বাবাকে নিয়ে একটা বিস্ময় আছে রামজীবনের। বাবা তাকে কখনও বকেনি, মারা তো দূরের কথা! যখন বখে যাচ্ছিল সে, তখনও কিছু বলত না কখনও। সেই নিরীহ মানুষটি আজ যে সব বলছে তাও শাসন করার জন্য নয়। ভালবাসার জন্যই।
রামজীবন হাতের আধখানা আতার দিকে চেয়ে রইল। থাকতে থাকতে বুঝতে পারল তার চোখে জল আসছে। একটু স্থলিত গলায় বলল, আপনাদের কষ্ট আমি তো দেখতে পারি না।
কষ্ট কি? কষ্টের বোধ না থাকলে কষ্টও নেই। চিরটা কাল আমরা এই ভাবেই তো দিব্যি কাটিয়ে এসেছি। আরও কত লোক আছে! আমাদের বাড়িতে যারা ভিক্ষে চাইতে আসে তারা তো আমাদের চেয়েও কত খারাপ আছে।
রামজীবন মাথা নেড়ে বলে, ওসব আমার সহ্য হবে না। বাবা। আমার কিছু একটা করাই চাই।
বিষ্ণুপদ হঠাৎ বললু, তুই কি কৃষ্ণকে হিংসে করিস?
হিংসে! বলে রামজীবন একটু থমকে গেল। একটু সময় নিয়ে গলাটা এক পর্দা নামিয়ে বলে, বড়দাদা বড় হয়েছে, আমরা তো হলাম না। বড্ড জ্বালাপোড়া হয়। বাবা।
যখন জ্বালা হয় তখন খুন চাপে তোর মাথায়?
তা চাপে বাবা।
তা হলেই বোঝা মনের মধ্যে কেমন যম বসে আছে আসন পেতে! ঠাকুর বলেন, বনের বাঘে খায় না, মনের বাঘে খায়।
বাবা, জ্বালাপোড়ারও একটু দরকার হয়। নইলে যে টগবগ করে না ভিতরটা। ওই হিংসেটাই তো আগুন!
রান্নার আগুন আর ঘরপোড়া আগুন কি এক?
তা নয় বটে।
বিষ্ণুপদ খুব হাসল, আতা, খেয়ে আমার খুব কথা আসছে রে আজ।
আপনি আরও বলুন বাবা। আমার শুনতে ইচ্ছে যাচ্ছে।
দুর পাগল, আমি কি একটা পণ্ডিত লোক নাকি!
আমার কাছে আপনার চেয়ে বড় আর কে আছে?
ওই তো মায়ায় বাধিস!
মায়া ছাড়া সংসারে আর আছেটাই বা কি!
বিষ্ণুপদ বলল, মায়া আছে। আবার বৈরাগ্যও আছে।
বড়দাদা যদি আমাদের পিছনে থাকত বাবা, তা হলে কিন্তু এরকমটা হতে পারত না। আজ যে আমরা পতিত হলাম তার জন্য আপনার বড় খোকাই কিন্তু দায়ী।
ওরকম ভাবতে পারিস। আবার অন্যরকমও ভাবা যায়।
সে কি রকম?
কৃষ্ণও কিছু কম কষ্ট করেনি। জামা নেই, জুতো নেই, বই খাতা নেই, পেটে ভাত নেই, সে একটা দিনই গেছে! সেখান থেকে এত উপরে উঠেছে—সে তার নিজের জোরে।
তা না হয় হল। কিন্তু সে ডাঙায় উঠল বলে যারা ড়ুবছে তাদের টেনে তুলবে না? বউয়ের আঁচল ধরে বসে রইল গিয়ে, এরকম কি কথা ছিল? আমরা যে তাকে মাথায় করে রেখেছিলাম। বাবা!
যেমনটি চাস তেমনটিই যদি সব পাওয়া যেত, তা হলে আর সংসারের মহিমা কি? ভগবানের তো ক্ষমতার অভাব নেই! লহমায় মানুষের সব দুঃখ ঘুচিয়ে দিতে পারেন। দেন না বলেই মানুষের কিছু মান-মর্যাদা এখনও আছে।
পয়সার দুঃখটাই দুঃখ নয়। বাবা, সে যে আমাদের ছেড়ে চলে গেল।
পয়সার দুঃখকে দুঃখ বলে ভাবিস না, সে খুব ভাল। কিন্তু সংসারে আরও সব দুঃখ আছে। আমরা হচ্ছি। শতচ্ছিন্ন কাপড়, রিপু দিয়ে, সেলাই দিয়ে চালাতে হয়। রেগে যাস কেন?
