এবার পুজোর আগে কয়েকটা দিন কৃষ্ণজীবন প্রাণ ঢেলে পড়োল। তার ছাত্রী ও ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই কৃতী হবে, যশস্বী হবে কৃষ্ণজীবন জানে। দেশে ও বিদেশে ছড়িয়ে পড়বে এরা। কিন্তু শেষ অবধি এদের বেশির ভাগই মোটা বেতনের চাকরি করবে। চাকরিই করবে। প্রভূত ধনাগম হবে এদের। গাড়ি-বাড়ি হবে। নাম হবে। অহঙ্কার হবে। তাতে পৃথিবীর কিছু এসে যাবে না। কিছুই ইতারবিশেষ হবে না। এই বিশাল গরিব ভারতবর্ষের। রুজি-রোজগারেই সীমাবদ্ধ থাকবে এদের জ্ঞান · গবেষণার ভিতর দিয়ে পৃথিবীর কিছু উপকারও করবে বটে। এরা, তবু সীমাবদ্ধ থাকবে নিজেদের সীমাবদ্ধতায়। ওই খোলসটা ভাঙা দরকার। পৃথিবীতে জ্ঞানী ও কৃতীর কোনও অভাব নেই। অভাব নিজের সংসার, নিজের অভ্যাস ও চরিত্রের খোলে বন্দী নয় এমন মানুষের। কে কত বড় বৈজ্ঞানিক বা দার্শনিক হল, কে পেল কোন শিরোপা তা জেনে কোন লাভ হবে চব্বিশ পরগনার মুখ এক গরিব চাষীর?
নিজের সীমাবদ্ধতাকে বড্ড বেশি টের পায় বলেই কৃষ্ণজীবন আজকাল আরও একটু বেশি অস্থির। সে কিছুতেই অর্জিত জ্ঞান ও দার্শনিকতার সঙ্গে জনজীবনের যোগাযোগের রাস্তাটা খুঁজে পায় না।
তার এক প্রাক্তন ছাত্রের সঙ্গে ওয়াশিংটনে দেখা হয়েছিল তার। ধীরেশ। একটা বেসরকারি সংস্থায় বিশাল চাকরি করে। তাকে বাড়িতে নিয়ে গেল নিমন্ত্রণ করে। বেশ বড়সড় বাড়ি। ডলারের তেজে বাড়ি যেন ঝলমল করছে। ঝলমল করছে সুন্দরী বাঙালী স্ত্রী এবং মেয়ে। অনেকক্ষণ ধীরেশের সফলতার চিহ্নগুলো লক্ষ করে মিতবাক কৃষ্ণজীবন বলেছিল, তুমি অল্প বয়সেই খুব উন্নতি করেছো।
ধীরেশ লজ্জার সঙ্গে বলল, এ কোম্পানিতে আমিই একমাত্র বাঙালী স্যার।
কৃষ্ণজীবন ধীরেশের দিকে চেয়ে বলে, এতে তুমি খুশি তো!
ধীরেশ উজ্জ্বল হাসি হেসেছিল।
কৃষ্ণজীবন তার ধীর, অনুত্তেজিত কণ্ঠে বলল, এর পর যদি কখনও আসি আমি জানতে চাইবো পৃথিবীর ঋণ তুমি কতটা শোধ করেছো।
তার মানে স্যার?
