তোর কেনা আর আমার কেনায় তফাত আছে। আমি ডেকোরেশনে বিশ্বাস করি না।
এ যুগে ডেকোরেশনরই দাম। ডেকোরেশন জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে।
তোর মাথা। খাওয়ার আয়োজনও বোধ হয় রয়্যাল স্টাইলেই হবে? একটা মেয়ের জন্য এত!
একটা মেয়ে কেন? আজি আমি কয়েকজনকে নেমন্তন্ন করেছি।
সভয়ে হেমাঙ্গ বলে, কাকে?
চারুশীলা মুখ টিপে হেসে বলে, ভয় নেই, বাড়ির কাউকে নয়। আমার বান্ধবী আর তাদের বরেরা। খাওয়ার ঘর দেখে যা।
খাওয়ার ঘরেও দেখা গেল, চারুশীলা টাকা ছড়িয়েছে। দেওয়ালে বিশাল প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলীর ওয়ালপেপার সদ্য লাগানো। বড় দেওয়াল বলে দৃশ্যটা খুলেছে চমৎকার। মাঠ, ঘাট, ক্ষেত, ধানের মড়াই, কুঁড়ে ঘর। প্রমাণ সাইজই বলা যায়। তবে গ্রামীণ দৃশ্যে কেন একটি আধুনিক মেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে তা হেমাঙ্গ বুঝতে পারছিল না। মেয়েটা একটু চেনা-চেনাও।
একে? মনে পড়ে? এ হল ঝুমকি! এদের বাড়ির সবাই আজ আসবে।
হেমাঙ্গর ভুল ভাঙিল। মেয়েটা ছবির নয়, রক্তমাংসের। একটু হেসে এগিয়ে এল, কেমন আছেন?
হেমাঙ্গ এই মেয়েটার মধ্যে সেই ভেজা, ভীতু। মেয়েটার একটা আদল পেল মাত্র। শুধু আদালটুকুই। আজকের ঝুমকি অন্যরকম। তেজী চাবুকের মতো চেহারা। একটু রোগার দিকে। মুখখানা যেন খুব যত্ন করে কেটে কেটে তৈরি করা।
হেমাঙ্গ বলল, আপনি কেমন আছেন?
মেয়েটা জবাব দিল না। ঘাড় হেলিয়ে হাসল। হাসিটা খুবই ভাল। পৃথিবীতে ভালরও কি শেষ নেই? ভালর পরও আরও ভাল, আরও ভাল—এটা কি ভাল?
০৩৬. ভূতুরে ভয়
আমার খুব ভূতুরে ভয় হয়েছে আজকাল, জানো?
ভূতের ভয়? সে কি! গায়ে গঞ্জে কতদিন কাটালে, এ ভয় তো ছিল না তোমার!
তাই তো ভাবি। দেশের গায়ে রাত-বিরেতে একটা পুকুরঘাটে গেছি, কত, ভয় বলে কিছু টের পাইনি। এখন হচ্ছে কেন বলো তো?
বিষ্ণুপদ একটু হাসে। বলে, আমি পাশে থাকলেও ভয় করে?
কি হয় জানো? হঠাৎ মাঝ রাত্তিরে ঝাম করে ঘুমটা ভেঙে যায়। ভাঙা মসজিদে তক্ষক ডাকে। আর বাঁশবনে কেমন মড়মড় শব্দ হয়। একটা হাওয়া বয়ে যায় হঠাৎ করে। শেয়াল ডাকে। তখন বুকটা কেমন উথাল-পাথাল করে। মনে হয়, কারা সব যেন আনাগোনা করছে চারপাশে। ফিসফিস করে কথা কইছে। কী একটা ষড়যন্ত্র হচ্ছে যেন। শুনছো, না ঘুমিয়ে পড়লে?
শুনছি। ঘুম কি আর মাইনে-করা চাকর যে ডাকলেই এসে হাজির হবে! ভাটির বয়স, এখন সবই কমতে থাকে। তা তোমার ভূতের বৃত্তান্তটা বলো, শুনি।
তাই তো বলছি। হ্যাঁ গো, এরকম কি ভাল?
