রাত গম্ভীর হল। রাতের খাওয়া শেষ করে সবাই শুতে চলে গেলে রোজই অধিক রাত অবধি কিছু পড়াশুনো করে কৃষ্ণজীবন। এটা তার প্রিয় অভ্যাস।
ফোনটা এল অনেক রাতে। বারোটা বাজবার দশ মিনিট পর।
কী করছেন?
কে বলছেন?
হিঃ হিঃ! আমি অনু।
অনু! ওঃ, এত রাতে জেগে আছো কেন?
আজ আমার ঘুম আসছে না। আমি তো জানি আপনি রাত জেগে পড়েন, তাই ফোন করছি। কেমন আছেন। আপনি?
তুমি কেমন আছো?
ভাল নেই। মন খারাপ।
কেন মন খারাপ?
আমার মাঝে মাঝে ভীষণ মুড অফ হয়ে যায়।
তুমি খুব মুডি, তাই না?
খুব। আচ্ছা, আমি আপনাকে ডিস্টার্ব করছি না তো!
না। আমি ছেলেমানুষদের সঙ্গে কথা বলতে ভালবাসি।
আমি মোটেই ছেলেমানুষ নই। আপনি আমার ফ্রেন্ড না? ফ্রেন্ডকে বিলিটল করতে নেই, জানেন না?
ওঃ, তাই তো। কিন্তু দোলনও তো আমার খুব বন্ধু।
দোলন আর আমি তো এক নই। আপনি বড্ড সেকেলে। এত এন্ডি সেজে থাকেন কেন বলুন তো! আমি একটু ওন্ডিই বটে।
মোটেই না। ইউ আর এ নাইস পারসোনেবল ম্যান। আই লাইক ইউ ভেরি মাচ।
কৃষ্ণজীবন শঙ্কােজড়িত এক রকমের হাসি হাসল। তারপর বলল, তুমি একটি পাকা আর বিচ্ছু মেয়ে।
পাকা আর বিছু? তা হলে ছেলেমানুষ নই তো!
এত অ্যাডাল্ট হওয়ার ইচ্ছে কেন? যতদিন পারো শৈশবকেই ধরে রাখো। শৈশবের মতো সুন্দর সময় আর নেই। বড় হলে দেখতে পৃথিবীটা একদম বিচ্ছিরি।
কিন্তু আপনি তো পৃথিবীটাকে খুব ভালবাসেন।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কৃষ্ণজীবন বলে, তা বাসি। সেই ভালবাসার জ্বালায় জ্বলেপুড়ে মরছি।
কবে দেখা হবে বলুন তো! আপনাকে আমার ভীষণ দরকার।
তাই বুঝি? তবে আসো না কেন?
যদি হ্যাংলা ভাবেন সেই ভয়ে ঘন ঘন যাই না। যদিও খুব যেতে ইচ্ছে করে। আপনার কথা শুনতে শুনতে আমার কেমন একটা হিপনোটিক কন্ডিশন হয়।
এটা কি কমপ্লিমেন্ট?
না। স্টেটমেন্ট অফ এ ফ্যাক্ট।
শোনো অনু, তুমি রোজ এলেও তোমাকে হ্যাংলা ভাববো না। এতে হ্যাংলামির কি আছে?
আপনি বিরক্ত হবেন না?
একদম না।
আসলে আমার স্কুলেও পড়ার ভীষণ প্ৰেশার ছিল। সময় পাচ্ছিলাম না। বাবার হার্ট অ্যাটাক হওয়ায় আমার অনেক ব্যাক লগ জমে গেছে।
তোমার বাবা এখন কেমন আছেন?
অফিসে যাচ্ছে। নাউ হি ইজ ও-কে। কিন্তু হার্ট একটা ভীষণ আনপ্রেডিকটেবল থিং। তাই না?
ঠিকই বলেছে।
অনু হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠল।
হাসলে কেন?
হার্টের কথায়। আপনার হার্ট, আমার হার্ট, সব হার্ট-ই কিন্তু আনপ্রেডিকোটবল।
কথাটার মানে কি অনু?
আমাদেরও তো হার্ট অ্যাটাক হতে পারে? পারে না?
তুমি খুব দুষ্ট মেয়ে।
আপনি মিনিংটা ধরতে পারলেন কি?
পারলাম।
আপনি কি জানেন যে, ইউ আর কোয়াইট অ্যাট্রাকটিভ?
