খাওয়ার টেবিলে রশ্মির কয়েকজন ভ্ৰী উঁচু, উন্নাসিক, ইংরেজি মাধ্যম বন্ধু ও বান্ধবীও ছিল। ছিলেন রশ্মির সুপুরুষ, রাশভারী, সংলাপ-বিমুখ বাবা এবং একজন বেশ ব্যক্তিত্বসম্পন্না ও আধুনিকা মা। না, এঁরা কেউ হেমাঙ্গকে তাচ্ছিল করেননি। বরং তাকে বেশ একটু খাতিরই করা হচ্ছিল। একটু বেশীই যেন। তার কারণ বোধ হয় এই যে, হেমাঙ্গ ঠিক তাদের মতো নয়। একটু গেয়ো, একটু সংকুচিত।
হেমাঙ্গর বাঁ-পাশে-বসা রশ্মির মা একটু চাপা স্বরে বলে ফেললেন, জানেন তো, রশ্মি একরকম ইউ.কে-তেই মানুষ। এবার গিয়ে সিটিজেনশিপ নিয়ে নেবে।
তাতে হেমাঙ্গর কিছুই যায় আসে না। সে ভেটকি মাছের চমৎকার স্বাদে প্রায় সম্মোহিত অবস্থায় বলল, ইউ.কে. ভাল জায়গা। ভালই হবে।
আজকাল ওসব দেশে খুব রেসিস্ট মুভমেন্ট হচ্ছে। তাই ভয় পাই।
হেমাঙ্গ একটা তন্দুরী রুটি ছিঁড়ে মাছের ক্যাথটিতে ড়ুবিয়ে তুলে মুখে দেওয়ার আগে বলল, তা বটে।
এ দেশে থেকেই বা কী হল বলুন! ও দেশে বরং লেখাপড়াটা হবে। পি-এইচ ডি করে ওখানেই প্রফেসরশিপ নিয়ে নেবে। আমরা একা হয়ে যাবো।
সঙ্গে যান না!
যাবো? আমাদের যে এখানে অনেক বিষয়সম্পত্তি। রশ্মির বাবা বিদেশে থাকতে রাজিও নন।
এক চামচ ফ্রায়েড রাইস নিল হেমাঙ্গ, তারপর বলল, আপনি?
সত্যি কথা বলতে কি আমার এ দেশ একটুও ভাল লাগে না। ও দেশে থাকলে একটুও বোর হই না।
হেমাঙ্গ ভদ্রমহিলার দিকে একবার তাকাল। দারুণ পেন্ট করা মুখ এবং প্রচুর রূপটানে বয়সটা বোঝা যায় না। মেয়েটি মায়ের উল্টো। রূপটানের বালাই-ই নেই। হেমাঙ্গ চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল, সেটা ঠিক কথা। ওসব দেশে এন্টারটেনমেন্টের অভাব নেই।
আমার তো পায়ে হেঁটে হেঁটে লন্ডনে ঘুড়ে বেড়াতে বেশ লাগে। উইক এন্ডে কান্ট্রি সাইডে চলে যেতাম। কী যে ভাল লাগতি!
হ্যাঁ। কান্ট্রি সাইডটা খুবই ভাল।
ভদ্রমহিলা সামান্য বিস্মিত হয়ে বলেন, আপনি গেছেন নাকি?
হেমাঙ্গ লজ্জিত হয়ে বলে, শর্ট একটা কোর্স করতে গিয়েছিলাম।
ওমা? কই, রশ্মি বলেনি তো আমাকে! হেমাঙ্গ একটু থিতামত খেয়ে বলে, ওটা কোনও ঘটনাই নয়। বিলেত, আমেরিকা আজকাল অনেকের কাছে জলভাত।
তাই বুঝি?
আমি একজন স্মাগলারকে জানি, প্রতি সপ্তাহে লন্ডন যায়।
যাঃ, বানিয়ে বলছেন!
ঠিক আছে, তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবো।
ভদ্রমহিলা বিস্মিত হয়ে বললেন, সত্যিই যায়?
কখনো-সখনো হয়তো এক-আধটা সপ্তাহ ফাঁক থাকে। কিন্তু খুব ঘন ঘন যায় জানি। ইন্টারন্যাশনাল স্মাগলার ছাড়াও যায় ব্যবসাদার, ট্র্যাভেল এজেন্টের লোক, কুরিয়ার সার্ভিসের লোক।
বোধ হয় ঠিকই বলছেন আপনি। এত আজেবাজে লোক যায় বলেই বোধ হয় ওরা আর বিদেশীদের পছন্দ করছে না।
যে আজ্ঞে।
রশ্মি একটু ঘুরে, তিনটে চেয়ারের দূরত্বে বসে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে খাচ্ছিল। একবার চোখাচোখি হতে একটু হাসল রশ্মি। বলল, কেমন খাচ্ছেন বুঝতে পারছি না। মা, ওঁকে একটু দেখেশুনে খাওয়াও।
হেমাঙ্গ মৃদু হেসে বলল, দারুণ!
