ওটাই তো তোমার দোষ। শরীরটা বড্ড বসিয়ে ফেলেছে। দাঁড়াও, কাল থেকে তোমাকে হাটেবাজারে পাঠাবো।
রক্ষে করো! বিকিকিনির মধ্যে আমি আর যেতে পারব না। পয়সার হিসেব গুলিয়ে ফেলব। ওসব কথা থাক, তোমার ভূতের বৃত্তান্ত বলো।
বললাম তো। নিশুত রাতে ওরকম সব হয়।
বিষ্ণুপদ উঠে একটু জল খেয়ে বলল, তোমার যেমনটি হয়, অনেকটা তেমনতর আমারও হয়। আমার যেন মনে হতে থাকে, দেহ ছাড়বার সময় যত কাছে এগিয়ে আসতে থাকে তত প্রেতলোকের ছায়া এসে পড়ে চারধারে।
মা গো! তুমি কি বলছে আমার মরার সময় হয়েছে?
তা কি জানি! এটা বুঝি যে, বয়স ভাটির দিকে। এখন ওসব হলে বুঝতে হবে ঘাঁটি ছাড়ার সময় হয়েছে।
তুমি বাপু, একটু কেমন যেন আছো। বড্ড ঠোঁট-কাটা।
তোমাকে ছাড়া আর কাকে এসব বলব বলো তো!
আমি যে ভয় পাই। সংসার-টংসার নিয়ে জড়িয়ে মড়িয়ে আছি, এই বেশ আছি। ওসব কথা তুললে কেমন ঘাবড়ে যাই। হ্যাঁ গো, একটু তীৰ্থ করতে যাবে? মনটা ভাল করে আসি চলো।
ও বাবা, সে তো মস্ত খরচের ব্যাপার!
দূরে নয় গো। কাছেপিঠেই কোথাও যাই চলো। রামজীবনকে বললে খরচ দিয়ে দেবে।
বিষ্ণুপদ বলল, ওর এখন অনেক খরচ। ঘর শেষ করতে পারছে না বলে মাথাটাও গরম। বলতে যেও না।
গেলে ভাল হত। কিন্তু। তারকেশ্বর বা ওরকম কাছেপিঠে গেলেও কি অনেক খরচ? কাশী-বৃন্দাবন তো যেতে চাইছি না। এক জায়গায় থেকে কেমন দম বন্ধ হয়ে আসে।
তীর্থেই বা কোন শ্বাস ফেলার জায়গা আছে বলো তো! সব জায়গাতেই ভিড়।
আচ্ছা, তোমার কি ভগবানে ভক্তি নেই? সত্যি করে বলো তো! এতকাল ধরে তোমাকে দেখছি, কোনওদিন মুখ ফুটে ভুবন্ধু কথাটা বললে না। কত ব্রত করেছি, পুজাে করেছি, তোমার তাতে কখনও যেন গা ছিল না। ইয়া গো, তুমি কি নাস্তিক?
বিষ্ণুপদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে করুণ গলায় বলে, তাও ঠিক বুঝতে পারি না।
সত্যি কথাটা বলেই ফেল না।
বিষ্ণুপদ দুর্বল গলায় বলে, যা ভাবছো তা নয়। কিন্তু তোমাদের মতো করে নয়।
তা হলে কার মতো করে?
আমার নিজের একটা রকম আছে। তোমরা যে পুজো-আচ্চা করো তার মধ্যে একটু ব্যবসা-বুদ্ধি আছে। ফুল বাতাসা দিয়ে ভগবানের কাছ থেকে কিছু আদায় করে নেওয়া। দমাদম বাজনা, ট্যাঙস ট্যাঙস। কাঁসি বাজিয়ে দুর্গাপুজো হয়, ও আমার কেন যেন ভাল লাগে না। আমার মনে হয়, ভগবান ঠাণ্ডা সুস্থির একজন মানুষ। তাকে বুঝতে হলে নিজেকেও একটু ঠাণ্ডা বা সুস্থির হতে হয়।
তুমি কত জানো। আমার হল মেয়েলি বুদ্ধি।
আমি যে একটা জান বুফওলা মানুষ এ কেবল তোমার মতো বোকার কাছে। আমি কীই বা জানি? কতটুকুই বা বুঝি!
