নতুন জিনিস কিনে এনে সে সেটা প্রথম দেখায় ফটিককেই। ফটিক বুঝদার সমঝদার মানুষ নয়। তবে সে-যাই দেখে তাতেই মুগ্ধ হয়, অবাক হয়। তারিফ করার ধরনটাও তার আলাদা রকমের।
আজ জুতো দেখে ফটিক বলল, এ খুব জস্পেশ জিনিস বলেই মনে হচ্ছে। হোসে-খেলে পাঁচ-সাতটা বছর চলে যাবে।
আহা, টেকার কথা হচ্ছে না, জিনিসটা কেমন বলো।
এ তো জুতো বলে চেনাই যায় না, যেন এক জোড়া জাহাজ। এতে কোনও কলকব্জা লাগানো নেই তো দাদাবাবু?
আরে না। জুতোয় কলকব্জা আসবে কোত্থেকে?
কি জানি, আজকাল সবকিছুতেই বড্ড কলকব্জা লাগানো থাকে। দই-ঘোঁটার কল, সরবতের কল, আটা-ময়দা মাখার কল। তার ওপর তোমার ওই বাক্স-উনুন-উঃ রে বাব্বা, কী অশৈলী কাণ্ডই যে হয় ওতে!
ফটিকের সঙ্গে কথা বলে একটা আরাম হয় হেমাঙ্গর। ফটিকের ভিতরে সভ্যতা ঢোকেনি, শহর ঢোকেনি, বিজ্ঞান বা সাহিত্য ঢোকেনি। ফটিক নিষ্কলুষ আছে। তাকে শিক্ষিত বা চালাক-চতুর করে তোলার বৃথা চেষ্টা কখনও করে না হেমাঙ্গ। বরং ফটিকের সরলতা আর বিস্ময় সে নিজেই শিখে নেওয়ার চেষ্টা করে।
ফটিকদা, জুতো জোড়া একটু পায়ে গলিয়ে দেখ, কী আরাম!
ফটিক শিহরিত হয়ে বলে, পায়ে দেবো! আমার কি মাথা খারাপ হল নাকি? শুনলেও পাপ!
আরে দূর! পাপ কিসের? জুতো তো পায়েরই জিনিস। পরে দেখই না একবার।
মরে গেলেও পারবো না। কী বলো না তুমি দাদাবাবু!
হেমাঙ্গ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, তোমাকে আর মানুষ করা গেল না। আচ্ছা, তোমার জুতো নেই?
তা থাকবে না কেন? এক জোড়া রবারের জিনিস আছে। হাওয়াই চটি।
চটি! শীতকালেও?
খুব ভাল জিনিস। শীত গ্ৰীষ্মে সমান পরা যায়।
ফটিকের সঙ্গে তার যে একটা বন্ধুত্ব গড়ে উঠছে সেটাকে খুবই উপভোগ করে হেমাঙ্গ। সারা দিন তার মেলামেশা কিছু টাকার কুমিরের সঙ্গে। তারা হচ্ছে টাকা-সর্বস্ব মানুষ। সারা দিন টাকার কথা শুনতে শুনতে হেমাঙ্গর একটা মানসিক ক্লান্তি আসে। তার আত্মা ক্লিষ্ট হয়। টাকার হিসেব কষতে কাষতে সে নিজেকে বুড়ো বলে ভাবতে শুরু করে। তাই বাড়িতে এসে যখন ফটিককে দেখে তখন একটা আনন্দিত বিস্ময় ঘটে তার। এই তো একটা মানুষ যার প্রয়োজন এত কম, এত অল্প নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে যা প্রায় অবিশ্বাস্য। বাঁচতে ফটিকেরও কিছু টাকার দরকার হয় বটে, কিন্তু ফটিকের মধ্যে টাকা-সর্বস্বতা নেই। এরকম লক্ষ লক্ষ মানুষ ছড়িয়ে আছে। ভারতবর্ষে, যাদের অবস্থা ফটিকের চেয়েও খারাপ। কিন্তু ফটিকের চরিত্রে লোভ জিনিসটাই দেখতে পায় না হেমাঙ্গ। কাছাকাছি এরকম একটা লোক থাকলে অকারণেই ভাল লাগতে থাকে।
বুধবার রাত্রিটা ভাল ঘুম হল না হেমাঙ্গর। নানা সম্ভাবনা ও তজ্জনিত দুশ্চিন্তায় তার মাথাটা গরম। তার নিশ্চিন্ত একক জীবনে চোরাপথে কি সিঁদ কাটা হচ্ছে? রশ্মি রায় কি ঢুকে পড়ছে তার সংসারে? বিডন স্ট্রিটের বাড়ি ছেড়ে একা থাকতে এসে তবে কি লাভ হল। তার?
