আমাদের জানার মধ্যে কয়েক শো কোটি। জানার বাইরে কত আছে তার তো হিসেব নেই।
গুনে শেষ করা যাবে না?
না। সংখ্যাকে হার মানতেই হয় এক সময়ে। সংখ্যা দিয়ে আকাশের তারার হিসেব অসম্ভব।
দোলন অসহায়ভাবে বাবার দিকে চেয়ে বলে, তা হলে?
কৃষ্ণজীবন মৃদু হেসে বলে, আকাশের দিকে চাইলে তুমিও যা আমিও তা। শিশুমাত্র।
তুমি তো কত জানো বাবা!
হ্যাঁ বাবা, যত জানছি, ততই বোকা হয়ে যাচ্ছি। থাই পাই না।
আলোর গতি সেকেন্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল তো, বাবা!
হ্যাঁ।
ওই স্পীডে যদি যাওয়া যায় তা হলেও কি আমরা কখনও আমাদের ছায়াপথের শেষে পৌঁছতে পারব না?
না। আলোর গতিতে কোনও বস্তু কখনও ছুটতে পারে না। যদি পারে তবে সে আর বস্তু থাকে না।
তা হলে?
আকাশের কথা আকাশের কাছেই থেকে যাবে। কিছু জানা যাবে, অজানা থেকে যাবে আরও অনেকটাই।
আমি তো গল্পের বইতে পড়ি, অনেক দূরের গ্রহ থেকে নানারকম মানুষ আসে। সত্যি বাবা?
না দোলন। আজ অবধি আকাশের কোথাও কেউ আছে বলে জানা যায়নি।
একদম না।
তা বলা যায় না। কিন্তু নক্ষত্রগুলো এত দূরে যে, তাদের গ্রহমণ্ডল আছে কি না তা ধরা যাচ্ছে না। আমরা যে সব নক্ষত্রের আলো দেখতে পাই সেগুলো হাজার, লক্ষ, কোটি বছর আগেকার পুরনো আলো, পৃথিবীতে এসে পৌঁছতে অতটা সময় লেগেছ তাদের। এখন সেখানে কী হচ্ছে তা জানা যাবে ফের হাজার, লক্ষ, কোটি বছর পর।
উরেব্বাস।
সত্যিই উরেব্বাস। ওসব নিয়ে ভেবো না, মন খারাপ হবে।
মুড়ি যখন ইস্কুলে বন্ধুদের কাছে তোমার কথাগুলো বলি তখন সবাই খুব অবাক হয়। বিশ্বাস করতে চায় না।
কী বলো?
আমি আকাশ আর গ্ৰহ নক্ষত্রের কথা বলি। ওরা কেউ আমার মতো এত জানে না। বলে, ভ্যাট, গুল মারছিস।
জানে না বলেই বলে।
সুকান্ত নামে একটা ছেলে আছে, তার বাবা নাকি বলেছে মানুষ একদিন আকাশটা জয় করে নেবে। তাই বাবা। আমি কিন্তু বলেছি, পারবে না।
নেগেটিভ কথা না বলাই ভালো। তবে তুমি বোধ হয় ঠিকই বলেছে। মানুষের ক্ষমতা খুব সামান্যই।
কোনওদিন পারবে না বাবা?
না পারাটাই স্বাভাবিক।
বিজ্ঞান নাকি সব পারে বাবা?
কৃষ্ণজীবন স্তিমিত গলায় বলে, বিজ্ঞান আমি কতটুকু জানি দোলন? যতটুকু জানি তা দিয়ে কিছু অনুমানও করা যায় না। তোমরা বড় হয়ে তেমন বিজ্ঞানের সন্ধান কোরো। এখন অবধি মানুষের বিজ্ঞান বড় দুর্বল। বড় সামান্য।
বিভু বলে একটা ছেলে আছে, সে বলে, ভগবান-টগবান নেই। সব বাজে কথা। বিজ্ঞানের যুগে কি কেউ ভগবান মানে? সত্যি বাবা?
আমি জানি না দোলন। মানুষের অজানা কত কি আছে এখনও।
ভগবান নেই বাবা?
জীবন একটু চুপ করে থাকে। তারপর বলে, হয়তো আছেন। বিজ্ঞান কিন্তু বলেনি যে ভগবান নেই।
তা হলে কী বলেছে, বাবা?