রক্ষা এই যে, এ বাড়িতে ডিনারের আগে ককটেল ছিল না। সাধারণত এসব ঘ্যাম বাড়িতে ওটা থাকেই। তবে হেমাঙ্গকে একবার রশ্মি জিজ্ঞেস করে নিয়েছিল, আপনি কি ড্রিংক করবেন? আমাদের অ্যারেঞ্জমেন্ট আছে।
হেমাঙ্গর পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ডে মদের কোনও ভূমিকাই নেই। ফলে সে জিনিসটা কখনও উপভোগ করে না। দুৰ্ভাগ্যবশত তাকে অবশ্য বিভিন্ন পার্টিতে যেতে হয় এবং ভদ্রতা রক্ষার্থে হাতে গেলাসও ধারণ করতে হয়। এক বা দু চুমুক খেয়ে সে গেলাসটা গোপনে কোনও ফ্লাওয়ার ভাস-এর পিছনে বা টেবিলের তলায় বা পর্দার আড়ালে জানালার তাকে রেখে দেয়। সে বেশ উদ্বেগের গলায় বলে ফেলল, না, আমি ড্রিংকা করি না। আপনাদের কি ককটেলও আছে না কি আজ?
রশ্মি হেসে ফেলল, বলল, না। বাবা একটু রক্ষণশীল মানুষ। বাড়িতে ওসব পছন্দ করেন না। তবে কেউ চাইলে দেওয়া হয়।
বাঁচা গেল।
ককটেল ছিল না বলেই বেশ নিশ্চিন্ত মনে ডিনারটাকে উপভোগ করতে পারছিল। হেমাঙ্গ। এরকম ডিনার সে বহুকাল খায়নি। কিন্তু প্রশ্ন হল, খাওয়াটা আদৌ হচ্ছে কেন? একটা উপলক্ষ তো থাকবে? এই উপলক্ষটাই ধরতে পারছে না হেমাঙ্গ।
একবার সে আলগোছে রশ্মির মাকে জিজ্ঞেস করল, আজ কি আপনাদের কোনও অকেশন আছে?
অকেশন! না তো!
এই জন্মদিন-টনাদিন!
রশ্মির মা তার চড়া লিপস্টিক চিরে হাসলেন। মাথা নেড়ে বললেন, ওসব কিছু নয়। রশ্মি ফ্রান্সে রান্না শিখেছিল কিছুদিন। মাঝে মাঝে রাধে আর সবাইকে খাওয়ায়।
রান্না কি কোনও মেয়ের হবি হতে পারে?
কেন হবে না বলুন তো!
মেয়েরা রাঁধতে ভালই বাসে না।
সব মেয়ে কি সমান? রশ্মি একটু আলাদা ধরনের। এমন কি ওর সঙ্গে আমারও মেলে না।
রশ্মি যে একটু আলাদা তা ক্ৰমে ক্রমে বুঝতে পারছে হেমাঙ্গ। এরকম দুৰ্দান্ত ব্যাকগ্রাউন্ড, এরকম দারুণ সুন্দরী, তবু কোনও দেমাক নেই। কিংবা থাকলেও সেটা ঠুনকো বা বোকা দেমাক নয়। রশ্মি বেশ একটু অন্যরকম। হেমাঙ্গর মেয়েদের সম্পর্কে অনীহার ভাবটা কি রশ্মি কাটিয়ে দিচ্ছে!
এসব সেই গত রবিবারের কথা। আজ বুধবার। পোড়া মাংসের আশ্চর্য স্বাদ আর গন্ধটা কেন আজও আবিষ্ট করে রেখেছে হেমাঙ্গর নাক আর জিবকে?–
সেদিন ডিনারের পর বাড়ি ফিরতে না-ফিরতেই চারুশীলার ফোন, কি রে, কিরকম হল?
হেমাঙ্গ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল, তোর রান্নার নাকি প্রশংসা করে সবাই! ছো!। রান্না কাকে বলে তা আজকের ডিনারটা খেলে বুঝতে পারতিস। অধোবদন হয়ে থাকতে হত।
