বীণাপাণি অবাক হয়ে বলে, দরকারের কথা ওঠে কেন? আমি তোমার বিয়ে-করা বউ, নাকি?
সে ছিলে কোনওদিন।
আজ নয়?
নিমাই মাথা নিচু করে বলল, আজ আর আমি কে! তোমার কত মোসাহেব জুটেছে।
মোসাহেব অত সস্তা নয়। যাত্রায় নামলেই বুঝি মোসাহেব জোটে? এখনও আমাকে কেউ পাত্তাই দেয় না। সবে তো একটু-আধটু শিখেছি, আড় ভাঙছে।
যাত্রায় নামলে কেন? আমি তো বেঁচে ছিলুম।
বাঁচতে না। ঠিক সময় ওষুধপত্র না পড়লে মরতে হত। ভাগ্যিস পালা দুটো ভাল চলল, তাই কাকা খুশি হয়ে মাস কয়েক হল তিনশো টাকা মাইনে দিচ্ছে।
এই কাকাটি কে বলো তো! খুব শুনছি। তার কথা।
কাকার কথা বলার সময় কেমন যেন ভক্তিতে গদগদ হয়ে পড়ে বীণাপাণি। ভারী গলায় বলল, ওরকম মানুষ দেখিনি। নাটক আর অ্যাকটিং নিয়ে সারাক্ষণ বুদ হয়ে আছে। অন্য কোন দিকে মন নেই।
কিন্তু আমি শুনেছি লোকটা স্মাগলার।
সেটাও মিথ্যে শোনোনি। কাকা নাটকের জন্য বুঝি সব করতে পারে। এই যেমন তোমাকে বাঁচানোর জন্য আমি হায়া লজ্জা বিসর্জন দিয়ে যাত্রায় নামলুম, ঠিক তেমনি। ভালবাসার জিনিসকে বাচাতে মানুষ সব করতে পারে। কাকা স্মাগলিং করেছে। যাত্রার দল বানাবে বলে।
তাহলে তাকে কি ভাল লোক বলা যায়?
একবার চলো না বনগাঁয়ে, দেখা হোক, কথাবার্তা হোক, তারপর নিজেই বুঝতে পারবে কেমন লোক।
আমি এই বেশ আছি বীণা।
বোকা শ্বশুর আর শাশুড়ি ছেলে আর ছেলের বউয়ের আড়াআড়ি দেখে ভয় খেল। খুব স্বাভাবিক। বউ টাকা রোজগার কুরুন্টু ভুৱা সেই টাকায় দুটি খেতে পরতে পাচ্ছে। ছেলে আর বউতে আড়াআড়ি ছাড়াছাড়ি হলে তাদেরই বিপদ। পেটে টান পড়বে।
দুই বুড়োবুড়ি তখন ছেলেকে নিয়ে পড়ল, কাজটা খারাপ কেন হবে? সিনেমা থিয়েটারে আজকাল কত বাবুঘরের মেয়েরা নামে। পাশ-টাশ করা সব মেয়ে। ওসব এখন আর কেউ ধরে না।
শাশুড়ি গোপনে তাকে এমন কথাও বলল, মনিবকে খুশি রেখো। মনিব অন্নদাতা ভগবান। শরীর যদি ঐটোকাটা হয়ে পড়ে তো গঙ্গায় ড়ুব দিয়ে এলেই সব পাপ ধুয়ে ফর্সা।
গুণ একখানা ছিল নিমাইয়ের। মা-বাপের ওপর ভক্তি। শেষ অবধি যে সে বনগাঁয়ে বউয়ের ঘর করতে এল সে। ওই মা-বাপের জন্যই। তাদের কথায় বা আদেশে ততটা নয়, যতটা তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য।
শ্বশুরমশাইয়ের খুব ইচ্ছে, বনগাঁয়ে গিয়ে ব্যাটা-বউয়ের সঙ্গে থাকে। সেটা হতে দিল না নিমাই। বলল, আগে আমি গিয়ে সব বুঝে আসি, তারপর দেখা যাবে।