জানি না। কেউ এরকমভাবে আমাকে বলেনি কখনও।
আমি বলছি বলে রাগ করবেন না তো!
এটা তো খুশি হওয়ার মতোই কথা অনু। এই বয়সে টিনএজারদের কাছ থেকে এরকম কমপ্লিমেন্ট তো বেয়ার জিনিস।
শুনুন, আমার কিন্তু খুব বকবক করতে ইচ্ছে করছে।
করো না!
আপনি যে হাই তুললেন এইমাত্ৰ!
যাঃ, কোথায় হাই তুলেছি?
তোলেননি তো!
না। আমার হচ্ছে ইচ্ছে-ঘুম।
আমার আজ কেন ইনসোমানিয়া হচ্ছে, জানেন?
কি করে জানবো? শুনলাম তো মুড অফ।
হ্যাঁ, তাই। আজ আমি সকাল থেকে অনেকের সঙ্গে ঝগড়া করেছি।
ও বাবা, ঝগড়াও করো নাকি?
আসলে ঝগড়া করে আমি সকলের কাছে হেরে যাই।
সেটা কিন্তু খুব ভাল। কি নিয়ে ঝগড়া হল?
তার কোনও মাথামুণ্ডু ছিল না। এটা সেটা নিয়ে। মুড অফ থাকলে যা হয়। আজ যেমন আমার একজন বন্ধুকে বলেছিলাম, তোর নাকটা কিন্তু বিচ্ছিরি। ব্যস লেগে গেলে। তারপর মায়ের সঙ্গে লাগল, দিদির সঙ্গে লাগল। রাতে ঘুম আসছে না, শুয়ে শুয়ে মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে, এমন সময় হঠাৎ আপনার কথা মনে হল। মনে হল, আপনার মতো ভাল বন্ধু আমার আর কেউ নেই।
সত্যি?
সত্যি। ভীষণ সত্যি।
০৩৮. নিমাইচরণ আছো নাকি
নিমাইচরণ আছো নাকি? ও নিমাইচরণ!
নিমাই ঘরেই ছিল। মাটির মেঝেতে মেলা গর্ত হয়েছে, ধসে বসেও গেছে কিছু জায়গা। মাটি কুপিয়ে এনে ভরাট করছিল গলদঘর্ম হয়ে। শাবলটা রেখে দরজার কাছে এসে দেখে, সনাতন দাঁড়িয়ে আছে। রোগা, কালো, ছোটখাটো সনাতনের সঙ্গে নিমাইয়ের নিজের একটা ভারি মিল আছে।
ক্ষেত কোপাচ্ছিলে নাকি হে! কাদামাটি মেখে বসে আছো যে!
নিমাই হাসল, না। বর্ষার পর দেখছি ঘরে মেলা গর্ত হয়ে আছে। পোকামাকড়ের তো অভাব নেই। মাটি ঠাসছি।
বীণাপাণি নেই বুঝি ঘরে?
না। এসো, ঘরে এসো বোসো।
দুনিয়াতে ভাল লোকের বড় অভাব যাচ্ছে। খুব টানাটানি। সনাতনকেও তাই তেমন ভাল লোক বলা যায় না। আজকাল পেটের দায়ে লোকে নানা ধান্দা আর ফিকিরে ঘোরে। টাকাটা সিকেটার জন্য জলের মতো মিছে কথা কয়। একসময়ে পগার সঙ্গে সাঁট ছিল সনাতনের। তবে ভাগীদার নয়, সঙ্গে সঙ্গে পিকির নিয়ে ঘুরত। পগা খুন হওয়ার পর কাকার দল এর ওপরেও হামলা চালিয়েছিল, যদি চুরি-হওয়া ডলারের সন্ধান পাওয়া যায়। সনাতন ভাল লোক না হতে পারে, তবে নিমাইয়ের সঙ্গে বেশ বনিবনা আছে। একটা জায়গায় একটু অমিল। নিমাই এক বিয়ের বউ নিয়েই হিমসিম খায়, সনাতনের তিনখানা বিয়ে। সনাতন কিছু লাখোপতি লোক নয়, টানাটানির সংসারে তিনখানা বউ নিয়ে থাকতে বুকের পাটা লাগে। সনাতনের ওইটেই আছে। আর বিশেষ কিছু নেই।
রবারের চটিজোড়া বাইরে ছেড়ে সাবধানে ঘরে ঢুকে এদিক ওদিক চেয়ে সনাতন বলল, বসার ব্যবস্থা নেই দেখছি।
