শান্তি একটা বোগাস জিনিস অপু। নার্সিংহোমে থেকে সেটা আমি বুঝেছি।
তুমি নিজেই তো একটা গুণ্ডা। সেইজন্যই তোমার শান্তি ভাল লাগে না।
তা নয়। অপু। তোমরা যে শান্তির কথা ভাবো সেটা হল নিস্তরঙ্গতা, নিশ্চেষ্টতা, নিথরতা। আমি যখন কোমার মধ্যে ছিলাম। তখন তো আমার ওইরকম শান্তিই ছিল! চিন্তা নেই, ভাবনা নেই, ফ্রিকাশন নেই, টেনশন নেই। মরে গেলে তো আরও চমৎকার শান্তি, একদম ঠাণ্ডা। বেঁচে থাকাটা কিন্তু নিছক শান্তি নয়। নিরন্তর সূক্ষ্ম বা স্কুল কিছু-না-কিছু ফ্রিকাশন হয়েই যাচ্ছে। তুমি ভার্সাস তোমার পারিপার্শ্বিক। তুমি ভার্সাস তোমার আইডিয়াস। তুমি ভার্সাস তোমার অতীত ও বর্তমান। তুমি ভার্সাস ভাল অথবা মন্দ। যদি জীবন-বিমুখ হয়ে একটা কোটরের মধ্যে নিজেকে ভরে রাখতে পারো, তাহলে তুমি তোমার মতো শান্তি পেয়ে যাবে। আর যদি খোলা জীবনের মধ্যে এসে দাঁড়াতে চাও তাহলে সংঘর্ষ হবেই।
বড্ড লেকচার দাও তুমি। আমার কিছু ভাল লাগছে না।
দূর বোকা মেয়ে! বুককার ঘটনাটাকে অত বড় করে দেখছো কেন? ও যাদের মেরেছে তারা স্মল টাইম ক্রুকস। ওরা তেমন কিছু করবে বলে মনেও হয় না। আর যদি কিছু করেই তাহলেও বুবকারা তো তৈরি আছে। তাই না? বুবকা আছে, তার বন্ধুরাও আছে। সকলের কথাই ভাবো। শুধু বুবকাকে আড়াল করতে চাইছো কেন? ওকে কাপুরুষ হতে বোলো না। তাতে বন্ধুদের কাছে ওর সম্মান থাকবে না, ওর নিজের কাছেও না। ওর আত্মধিক্কার আসবে। বুঝেছো?
অপর্ণা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
বুবকা কোমল গলায় বলে, এবার একটু বাথরুমে যাবো, মা?
যাও। বলে অপর্ণা উঠে গেল।
পুল কার আসার সময় হয়নি। মণীশ একটু বাইরে এসে দাঁড়াল। আজকাল সিগারেট খাওয়া ছেড়েছে বলে অনেক সময় বড্ড ফাঁকা আর অর্থহীন লাগে। এখন লাগছিল। সিগারেট চিরকালের মতো ছেড়ে গেল তাকে। আর কী কী ছেড়ে গেল? হিসেব করতে হবে, ভাবতে হবে। মনে হয় আরও অনেক কিছু তাকে ছেড়ে গেছে।
কিন্তু শরতের এই সকালবেলাটা তার বড় ভাল লাগছিল। আজ তার অনেকদিন পর এই প্ৰথম বাইরে যাওয়া। যেন রাত্রির পর ভোর।
মণীশ কখন চলে গেছে তা আজ টের পেল না। অপর্ণা। এ রকম কদাচিৎ হয়। মণীশের অফিসে যাওয়ার সময়টায় বরাবর কাছে থাকে অপর্ণা। কিছু কথা থাকে না, কোনও ভাবপ্রবণতাও নয়। হয়তো নিছক অভ্যাস। আজ অপর্ণা শূন্য শেয়ার ঘরটায় চুপচাপ নিজের মনের মধ্যে ড়ুবে বসে আছে। খড়কুটোর মতো কত কী ভেসে যাচ্ছে মাথার ভিতর
পৃথিবীটা কেন এত খারাপ? কেন এত নিষ্ঠুর? কেন চারদিকে সবসময়েই এত বিপদ আপদ? এত সব ঝামেলা আর গণ্ডগোলের মধ্যে কী করে বেঁচে থাকবে অপর্ণার ছেলে আর মেয়েরা? কই, অপর্ণার ছাত্রীজীবনে তো এরকম খারাপ ছিল না পৃথিবীটা!
মা!