মাথাটা গোলমাল লাগে।
হিংসের চোটেই মদ খাস?
রামজীবন কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থেকে হঠাৎ বলল, আপনি কি অন্তর্যামী বাবা?
দুর বোকা! আমাকে ঠাওরালি কী তোরা?
আমি যে বড়দার ওপর রাগের চোটেই মদ খাওয়া ধরেছিলাম, এত জ্বালাপোড়া নেবাই কিসে?
মদে কি জ্বালা জুড়োয়?
না বাবা। একটু অন্যরকম লাগে।
তাই তো। বড্ড অন্যরকম হয়ে যাস তখন! রামজীবন বলে চিনতে পারি না।
রামজীবন হাসল, বড়দার ওপর আমার বড় রাগ বাবা। কিছুতেই রাগটাকে কমাতে পারি না।
আমার একটা কথা মনে হয়।
কী বাবা?
যখন ছোটো ছিলি, তখন তুই ছিলি কৃষ্ণজীবনের সবচেয়ে ন্যাওটা। ছায়ার মতো পিছু পিছু ঘুরতি। যেখানে কৃষ্ণ সেখানেই রাম। মনে আছে?
থাকবে না? খুব মনে আছে।
আমার মনে হয় আজও তুই বড়দাদাকে মনে মনে সবচেয়ে বেশি ভালবাসিস। কিন্তু হিংসের চোটে, রাগের চোটে তা বুঝতে পারিস না। রাগ আর হিংসের চাপানে ভালবাসাটা ঢাকা পড়ে আছে। ঠিক যেমন পানীয় ভর্তি পুকুর। ওপর থেকে মনে হয় ডাঙা, কিন্তু নিচে টলটল করছে জল।
কেমন সুন্দর কথা বলেন। আপনি বাবা! রোজ এমন করে বলেন না কেন?
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, ওরে, আমার তো মনে হচ্ছে আতা খেয়ে আমার একটু নেশা হয়েছে। নইলে এত বলি কি করে?
রামজীবন খুব হাসতে লাগল। শরতের সকালটা যেন সোনা ঝরিয়ে দিতে লাগল চারদিকে।
০৩৭. কনফারেন্স, সেমিনার এবং বক্তৃতা
দেশে ও বিদেশে এত বেশি কনফারেন্স, সেমিনার এবং বক্তৃতা দিয়ে বেড়াতে হয় তাকে যে, সে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিটা ঠিকমতো করে উঠতে পারে না। এ ব্যাপারে কৃষ্ণজীবনের অপরাধবোধ প্রবল। চাকরি ছেড়ে দিলেও এখন তার বিশেষ ক্ষতি নেই। বিদেশে ভাল চাকরির প্রস্তাব তো আছেই, তা ছাড়া এমনিতেই বিদেশ থেকে বক্তৃতা বাবদ সে বিদেশী মুদ্রা যা পায় তাতে স্বচ্ছন্দে সংসার চালিয়ে দিতে পারে। স্ত্রীর রোজগারের টাকাটাও কম নয়। কিন্তু কলকাতার চাকরিটার ওপর তার একটা মায়াও আছে। বিজ্ঞানহীন, ঔৎসুক্যহীন, উৎসাহহীন এই দেশের নিরুদ্যম ছেলেমেয়েদের মধ্যে সে একটা বিদ্যুৎ তরঙ্গ প্রবাহিত করতে চায়। সংসারে বা সমাজে তাকে যতই বাস্তববোধহীন, অন্যমনস্ক এবং প্রায় বোকা বলে মনে হোক না কেন, সে যখন ক্লাস নেয়। তখন সমস্ত ক্লাস থাকে চিত্ৰাপিত, সম্মোহিত। তার চেহারা ভাল, গলার স্বর ভাল, চমৎকার ইংরিজিও বলতে পারে, কিন্তু সে সবচেয়ে ভাল পারে নিজেকে উজার করে দিতে। ক্লাসে কে শুনছে বা শুনছে না, কে নোট নিচ্ছে বা নিচ্ছে না সেটা বড় কথা নয়। সে মগ্ন হয়ে যায়। তার বিষয়বস্তুতে। এত ড়ুবে যায় যে, ক্লাস শেষ হওয়ার ঘণ্টা অবধি কানো যায় না।