বৃহস্পতিবার সকালে সে ফটিককেই জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, ফটিকদা, যদি হুট করে আমার একটা বিয়েটিয়ে হয়ে যায় তাহলে কেমন হয় বলো তো?
বিয়ে! সে তো খুব ভাল জিনিস। তখন বিউদিদি রান্নাবান্না করে দেবেন, ঘরদের সামলাবেন, বাড়িটা সরগরম রাখবেন।
বউ কি শুধু রান্না করে আর ঘর সামলায়?
আমাদের ঘরের বউ ওরকমই হয়। বউ এলে কাজ করে।
ধরো যদি কাজ করতে না হয়?
বউয়ের আর কোন উপযোগ আছে তা ভেবে পেল না। ফটিক। সবেগে মাথা চুলকে বলল, বাবুদের বাড়িতে বউরা কাজ করে না বটে, কিন্তু তাতে আধিব্যাধি হয়। গতর তো পুষে রাখবার জিনিস নয়।
হেমাঙ্গ একটু হাসল, তুমি একটি বেশ লোক ফটিকদা। মনে মুখে ফাঁক নেই।
ঘটনাবিহীন বৃহস্পতি কাটল, শুক্র গেল। শনিবার চারুশীলা ফোন করল রাতে, এই কিষ্কৃত, কালকের কথা মনে আছে তো?
আছে।
তুমি রশ্মিকে নিয়ে আসবি।
না, রশ্মি নিজেই চলে যাবে বলেছে।
তুই আনলে ভাল হত না?
না, হত না।
তাহলে তুই সকাল সকাল আসবি। এ বাড়িতে ও তো কাউকে চেনে না। লজ্জা পাবে।
লজ্জা পাবে! সে জিনিস নয় রে। এ অন্য ধাতুতে গড়া।
তা হোক। তোর নিজেরই উচিত। ওকে রিসিভ করা।
ঠিক আছে ভাই, যাবো।
বিকেল চারটের মধ্যে চলে আসবি।
বড্ড আর্লি হয়ে যাচ্ছে না?
হোক। শরৎকালে বেলা তাড়াতাড়ি শেষ হয়।
তোর সব ব্যাপারেই বড্ড বাড়াবাড়ি।
এ কথা খুবই ঠিক যে, সব ব্যাপারেই চারুশীলার কিছু বাড়াবাড়ি আছে। টাকা জিনিসটাকে সে ব্যবহার করে ইচ্ছেমতো লাগাম ছেড়ে। রবিবার দিন সে তার বিদঘুটে আর্কিটেকচারের বিশাল ঘরখানা নতুন করে সাজিয়েছে। ঝাড়পোঁছ পালিশে ঘরখানা আয়নার মতো ঝকঝকি করছিল। পুরনো কিছু আসবাব হয়তো-বা জলের দরে নীলামঘরে বেচে দিয়ে সে কয়েকটা নতুন ধরনের আসবাব কিনেছে। একখানা গ্লাসটপ নতুন পেল্লায় সেন্টার টেবিলও লক্ষ করল হেমাঙ্গ। যথাযোগ্য জায়গায় প্রচুর পরিমাণে রজনীগন্ধার স্টিক সাজানো। একটি মনোরম সুগন্ধী স্প্রে করা হয়েছে। সারা ঘরে।
হেমাঙ্গ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, এটাকেই বাড়াবাড়ি বলে, তা জানিস?
চারুশীলা গম্ভীর মুখে বলল, মোটেই বাড়াবাড়ি নয়। এটুকুর দরকার ছিল।
টুকু? হেমাঙ্গ চোখ কপালে তুলে বলে, এটাই যদি তোর কাছে কুকু হয়, তাহলে খানি হয় কিসে? সোফাসেট নতুন কিনলি বুঝি?
কিনলাম।
কত পড়ল?
তা দিয়ে তোর কী দরকার? তুই যে গুচ্ছের জিনিস কিনে ঘরটা জঙ্গল বানাচ্ছিস?