অপর্ণা ধীরে মুখ ফেরাল। দরজায় দাঁড়িয়ে বুবকা। লম্বা, পুরুষালি চেহারা। আরও বাড়বে। লম্বা চওড়া হবে। এখনও নাবালকত্ব গভীরভাবে বসে আছে চোখে আর মুখে। এখনও শিশুর মতো সরল।
আয়। বলে হাত বাড়ায় অপর্ণা।
বুবকা তার কাছে এসে বসে, তোমার মনটা খারাপ মা? আর ইউ ইন টেনশন?
ভীষণ। বলে ছেলের মাথাটা কাঁধে চেপে ধরে সে।
বুবকা তার নিষ্পাপ গলায় বলে, তুমি এত ভাবো কেন মা? কত ছেলে দুনিয়া জুড়ে কত কী করছে! বারো বছরের ছেলে প্লেন চালাচ্ছে, ষোলো বছরের ছেলে রাইফেল কাঁধে যুদ্ধে যাচ্ছে, কেউ আটলান্টিক পেরোচ্ছে নৌকায়। আমি তো তেমন কিছুই করিনি। একটা বদমাশকে একটু মেরেছি।
তোমার আর বীর হয়ে কাজ নেই বাবা। আমার কোল জুড়ে থাকো।
কোল! হিঃ হিঃ, কী যে বলো মা!
তোর বাবা যে গুণ্ডা ছিল তা জানিস?
জানি। তুমি অনেকবার বলেছে। বাবা তোমাকে একটা অদ্ভুত সেমিকনশাস অবস্থা থেকে রেসকিউ করেছিল। তুমি পুলিশের গুলিতে চোখের সামনে একটা লোককে মরতে দেখে একদম বুরবাক হয়ে গিয়েছিলে।
তা ছাড়াও আছে। তোর বাবা ট্যাক্সিওয়ালাদের ত্যাদাঁড়ামি দেখলে মার লাগাত, পুলিশের গাড়িতে ইট চূড়ত। এই তো এক বছর আগেও একজন দোকানদারকে কিসের দাম জিজ্ঞেস করায় সে একটা তেড়িয়া জবাব দিয়েছিল, তোর বাবা তাকে কলার ধরে এমন ঝাঁকুনি দিয়েছিল!
তারপর কী হল মা?
খুব হাঙ্গামা হল। অন্য দোকানদাররা ছুটে এল, জোট বাধল। তোর বাবা ভয় পেল না। এমন চোঁচামেচি বাঁধিয়ে দিল যে, ভয়ে মরি। তবে কথার তোড় আছে, গলার জোরও আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই খদেরদের এককাট্টা করে ফেলল। তখন দুদলে এই লাগে কি সেই লাগে।
বাবা তো ঠিক কাজই করে মা, তাহলে বাবাকে গুণ্ডা বলছো কেন?
একে গুপ্তাই বলে। অত সাহস কি ভাল?
তুমি মা, এক নম্বরের ভীতু।
অপর্ণা মুখে কিছু বলল না। কিন্তু সকালটা আজ বড় ভারী হয়ে রইল বুকের মধ্যে। শরৎ ঋতু নাকি দারুণ সুন্দর! অন্তত মণীশ তো তাই বলে। কিন্তু আজ সকালের এত রোদেও যেন আলো খুঁজে পেল না। অপর্ণা।
বিকেলে ডোরবেল বাজতেই অপর্ণা দরজা খুলল গিয়ে। সামনে বুবকা। তার পিছনে আপা। তার পিছনে আরও কয়েকটা ছেলে আর মেয়ে।
এসো, এসো। বলে অপর্ণা দরজা ছেড়ে দাঁড়ায়।
বুবকা একগাল হেসে বলে, ওদের নিয়ে এলাম মা। ওরা তোমার ভয় ভাঙাতে এসেছে।
০৩৫. পোড়া মাংসের স্বাদ
পোড়া মাংসের স্বাদটা আজও জিবে লেগে আছে হেমাঙ্গর। সঙ্গে একটা পাশ্চাত্য স্যালাড ছিল। ছিল ভেটকি মাছ, টমেটো আর ধনেপাতা দিয়ে রান্না একটা বিচিত্র পদ। তন্দুরী রুটিটা হয়েছিল টাটকা পাউরুটির চেয়ে নরম। সবই দারুণ। তবু পোড়ানো মাংসের ফরাসী আইটেমটা। আজও হেমাঙ্গকে লোভাতুর করে রেখেছে। সঙ্গে ছিল রশ্মির চমৎকার দন্তপঙক্তি আর আধ খোলা ঠোঁটের হাসিটিও।
