এই দেখ, ওকালতি পাশ করে এলে নাকি? তখন বলেছিলাম, তখন একরকম মনে হয়েছিল বলে। এখন মনে হচ্ছে, তুমি কথাটা খারাপ বলনি।
তা হলে যাও, বাগানে বসে একটু গাছপালার সেবা দাও।
কাজটা বিষ্ণুপদর খুব পছন্দের। এবার ভারী বর্ষায় গাছ বেড়েছে খুব। বাগান দেখার কেউ নেই বলে আগাছায় একেবারে বনবিবির থান হয়ে আছে। দা আর কোদাল নিয়ে লেগে গেল বিষ্ণুপদ। লেগে গিয়ে বুঝল, শরীরের সেই ক্ষমতা আর নেই। হাত পায়ে যেন জরা একেবারে বাটখারার মতো চেপে বসে আছে। দামেও বেশ ঘাটতি হচ্ছে।
নয়নতারা বারান্দার কোণে কখন এসে দাঁড়িয়ে তার কাণ্ড দেখছিল। এবার চেঁচিয়ে বলল, ওগো, অতি হুড়মাড় কোরো না। বয়স বসে নেই। ধীরে সুস্থে সইয়ে সইয়ে করো। কোদাল চালাতে হবে না, গাছের গোড়াগুলো একটু সাফ করে দাও, তাতেই হবে।
রোদ উঠল। বউরা উঠল। ছেলেরাও উঠে পড়ল। রামজীবন সকালে উঠে বাপ-মাকে প্ৰণাম করে রোজ। আজ বাপকে খুঁজে না পেয়ে বলল, ও মা, বাবা কোথায় গেল?
বাগানে কাজ করছে।
অ্যাঁ! বলো কি? বাবার কি আর সেই ক্ষমতা আছে? ছিঃ ছিঃ!
ওরে, কিছু হবে না। কাজে থাকলেই ভাল থাকবে।
খুঁজতে খুঁজতে যখন আতা গাছের তলায় বিষ্ণুপদকে খুঁজে পেল রামজীবন, তখন বিষ্ণুপদ মস্ত একখানা আতা ভেঙে মগ্ন হয়ে খাচ্ছে। আতার মাখন লেগে আছে ঠোঁটের পাশে।
বাবা!
আয় রে, বোস। আতা খাবি?
বসবার মতো জায়গা এটা নয়। বর্ষা গেছে এবার খুব। মাটির পোরে পোরে এখনও জল ঢুকে আছে। ঠেসে বসলে পাছার কাপড় ভিজে যাবে।
এঃ হেঃ, এ যে ঠাণ্ডা লাগিয়ে ফেলবেন বাবা! বাগানের কাজ করতে গিয়ে হার্টের গড়বড় হয়ে গেলে? আপনি উঠন, ঘরে যান। আতা পেড়ে ঘরে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
বিষ্ণুপদ একটু হেসে বলে, অমন হুড়ো দিচ্ছিস কেন? বেশ লাগছে। এখানটায়। বোস না ঘাসের ওপর!
রামজীবন বসল। বলল, মায়ের আক্কেল দেখে অবাক হই। সকালেই লাগাল বাগানের কাজে! কেন, গায়ে কি কামলার অভাব!
তোর মা লাগায়নি। আজ এমনিতেই একটু ইচ্ছে হল। শরীর নাড়লে খিদেটাও পায়।
তা বটে। কিন্তু বেশি নাড়োনাড়ি কি ভাল এই বয়সে!
তোরা সবাই মিলে আমাকে এমন বুড়োই বানালি যে, নিজেকে বুড়ো ভাবতে ভাবতে অথর্ব হয়ে যাচ্ছি।
তা একটু হাঁটাহাঁটি করলেই তো পারেন। বসা শরীরকে হঠাৎ দুনো খাটালে হিতে বিপরীত হবে যে?
আচ্ছা, একটা কথা বলবি?
কি কথা বাবা?
তোর এত পিতৃভক্তি, মাতৃভক্তি, তবু খারাপ অভ্যাসগুলো এল কোথা থেকে রে?
