টিকটিক করে খরচ হয়ে যাবে। আয়ুতে বেড় পাই এমন জিনিস করতে হবে।
আমার বিষয়বুদ্ধিতে মেলা ফাঁক। আমাকে দিয়ে বড় কিছু হওয়ার নয়। বীণা মনোহারি দোকানের কথা বলে, তাইতেই আমি ভয় খাই। ছোটখাটো একটা ফল-পাকুড়ের দোকান অবধিই আমার দৌড়।
ফলের দোকান থেকে ক পয়সাই বা পাবে? একটু বড় কিছু ভাবো। ঠিকাদারি-টারি করলে হয় বা একটা কারখানা গোছের কিছু।
উরেব্বাস! তোমাকে নিৰ্ঘাৎ ভূতে পেয়েছে।
কেন? কী এমন বললাম?
আমি এক ঠিকাদারের চৌকিদার ছিলাম, তাতে টাকার খেলা বড় কম দেখিনি। গোডাউনে দেড় দুলাখ টাকার মাল সবসময়ে থাকত। পাঁচ-সাতটা ট্রাক রোজ খোঁপ মারত। পঞ্চাশটা কর্মচারী আর শখানেক কুলির বেতন, ইট, পাথর, সিমেন্ট, কাঠ কত কি জোগাড় করতে হত, হিসেব রাখতে হত! ও সে এক গন্ধমাদন ব্যাপার।
