নিজে রোধেছে?
আলবাৎ। ফরাসি দেশে গিয়ে পয়সা খরচ করে রান্না শিখে এসেছে। তোদের মতো গুচ্ছের মশলা দিয়ে টাগরায় জ্বালা-ধরানো রান্না নয়। এসব রান্না কিরকম জানিস, জিবে শান্তি, পেটে শান্তি, মনে শান্তি।
তোর তো দেখছি স্ট্রোক হয়েছে।
তার মানে?
লাভ-স্ট্রোক। শেষ অবধি একটা রাঁধুনীর প্রেমে পড়লি নাকি?
রান্না জিনিসটাকে মিনিমাইজ করছিস? রান্নাও যে একটা আর্ট তা জানিস? আজকাল সব ম্যাগাজিনে আর পেপারে কত রকম রান্নার রেসিপি ছাপা হয় দেখিস না? বড় বড় হোটেলের শেফরা কত মাইনে পায় জানিস? শুনলে মাথা ঘুরে যাবে। রান্না মোটেই ফেলনা জিনিস নয়।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তুই পেটুক তা জানি। কিন্তু ওই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তোকে কেউ হাত
করে ফেললে সেটা আমাদের পক্ষে খুবই দুঃখের ব্যাপার হবে। তোকে যা বলে দিয়েছিলাম সেটা খোঁজ করেছিলি?
কী বলেছিলি?
ওরা বামুন না। কায়েত?
ওই নিয়েই থাক। বামুন-কায়েত জেনে কী হবে? চোরের মন কেবল বেঁচেকার দিকে। রশ্মি আমার একজন ভাল
বন্ধু। আর কিছু নয়।
কবে দেখাবি?
দেখাবো মানে? দেখানোর কী আছে?
তোর যা অবস্থা দেখছি তাতে মনে হয়, গতিক সুবিধের নয়। ছাইক্লোন হতি পারে।
শ্ৰীকান্ত থেকে কোট করলি নাকি? একটু-আধটু বই-টই পড়ছিস তাহলে?
আমি তো পড়িই! তুই যে কিছুই পড়িস না। এই পিসটা বোধ হয় তোর পাঠ্য বইতে ছিল, তাই ধরতে পারলি।
গল্প উপন্যাস পড়ে আকাজের লোকেরা। আমার আত ফালতু সময় নেই। আর ওইসব গল্প উপন্যাস পড়েই তো তোর মাথাটা গেছে। সব জায়গায় প্রেমের গন্ধ পাচ্ছিস। তুই একটা যা-তা।
গল্প উপন্যাস পড়লে তোর নিরেট মগজেও বুঝতে পারতিস যে, তুই অলরেড রশ্মি রায়ের জালে আটকা পড়ে গেছিস। গল্প উপন্যাস মানুষকে অনেক বেশী কনশাস করে তোলে। যাক গে, আসল কথাটা বল। মেয়েটাকে কবে দেখাবি?
দেখানোর কিছু নেই, বললাম তো।
আচ্ছা ছোটলোক বটে তুই, কেল্পনাও ভীষণ। তোকে যে এত খাওয়াল, তোর কি উচিত নয়। ওকেও নেমন্তন্ন করে একদিন খাওয়ানো?
এ কথায় হেমাঙ্গ একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলে, কেন, আমি খাওয়াতে যাবো কেন?
ওটাই যে ভদ্রতা। দুনিয়াটা চলছে। লেনদেনের ওপর। শুধু একতরফা খেয়ে এলেই হল?
পার্টি দিতে হবে বলছিস?
হবে না? তুই কী রে!
ঠিক আছে, কোনও ভাল হোটেলে নিয়ে গিয়ে একদিন খাইয়ে দিলেই হবে।
এই না হলে তোকে দুনিয়ার পয়লা নম্বর গবেট বলা হয় কেন?
কেন, প্ৰস্তাবটা কি খারাপ?
ও তোকে বাড়িতে ডেকে যত্ন করে রোধে খাওয়াল, আর তুই ওকে হোটেলে নিয়ে গিয়ে খাওয়াবি? এটা কি বিলেত? না কি তুই মস্ত বড় সাহেব হয়েছিস?
হেমাঙ্গ অসহায়ভাবে বলল, তাহলে কি করব? বিডন স্ট্রিটের বাড়িতে নেমন্তন্ন করলে হাজারটা কথা উঠবে। কুমারী সুন্দরী মেয়ে বলে কথা! জবাবদিহি করতে জেরবার হবে আমার। আর এ বাড়ির রাঁধুনী হল ফটিক, সেই রান্না আমার মতো সহনশীল মানুষ খেতে পারে, কিন্তু রশ্মি পারবে কি?