নিশুত রাতে কতরকম মনে হয়। মানুষ তখন একা। একা হওয়াটা মানুষ পছন্দ করতে পারে না। তার জন চাই।
নয়নতারা গালের পানটা একটু চিবিয়ে নিয়ে একটা হেঁচকির মতো শব্দ করে বলে, এই যে তুমি আমার কাছটিতে আছো, কাছেই আছো তো! তবু ভয়-ভয় ভাবটা বড্ড চেপে ধরে। মনে হয়, আমার বুঝি কেউ নেই। বড্ড অন্ধকার লাগে চারদিকটা। গাটা কেমনু ছমছম করে। মনে হয়, কোন অজান দেশে চলে এলাম। চারদিকে অজান সব জিনিস।
এও বয়সেরই দোষ।
বেঁচে থাকলে বয়স তো বাড়েই। তাতে দোষের কি? কত বুড়ো মানুষ হোসে-খেলে বেড়াচ্ছে।
বিষ্ণুপদর দীর্ঘশ্বাসের শব্দটা নিশুত রাতে বেশ বড় হয়ে শোনা গেল। শ্বাসটা ফেলে বলল, আমরা যে কেমন একা হয়ে যাচ্ছি তা টের পাও? আপনজন, রক্তের সম্পর্কের মানুষের অভাব নেই। তবু কেমন যেন সব ছেড়ে যাচ্ছে। দূরের মানুষ হয়ে যাচ্ছে। টের পাও না?
তা যদি বলো। তবে বলতে হয়, ছেলেপুলে কি চিরকাল আগলে রাখা যায়? তাদের পাঁচটা কাজ আছে, রুজিরোজগার, আছে।
ওইটেই তো পরিস্থিতি কঠিন করে দেয়। যত বুড়ো হবে তত একা!
আমন করে বোলো না তো। তোমার কথা শুনলে মাঝে মাঝে বুক কেঁপে ওঠে আমার।
বলি কি আর সাধে! কৃষ্ণ তফাত হল, বামা তফাত হল, একটা কোথায় নিরুদেশ হল, মেয়ে দুটো কালেভদ্রেও আসে না। মাঝে মাঝে ভাবি, দুনিয় কেড়ে নিল সবাইকে। কেমন জানো? ছেলেবেলায় যখন গুলি খেলতাম, মাঝে মাঝে কেঁচড় বা পকেট থেকে পড়ে যেত। সব কটা কুড়িয়ে পেতাম না, কিছু হারিয়ে যেত।
এবার নয়নতারার দীর্ঘশ্বাসটা বেশ শব্দ করে হল। বলল, তা নয় গো। হারাবে কেন? সবাই-ই তো আছে। আমাদেরই আছে। শিবুটার কথা খুব মনে হয়। তুমি কি ভাবো বলো তো! বেঁচে আছে?
বিষ্ণুপদ একটা হাই তুলে বলে, না থাকার কি? আছে ঠিক। হয়তো জীবনে উন্নতিও করে ফেলেছে।
একদিন আসবে?
না এসে যাবে কোথায়?
আমি মরার আগে আসবে তো!
তুমি এখনই মরছে না। আগে আমার পালা।
তোমার একটা মরার বাই হয়েছে আজকাল।
কথাটা ভুল বললে। ইচ্ছে করে কেউ মরতে চায় না। এই যে আমাদের কথাই ধরো, কোন ধাপধাড়া গোবিন্দপুরে পড়ে আছি, কেউ পৌঁছেও না। আমাদের, বেঁচে থাকার কষ্টও কত, তবু কিন্তু মরতে ঠিক ইচ্ছে যায় না। মরার কথা ভাবলেই কেমন যেন হাঁফ-ধরার মতো লাগে। সেই যে কালঘড়ি দেখেছিলাম, তার পর থেকেই একটা মরণের ভয় মাঝে মাঝে এসে ভালুকের মতো চেপে ধরে।
নয়নতারা অন্ধকারেই তার মানুষটার দিকে তাকায়, বলে, মরার মতো কিছুই তো হয়নি তোমার। বয়সও এমন কিছু নয়, ভগবানের দয়ায় তেমন কোনও অসুখ-বিসুখও নেই। তবে ভাবো কেন?
ভাবনার সঙ্গেই তো সারাদিন যুদ্ধ করি। হাতে কাজকর্ম নেই, মাথাটা বোঁদা হয়ে গেছে।
কাজকর্ম একটু একটু করলেই তো পারো!
সেটাও ইচ্ছে যায় না। কেবল মনে হয়, পণ্ডশ্রম করে হবেটা কি? যে কাজই করি, মনে হয়, ছাইভস্ম। জীবনে আমার আর যেন কিছুই করার নেই।
