শোনো অপু, আমি কিন্তু কোনওদিন ভয়টয় পাইনি। তোমাকে উদ্ধার করেছিলাম পুলিশের গুলির মুখে দাঁড়িয়ে। মনে আছে?
ওগো, ওসব কথা ভুলে যাও। বুবকা আমার একটা মাত্র ছেলে।
বুবকা আমারও একটা মাত্র ছেলে।
তাও ওকথা বলছ?
মণীশ শান্ত গলায় বলে, ভয় পেও না অপু। পুলিশের এক বড় কর্তা আমার বিশেষ বন্ধু। তাকে আজই একবার লালবাজারে ফোন করব। আমি যখন ফ্রিল্যান্স ফটো জার্নালিস্ট ছিলাম তখন থেকে বন্ধু।
কে বলো তো!
বিনয় মিত্র। তুমি চিনবে না। নর্থ বেঙ্গলের ছেলে। স্পোর্টসম্যান ছিল। সে অ্যাকসন ভালবাসে।
উঃ, তোমাকে নিয়ে আর পারি না। পুলিশ কি আজকাল কিছু করতে পারে? অর্গানাইজড ক্রাইমের কথা তো তুমিই বললে। যারা অর্গানাইজড তারা কি পুলিশকে ভয় পায়? পুলিশ তো তাদেরই লোক হয়ে যায়।
এ লোকটা পারচেজেবল নয়। অন্তত তিনচার বছর আগেও ছিল না।
দোহাই তোমার, এর মধ্যে পুলিশকে টেনে এনে না। তাহলে ভিমরুলের চাকে ঢিল মারা হবে।
মণীশ একটু হাসল। বলল, মন্দ বলোনি। আমার চেয়ে তোমার প্র্যাকটিক্যাল বুদ্ধি বরাবর বেশি ছিল। আচ্ছা, বুবকাকে আমি একটু সাবধান করে দেবোখন।
এখনই দাও। আমি ওকে ডাকছি।
আচ্ছা বাবা, আচ্ছা।
বুবকা এল। ঘুম-চোখে বাবার কাছটিতে এসে দাঁড়িয়ে অনেকটা শিশুর মতোই বলল, কি বাবা?
বোস। কী হয়েছে, ব্ৰিফলি বলতো!
ইস্কুলের ব্যাপারটা? নাথিং মাচ।
মারপিট করেছিস?
একটা লোককে হকি স্টিক দিয়ে মেরেছি।
খুব জোরে মেরেছিস?
খুব জোরে। লোকটা খোঁড়াচ্ছিল।
আমি হলে মাথায় মারতাম। অজ্ঞান করে দিতাম।
আমি এই প্রথম একজনকে মারলাম। বাবা, অ্যান্ড আই এনজয়েড ইট।
আই নো। কিন্তু একটা কথা।
কী কথা বাবা?
মারপিট একবার শুরু হলে সহজে থামে না। আজ মেরেছে, কাল কিন্তু মার খেতে হবে। আর ইউ রেডি ফর দ্যাট?
হ্যাঁ বাবা। আমরা এখন স্কুলের চারদিকে নজর রাখি। দল বেঁধে বেরোই।
কখনও একা বেরোবে না।
কিন্তু টিউটোরিয়াল থাকলে? তখন তো সব বন্ধুকে পাওয়া যাবে না।
তাহলে প্রবলেম।
আমি কিন্তু ভয় পাই না। মা ভয় পায়।
ভয় পাওয়া ভাল নয়। তবে বিচক্ষণ হওয়া ভাল। স্কুলের অথরিটি কী করছে?
কি করবে? তারাতো আর মারপিট হলে ঠেকাতে পারবে না।
তুই আমাকে ভাবিয়ে তুললি। মুশকিল কি জানিস, এ দেশে বাস করে কয়েক কোটি ভেড়া আর কয়েকটা বাঘ। এক লক্ষ ভেড়াও একটা বাঘ দেখলে পালায়। তোকে রাস্তায় যদি গুণ্ডারা মারে রাস্তার অন্য লোকেরা মুখ ফিরিয়ে পালাবে।
বুবকা হাসল, আমি কিন্তু ভেড়া নাই।
সেটা বুঝতে পারছি। কিন্তু তুই ভেড়ুয়া হলেই তোর মা বেশি নিশ্চিন্তে থাকতে পারত।
অপর্ণা চোখ বড় বড় করে দুজনের কথোপকথন শুনছিল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আচ্ছা, তুমি কী গো? কোথায় তোমাকে বললাম ওকে একটু বুঝিয়ে বলতে যাতে বিপদের মধ্যে না যায়, আর ভূমি ওকে গুগুমি করতেই উৎসাহ দিচ্ছো?