আমাকে অনেকেই পাগল বলে জানে, অ্যাবনরমাল মনে করে। কিন্তু আমি মনে করি প্রত্যেকটা মানুষই এই পৃথিবীর কাছে নানাভাবে ঋণী। যে যেমনই হোক, যত বড় বা ছোট, তার উচিত সেই ঋণ একটু করে শোধ করা। রোজ শোধ করা। যে-মানুষ পৃথিবীর ঋণ শোধ করে না, কিন্তু সুখভোগ করে, ঐশ্বৰ্য সঞ্চয় করে, সে লুটেরা, তস্কর। আর যাই করো, শুধু নিজেকে নিয়ে থেকো না।
ধীরেশ অপ্রস্তুত : তার সুন্দরী বউয়ের মুখবার। কৃষ্ণজীবন তাদের ডিনারের আসরটি প্রায় মাটি করে দিয়েছিল। সৌভাগ্যক্রমে আরও সব অতিথিরা এসে যাওয়ায় আবহাওয়া পাল্টে গেল। রবীন্দ্রসঙ্গীত, সুরা, সুস্বাদু খাবার ও নানা
সেই থেকে কৃষ্ণজীবন কিছু সাবধান হয়েছে।
চেক পাঠিয়েছে। লিখেছে, স্যার, অনেকদিন ধরে আপনার কথা ভাবছি। মনে হচ্ছে, আমি সত্যিই পৃথিবীর জন্য কিছু করছি না! হয়তো সেরকম কিছু করার কথা ভাবলেও কী করব তা স্থির করতে পারব না। কিন্তু আপনি কিছু করার চেষ্টা করছেন; আপনি যা করছেন তাতে আমার সমর্থন ও সহযোগিতা জানাতেই চেকটা পাঠাচ্ছি। আপনি টাকাটা কাজে লাগালে মনে করব আমি ও পৃথিবীর খানিকটা কাজে লাগলাম। শুনলাম। আপনি অক্টোবরে লস এঞ্জেলেসে আসছেন। আমার বাড়িতে যদি পায়ের ধুলো দেন। তবে ধন্য হবো।
কৃষ্ণজীবন চেকটার দিকে চেয়ে অনেকক্ষণ ভোবল। তাই তো! বক্তৃতা দিয়ে বেড়ানো এবং ভাবনা-চিন্তা করা ছাড়া সে তো এমনি কিছু করে না যাতে টাকাটা কাজে লাগানো যাবে! সে কি ধীরেশের চেয়ে কম স্বার্থপর?
চেকটা সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরল কৃষ্ণজীবন। তারপর ভাবতে বসল, কী করা যায়! কীভাবে কাজে লাগানো যায় টাকাটা? ধীরেশ তো তার পৃথিবীর ঋণ শোধ করতে লেগেছে। কিন্তু সে এখন কী করে?
বাড়িতে কেউ ছিল না; বিকেল পার হয়ে সন্ধে ঘনঘোর হল সাততলার ঘরে। একা ভূতগ্ৰস্ত কৃষ্ণজীবন বসে রইল তার চেয়ারে। কোনও সিদ্ধান্তে পৌছোতে পারল না।
সন্ধের পর রিয়া ফিরল তার ছেলেমেয়ে নিয়ে।
কি গো, বসে বসে কী করছো অন্ধকারে?
একটা কথা ভাবছি।
কী কথা?
আমার একটি ছাত্র কিছু টাকা পাঠিয়েছে। তার ইচ্ছে, কোনও সৎ কাজে টাকাটা খরচ করা হোক।
ওমা, এ তো ভাল কথা! দুশ্চিন্তার কী আছে?
আমি ভেবে পাচ্ছি না। তুমি বলতে পারো টাকাটা কিভাবে খরচ করা যায়?
কত আশ্রম, মিশন আছে। দিয়ে দাও। দুৰ্গতের সেবা হবে।
কৃষ্ণজীবন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, সেটাও ভেবেছি। কিন্তু সেটা তো ধীরেশ নিজেই করতে পারত। আমাকে টাকাটা পাঠাল কেন?
তুমি সব ব্যাপারই কেন জটিল করে নাও বলো তো!
কৃষ্ণজীবন ম্লান হেসে বলে, খুব বেশি সহজ আর শর্টকাট করাই কি ভাল? ধীরেশ তো আমেরিকাতেই টাকাটা কোনও সমাজসেবায় দিতে পারত। দেয়নি।
তা হলে যা ভাল বোঝো করো।
কৃষ্ণজীবন চুপ করে গেল। ধীরেশ তাকে একটু বিপাকে ফেলেছে।
দোলন কৃষ্ণজীবনের অন্ধ অনুকারী। বাবা যা বলে তাই তার কাছে বেদবাক্য। কৃষ্ণজীবন কবে তাকে শিখিয়ে দিয়েছিল, বাইরে থেকে ফিরে হাত পা মুখ ধুতে হবে, সে অক্ষরে অক্ষরে তা পালন করে। আজও হাত মুখ ধুয়ে পোশাক পাল্টে তবে বাবার কাছে এল দোলন।
বাবা, আজ আকাশে মেঘ নেই, তারা দেখবে না?
চলো যাই।
টেলিস্কোপ আর দোলনকে নিয়ে ছাদে উঠে এল কৃষ্ণজীবন। দোলন তারা দেখতে লাগল, কৃষ্ণজীবন বসে রইল তার পাশে।
আচ্ছা বাবা, আকাশে কটা যেন নীহারিকা আছে!