বিজ্ঞান বলে, যতদূর জানা যায় ততদূর পর্যন্ত ভগবান বলে কাউকে পাওয়া যায়নি।
ভগবান কি অনেক দূরে?
হয়তো খুব কাছেই। আমরা ভুল করে দূরে তাঁকে খুঁজি।
আচ্ছা, ভগবান তো দূরের তারাগুলোকে চেনে, না বাবা? ইচ্ছে করলেই চলে যেতে পারে?
যারা ভগবানকে মানে তারা ওরকমভাবে বলে না। তারা বলে ভগবানই এই সব গ্ৰহ-নক্ষত্র হয়ে আছেন, গাছপালা। হয়ে আছেন, জীবজন্তু হয়ে আছেন, তুমি-আমি হয়ে আছেন।
সত্যি বাবা?
তাই তো শুনি।
আমি ঠিক বুঝতে পারছি না তো!
তুমি তো খুব ছোট। এসব বুঝতে সময় লাগে।
আকাশের কথা ভাবতে ভাবতে আমার খুব মন খারাপ হয়ে যায়।
কেন যায় দোলন?
ওই যে তুমি বলো, মানুষ কখনও আকাশের অন্য সব নক্ষত্রে যেতে পারবে না।
কৃষ্ণজীবন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, কিছু জিনিস আমাদের জানার বাইরেও থাক না দোলন।
কেন বাবা?
মানুষ চোখ দিয়ে দেখে, বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে। কিন্তু চোখ আর বুদ্ধিই তো সব নয়। অনুভব করতে হয়। ভাবতে হয়। বিশ্বজগতের সঙ্গে নিজেকে একাকার করে দিতে হয়।
সেটা কেমন বাবা?
আমি কি সব কথার জবাব দিতে পারি? ওই যে বললাম, আমার আজকাল কেবলই মনে হয়, আমি কিছুই জানি না।
দোলন বাবার কাছ ঘেঁষে বসে মুখের দিকে চেয়ে বলে, তুমি যখন ফরেনে যাও তখন আমার খুব কান্না পায়। কেন যাও বাবা? এবার আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবে?
তোমার যে ইস্কুল থাকে!
পুজোর ছুটিতে আর সামারে নিয়ে যাবে?
আর একটু বড় হও, তখন নিয়ে যাবো। এখন মাকে ছেড়ে বাইরে গেলে তোমার কষ্ট হবে।
মাকেও নিয়ে যাবো। দিদিকেও। দাদাকেও।
ও বাবা, অত পয়সা কোথায় পাবো দোলন? প্লেনের টিকিটের যে অনেক দাম!
তবে তুমি যে যাও!
আমার টিকিটের টাকা অন্যেরা দেয়। নইলে কি যেতে পারতাম?
কেন দেয় বাবা? তারা আমাদেরটা দেবে না?
আমি তাদের কাজ করে দিই বলে তারা আমার ভাড়া দেয়। তুমি বড় হয়ে যখন কাজ করবে। তখন তোমারটাও দেবে।
ব্যাপারটা গম্ভীর হয়ে কিছুক্ষণ ভাবল দোলন। তারপর হঠাৎ উঠে পড়ে বলল, চলো বাবা, রিমোট কন্ট্রোলের গাড়িটা চালাই দুজনে মিলে।
প্রস্তাবটা কৃষ্ণজীবনের খুবই পছন্দসই। বাচ্চাদের খেলনা নিয়ে খেলতে তার এখনও ভাল লাগে। ব্যাটারিচালিত ছোট ভিডিও গেম, রিমোট গাড়ি বা রুবিক কিউব নিয়ে মাঝে মাঝে সে দোলনের সঙ্গে মেতে যায়। তাতে তার মাথার ভার কমে যায়, মন হালকা হয়।
আজও দোলনের রিমোট গাড়ি নিয়ে খেলতে খেলতে মনটা ভালই লাগছিল তার। কিন্তু একটা পিন ফোঁটার মত ছোট্ট খোঁচা বিধেই রইল ভিতরে। ধীরেশ টাকাটা তাকেই কেন পাঠাল?
সামান্য সব চিন্তা ও উদ্বেগ কৃষ্ণজীবনকে বড্ড অন্যমনস্ক করে দেয়। গুরুতর চিন্তা-ভাবনায় ছেদ পড়ে। চেকটা সে কি ভাঙবে, না কি ফেরত পাঠাবো? সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