মণীশ অপর্ণার দিকে ঠাণ্ডা চোখে চেয়ে বলল, দুনিয়াটা তো ওরও। বিপদ-আপদের মধ্যেই ওকে বেঁচে থাকতে হবে। আমরা যেমন করে শেখাবো সেরকম শিখলে ওর হয়তো চলবে না। দুনিয়াটা পাল্টে যাচ্ছে অপু।
দুনিয়ার অনেক কিছু পাল্টায়, কিন্তু অনেক কিছু আবার কোনওদিনই পাল্টায় না। সেটা হল মা আর ছেলের সম্পর্ক। বুঝলে? আরও একটা জিনিস পাল্টায় না, সেটা হল গুয়োমি করাটা যে খারাপ সেই বোধটা।
মণীশ ঘাড় ঝাঁকিয়ে বলে, ঠিক আছে বুবকাবাবু, আপনি আর মারপিটের মধ্যে যাবেন না। লক্ষ্মী ছেলে হয়ে থাকবেন।
বুবকা শিশুর মতো মুখ করে মায়ের দিকে চেয়ে বলে, মা তুমি তো দেখনি যখন গুণ্ডারা আপাকে মারছিল। যদি দেখতে তাহলে তুমিও হকি স্টিক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে। আপা একটা রোগা ভাল মেয়ে, তাকে ওরকম মারতে পারে কোনও মানুষ? আর কী সব খারাপ গালাগাল করছিল!
অপর্ণা আদর মাখানো গলায় বলে, আচ্ছা, তুই বল তো, আমি কি গুণ্ডাদের সাপোর্ট করছি? আপাকে মারা তো খুবই খারাপ হয়েছে। কিন্তু তোরা ওদের সঙ্গে কিছুতেই পেরে উঠবি না। ওরা খুনে।
বুবকা ফের তার সরল মুখখানা তুলে বলল, মা, ব্যাপারটা আরও খারাপ। ওরা শুধু গুণ্ডা নয়, ওরা ছেলেদের ড্রাগ ধরিয়ে দিচ্ছে। আমাদের স্কুলের কত ছেলে ড্রাগ নিচ্ছে জানো? ওদের কি নন-ভায়োলেন্স দিয়ে ঠেকানো যায়?
অপর্ণা ঝাঁঝালো গলায় বলে, তার জন্য পুলিশ আছে। তোমাদের কী দরকার আইন হাতে নেওয়ার?
আমরা জাস্ট রেজিস্ট করছি। এটা আমাদের প্রোটেস্ট। পুলিশ যতক্ষণ না অ্যাকশন নিচ্ছে ততক্ষণ তো নিজেদের প্রোটেক্ট করতে হবে।
পুলিশ কি অ্যাকশন নেয়নি?
নিয়েছে। পরশু থেকে দেখছি, পুলিশ পোস্টিং হয়েছে। কয়েকজনকে আশপাশের গলি থেকে ধরে নিয়ে গেছে।
তাহলে?
তাহলে কী মা? প্রিন্সিপালকে কারা যেন ফোন করে ভয় দেখাচ্ছে, পুলিশ কেস উইথড্র করতে বলছে।
অপর্ণা কাঁদো-কাঁদো হয়ে মণীশের দিকে চেয়ে বলল, শুনলে? হুমকি দিচ্ছে। এবার ঠিক বুবকাকে মারবে।
অত সোজা নয় মা। আমাদের অনেকের গার্জিয়ানই খুব ইনফ্লুয়েনসিয়াল মানুষ। তারা অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে অ্যালার্ট করেছে। ভয় পেও না মা, ওরা কিছু করতে পারবে না।
আপা যে কেন এসব করতে যায়! বলে অপর্ণ রাগ করে মুখ ফিরিয়ে নিল।
মণীশ খাওয়া শেষ করে উঠতে উঠতে বলল, আমার যদি আপার মতো একটা মেয়ে থাকত তাহলে বুক ফুলিয়ে বেড়াতাম। আপা ইজ এ জেম।
তোমরা আমাকে শান্তিতে থাকতে দেবে না কোনোদিন।