বিদ্যের জাহাজ না হলেও তুমি বাপু অনেক জিনিস স্পষ্ট টের পাও। অনেক বিদ্বানেরও সেই ক্ষমতা নেই।
এই না হলে নয়নতারা। তা ভাল, এরকমই বোকাসোকা থেকো। সংসারে বোকা আর ভালদের দাম না থাক, তাদের ওপর ভগবান সন্তুষ্ট থাকেন।
বাকি রাতটুকু আর দুজনের কারোই ঘুম হল না। কথা কয়ে, জল খেয়ে আর এপোশ ওপাশ করে কেটে গেল।
রোদ উঠবার অনেক আগেই তারা উঠে পড়ে। তখন অন্ধকার থাকে, চারদিকটা থাকে ঘুমন্ত। একটা দুটো পাখি সবে ডাকতে শুরু করে। একটা সময় আছে, ইরফানের মোরগাটা যখন জানান দেয়।
সকালে নয়নতারার মেলা কাজ থাকে। ঘরদের সারা, লেপাপোছা, আরও অনেক কিছু। বিষ্ণুপদর কোনও কাজ থাকে না। জলচৌকিতে বসে আজ সে শরতের একটু হিম মাখানো ভোরবেলাটিকে বড় ভালবাসল।
ডেকে বলল, কয়েকটা শিউলি তুলিব নাকি গো? তোমার ঠাকুর পুজোয় লাগবে।
তা তোলো। বাসি কাপড় ছেড়ে হাত পা একটু ধুয়ে নাও।
বাঁশের সাজিটা নিয়ে বারান্দা থেকে নেমে পড়ল বিষ্ণুপদ। এই ফুল তোলাটা তার একটা দৈনন্দিন কাজ করে নিলে কেমন হয়?
গাছ দুটো ঝোপে কী ফুল! কী ফুল! মাটিতে ঘাসে কোথাও পা রাখার জায়গা নেই। ফুলে ফুলে ছয়লাপ হয়ে আছে।
বিষ্ণুপদ হাঁক দিল, হ্যাঁ গো, মাটিতে পড়া ফুল কি পুজোয় লাগে?
নয়নতারা উঠোনের এক প্রান্ত ঝাঁট দিতে দিতে বলল, শিউলিতে দোষ হয় না, যেটা পায়ে লাগবে সেটা কুড়িও না।
গাছেও মেলা আছে।
তবে গাছেরগুলোও তোলো।
গাছের পাতায় পাতায় বেঁটা আলগা হয়ে কত শিউলি ঢলে পড়ে আছে। একটু নাড়া খেলেই টুপ করে খসে পড়ে। শিউলির বেঁটা কেন এরকম তা বুঝতে পারে না বিষ্ণুপদ। দুনিয়ায় একঢালা নিয়ম কিছু নেই। শিউলির ধর্ম শিউলির, বেল ফুলের ধর্ম কেবল বেল ফুলেরই। একই মাটির একই রস টেনে কত নানারকম হচ্ছে। আশ্চর্য লাগে বিষ্ণুপদর।
সাজি ভরে উঠতে সময় লাগল না মোটেই। বিষ্ণুপদ ওপচানো সাজি নয়নতারার ঠাকুরের সিংহাসনের সামনে রেখে এসে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলল, আরও কিছু কাজ দেবে নাকি?
ওমা! এ যে ভূতের মুখে রাম নাম!
কেন, কাল রাতেই তো বললে আজ থেকে আমাকে দিয়ে মেলা কাজ করাবে।
তাই লক্ষ্মী মানুষটির মতো কাজ চাইছো? মরে যাই!
দোষটা কি আমার? তুমিই তো কিছু করতে দাও না। আমাকে।
একটা জীবন কম খেটেছো নাকি? কম কষ্ট করেছো? তখন এ জায়গার কী অবস্থা! হাট নেই, বাজার নেই, পথঘাট নেই! হেঁটে হেঁটে পায়ে কড়া পড়েছে। সাইকেলে কত মাইল যেতে হত যেন! উরেব্বাস, যখন ফিরে আসতে তখন মুখখানা শুকিয়ে এতটুকু হয়ে যেত।
আহা, তখন যৌবন-বয়স। ও বয়সে কষ্ট করাই ভাল। গায়ে লাগে না। বরং ভালই হয় তাতে।
সেই জন্যই বুড়ো বয়সে কষ্ট করতে দিই না। তা একটু-আধটু করতে চাও তো করো। এই তো বলছিলে, কাজ করতে গিয়ে মনে হয়। ছাইভস্ম করছি। হঠাৎ মন পাল্টালে কেন?