বনগাঁয়ে এসেই যে নিমাই সব বুঝতে পারল, এমন নয়। তবে বীণাপাণি যে ভারী ব্যস্ত মানুষ এবং তাকে যে সেই গ্ৰাম্য সরল বোকা বিউটির মতো আর পাওয়া যাবে না সেটা টের পেতে তার দেরী হল না। এতে তার অভিমান হতে লাগল, সে বেকার লোক, সারাদিন কাজ নেই বলে বসে থাকে, আর তার বউ সকাল-বিকেল রিহার্সাল দিতে যায় নাওয়াখাওয়ার সময় নেই-এটা ভাল লাগার কথাও নয়। তার ওপর পালা নিয়ে বাইরে যাওয়া তো আছেই। হয়তো দু রাত্তির তিন রাত্তির ফেরেই না। বউয়ের রেশ নামডাক হচ্ছে চারদিকে। লোকে পথে-ঘাটে বাজারহাটে নিমাইকে টিটকিরি দেয়। তাই থেকেই বোঝা যায় যে, বউয়ের নামডাক হচ্ছে।
নাম হচ্ছিল বিশ্ববিজয় অপেরার। বারাসতে নিখিল বঙ্গ যাত্ৰা উৎসবে বিশ্ববিজয় অপেরার দুখানা পালা হল, দুখানাই মুকুট, কলকাতার দলগুলোর মতো অত হ্যান্ডস নেই তাদের, নামডাকের অভিনেতা-অভিনেত্রী নেই, তবু বিশ্ববিজয় ফাটিয়ে দিল।
বীণাপাণি সবে তার ঘরবন্দী নারীত্বের খোলস ছেড়ে হাজার মানুষের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার অদ্ভুত মুক্তির স্বাদ পাচ্ছে, এরকম সময়ে ঘরে ফিরে সে রোজ একখানা বিমর্ষ অন্ধকার মুখ দেখে খুশি হবে কেন? দেখে দেখে তেতো হয়ে যেতে লাগল।
কী হয়েছে তোমার বলো তো? আমন গোমড়া মুখ করে থাকো কেন?
নিমাই ঝগড়া করত না। ঝগড়াঝাঁটি, খিটিমিটি তার মোটে আসেই না। সে হল পান্তা-পুরুষ। জলে ভেজা, ঠাণ্ডা। শুধু ডাইনে বাঁয়ে মাথা নেড়ে একটা নেতিবাচক ভঙ্গি করে। তার বেশি কিছু নয়। মাঝে মাঝে কাতরভাবে বলত, আমার যে এখানে করার কিছুই নেই। একটু কিছু না করলে কী হয়?
যাত্রার দলে লোকলঙ্কর লাগে। সে-কাজে ঢোকাতে চেয়েছিল বীণাপাণি, নিমাই রাজি হচ্ছিল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে।
কিসের বাড়াবাড়ি তা আর ভাঙল না।
বছর দুই এইভাবে চলল। বীণাপাণি জমি কিনে ফেলল বনগাঁয়ে। দুখানা ঘর। নিমাই নিজেই তত্ত্বাবধান করল, কিন্তু উদাসীনভাবে। বীণাপাণির যে হচ্ছে তাতে যেন ওর কিছুই না। বীণা ভারী বিরক্তি বোধ করে নিমাইয়ের ওপর।
ওর কিছুই কি ভাল লাগে না বীণার। লাগে। যখন খুব ভোরবেলা ঘুমচোখে সে শুনতে পায়, নিমাই উঠে বারান্দায় বসে সুরেলা গলায় প্রভাতী গাইছে। ভজ গৌরাঙ্গ, কহ গৌরাঙ্গ শুনতে শুনতে গায়ে কাটা দেয়। নিমাইয়ের আর একটা ব্যাপারও ভাল লাগে বীণার। তার বাবার সঙ্গে নিমাইয়ের আবছা একটা মিল আছে। দুজনেই ভারী নিরীহ।
বাইরে আজ মেঘলা দিন। গুড়ো বৃষ্টির একটা আবছায়া চারদিকে। এইসব দিন বীণাপাণির পক্ষে খারাপ, বিশ্ববিজয় অপেরার পক্ষে খারাপ। বর্ষাকালে বায়না নেই-ই প্রায়। এবারের ভারী বর্ষায় কয়েকটা বুঝায়না কেঁচেও গেছে। আজকাল আর হাত পা ঠুটো করে ঘরে থাকা তার ভাল লাগে না। ঘর যেন গারদ। আর এমন দরকচা-মারা দিনে ওই লোকটা বাক্স গুছিয়ে চলে যাওয়ার জন্য পায়তাড়া কষছে। দুধকলা দিয়ে কাল-সাপ পোষারই সামিল হল বোধহয় ব্যাপারখানা।