তোকে আর বোকা-বুদ্ধি খাটাতে হবে না। রশ্মিকে নেমন্তন্ন করবি আমার বাড়িতে।
তোর বাড়ি? অ, বুঝেছি। এই ফাঁকে দেখে নিতে চাস তো?
দেখলে কি তোর ভাগে কম পড়বে?
নেমন্তন্ন যদি নিতে না চায়? যদি না আসে?
তোর বলার ভাগ বলবি, তারপর আমি বুঝব। ওর ফোন নম্বরটা আমাকে দে। তুই আগে নেমভন্ন করব, তারপর আমিও বলব।
তুই কিন্তু ব্যাপারটা পাকিয়ে তুলছিস। আমি ব্যাচেলর মানুষ, আমি ওকে নেমস্তন্ন না করলেও কিছু যায় আসে না। এই পাল্টা নেমন্তন্ন মানেই সম্পর্কটাকে আরও ঘুলিয়ে তোলা।
তোর মাথা! এ যুগে কেউ অত সহজে আছাড় খায় না। বিলেত-ঘোরা মেয়ে, খুব সোজা পাত্রী নয়। আর তুই বোকা হলেও সেয়ানা।
আরও একটা প্রবলেম আছে। তুই যা রাঁধিস তা কি ও খেতে পারবে?
চাটবে। তবে ভয় নেই, আমার রান্নার লোক আছে।
তা জানি। তার রান্না খাওয়াবি? তার হাতে হাজা নেই তো?
মুকুন্দ সদাচারী মানুষ, তোর মতো স্লেচ্ছ নয়। সাহেবী রান্নাও জানে। আমিও ওকে হেলপ করব। তোর ভয় নেই।
এ পর্যন্ত হয়ে ছিল। কিন্তু কঠিন হল, রশ্মিকে নেমন্তন্ন করাটা। একটা আচমকা লজ্জা আর সংকোচ বাধা দিচ্ছিল হেমাঙ্গকে পাল্টা নেমন্তন্নটা কি ঠিক হচ্ছে? চারুদি একটা গণ্ডগোল পাকিয়ে তুলছে না তো! শেষ অবধি অবশ্য সে দ্বিধা সংকোচ ঝেড়ে ফোনটা করে ফেলেছিল। আশ্চর্যের বিষয় রশ্মি এক কথাতেই রাজি হয়ে গেল। সামনের রবিবার সন্ধেবেলায় চারুশীলার বাড়িতে সে সানন্দে যাবে।
পৃথিবীর সব ঘটনার রাশ তার হাতে নেই। অনেক সময়ে ঘটনা ঘটে যায়, মানুষকে তা মেনে নিতে হয় মাত্র। পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী এবং অভ্যাসবশে হেমাঙ্গ ভগবান মানে, কিন্তু তার জীবনে কোনও ধর্মাচরণ নেই। মাঝেমধ্যে সে ভগবানের ওপর নির্ভরও করে। এখনও তার জীবনে এক সং। ভগবানের ওপর ভর করা ছাড়া তার আর উপায় নেই। পোড়া মাংসের স্বাদ তাকে পেড়ে ফেলেছে বটে, কিন্তু সে সেই সম্মোহন কেটে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। ঘটনার গতিক তার সুবিধের ঠেকছে না।
আজ কিছু কেনাকাটা করলে কেমন হয়? জিনিসপত্র কিনলে তার মনটা ভাল হয়ে যায়।
অফিস থেকে বেরিয়ে বেশ খানিকটা ঘুরে সে প্রায় হাজার টাকা দামের এক জোড়া জুতো কিনল। জুতো কিনতে তার যে কেন এখনও এত ভাল লাগে! জুতোর মধ্যে কোন আনন্দ লুকিয়ে থাকে কে জানে বাবা!
দামটা একটু বেশী পড়ে গেল, কিন্তু জুতো জোড়া এতই ভাল যে পায়ে দিয়েই একটা চমৎকার আরাম বোধ করল সে। জুতো তৈরির কলাকৌশলও এত অত্যাধুনিক হয়ে যাচ্ছে যে, সূক্ষ্ম সাইকোলজির সঙ্গেও জুতোর যোগসূত্র স্থাপিত হয়ে গেল বুঝি। পায়ে দিলেই মন অবধি ভাল হয়ে যায়।