রামজীবন যেন একটু লজ্জা পেয়ে মাথা নামাল। কিন্তু কথাটা পাশ কাটাল না। একসময়ে রামজীবনই ছিল বিষ্ণুপদর ছেলেদের মধ্যে সবচেয়ে সুপুরুষ। কৃষ্ণজীবনও খুব সুপুরুষ আর জোয়ান সমর্থ বটে, কিন্তু তত লম্বা-চওড়া না হলেও রামজীবনের রং আর মুখের গড়ন চমৎকার, ছেলেবেলায় যাত্রাপালায় বালক কৃষ্ণ সাজত। কিছু গুণ ছিল, কিন্তু অগুণগুলোই কেন যে বেড়ে উঠল কে জানে! আজকাল আর রামজীবনের চেহারায় কোনও জলুস নেই। চোয়াড়ে একখানা মুখ, গায়ের রঙ তামাটে, মাথার চুলে এই বয়সেই পাক ধরেছে। পোশাক-আশাকের তেমন কোনও চাকচিক্য নেই। মুখখানা যখন তুলাল রামজীবন, তখন বড্ড বিমর্ষ একটা ভাব এসেছে মুখে। একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, কুসঙ্গে পড়েই তো ওসব হয়। বাবা!
আর একখানা মস্ত আতা ভেঙে বিষ্ণুপদ তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, নে, খা।
হাত বাড়িয়ে নিল রামজীবন। কিন্তু খেল না। চুপ করে বসে রইল।
বিষ্ণুপদ বলল, এ গাছে যে এত আতা হয় জানতামই না। এইটুকু ছিল গাছটা।
গত বছর থেকে ফলন দিচ্ছে। বাগানটা জঙ্গল হয়ে থাকে বলে কেউ আসেও না, লক্ষও করে না। গত বছর অবশ্য বিশেষ ফলন হয়নি। দু-চারটে মাত্র। এ বছর ঢেলে দিয়েছে।
বিষ্ণুপদ আতার মধ্যে মুখ ড়ুবিয়ে খেতে খেতে বলে, গাছ কত সয় বয়, ফল দেয়। গাছের কাছে শিখতে হয়। কত কী শেখার আছে!
রামজীবন মাথাটা নত করে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলে, সংসারটা আমার জন্যই ছারেখারে যাচ্ছে বাবা।
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, তুমিও কেউ নও, আমিও কেউ নই, নিজেকে নিমিত্ত ভাবিস কেন?
আমি মোদ্দা মাতাল লোক, পয়সা ওড়াই, ঝগড়া বিবাদ করি।
আতার একখানা বিচি ফুড়ুক করে ফেলে বিষ্ণুপদ বলে, সবাই একরকম হয় না। কৃষ্ণজীবন তো অনেক ফারাকে। তুই আর বামা নিজেদের আর ছাড়িয়ে উঠতে পারলি না।
সেই কথাই তো বলছি।
বটতলার ওরা কারা বল তো! চিনতে পারছি না। মাঝে মাঝে আসে।
বন্ধুবান্ধবের মতোই। তবে চক্করটা ভাল নয়!
খুনখারাপি করে নাকি?
তা করে।
তোর সঙ্গে সম্পর্কটা কেমন ধারা?
বিকেলের দিকে বসা হয় মাঝে মাঝে।
তোর কি ওদের কাছে কোনও দেনা আছে?
হয়ে যায় মাঝে মাঝে।
দেনা করিস কেন? আমরা যখন খুব গরিব ছিলাম তখনও বাবা শেখাত, দেনা করতে নেই। আমরা তো অল্পেীস্বল্পে চালিয়ে নিতে শিখেছি। তুই পারিস না?
মদ আর জুয়াই আমাকে খেল।
আর কিছু নেই?
আছে বাবা। সেসব আপনার শুনে কাজ নেই।
চুরি-ডাকাতি?
ফের অধোবদন রামজীবন মুখখানা অনেকক্ষণ বাদে তুলে বলল, দুটো ডাকাতিতে ছিলাম।
ওইটেই খারাপ করেছিস। গোরস্তরা কত কষ্টে রোজগার করে, তা কেড়ে নিস কেন?
আতা খেতে খেতে এত সরলভাবে কথাটা বলল বিষ্ণুপদ যে, রামজীবনের বুকে কথাটা যেন দুটো টোকা মেরে উড়ে গেল। রামজীবন উদাস গলায় বলল, দিনকাল যা পড়েছে। বাবা, এসব ছাড়া আর উপায় কি বলুন! গাঁ-গঞ্জের অবস্থা তো আরও খারাপ।
বিষ্ণুপদ ছেলের দিকে চেয়ে বলে, এই যে আতা দেখছিস, বিচিতে ভরা। গিজ গিজ করছে বিচি। বিচি ফেলে তবে আতার মাখন।টুকু খেতে হয়। তাই না? মানুষের জীবনটাও তেমনই মেলা বিচি। ওসব বাদছাদ দিয়ে তবে খেতে হয়। বাঁকা পথ নিবি কেন? এ বংশের যা ধারা, তাতে ওসব কি তোর সইবে? কঠিন হয়ে পড়বে যে!
