ওঃ, তোমার সেই কৃপণের চার কাঠা জমি?
মোটেই কৃপণের জমি নয়। সস্তায় কিনেছি বলে কি দোষ হয়েছে? একদিন দেখো ওই চার কাঠার কী দাম হয়।
তোমাকে নিয়ে আর পারি না। সব জিনিসেরই দামটাই কেন তোমার মনে আসে? এই যে শরতের দারুণ মোহময় একটা সকাল এর কি কোনও দাম হয়?
তোমার হল ফটোগ্রাফারের চোখ। তোমার মতো করে কি সব কিছু আমি দেখতে পাই?
না অপু, এই যে আলোটা, এই যে চারদিকের বাতাবরণে একটা ম্যাজিক্যাল চেঞ্জ, কোনও ফটোগ্রাফারের সাধ্য নেই তা ছবিতে ফুটিয়ে তোলে। কোনও মহৎ শিল্পীও পারে না, কবিও পারে না, কেউ পারে না। যে পারে সে ওই প্রকৃতি। তার মতো আর্টিস্ট আর কে আছে বলো!
একটা পাগলকে নিয়ে আমার ঘর। উঃ, শরৎকাল আমারও ভাল লাগে, বাপু, তা বলে তোমার মতো পাগল হয়ে যাই না।
কেন হও না অপু। কিছুতেই কেন কখনও তুমি পাগল হও না?
অপর্ণা হেসে ফেলল, বলল, বাড়িতে একটা পাগলই কি যথেষ্ট নয়? পাগল বাড়লে সংসারটা কি চলবে। তবে ভেবে না, তোমার পাগলামির অনেকটাই তোমার ছেলেমেয়েরাও পেয়েছে।
খুব ভাল অপু। সবাই মিলে তোমাকেও একটু পাগল করব এবার থেকে।
করতে হবে না। পাগল হতে আর বাকিই বা কী? শোনো, আজ অফিসে জয়েন করবে মনে রেখো, নটা পনেরোতে পুল কার চলে আসবে। তৈরি হতে থাকে। বাথরুমে ঢুকলে তো চল্লিশ মিনিট।
মণীশ হতাশায় মাথা নেড়ে বলে, নাঃ, তোমাকে পাগল করা যাবে না অপু। ইউ আর এ স্টাবোর্ন পারসন।
মণীশ বাথরুমে গেল।
অপর্ণা ধীর পায়ে মণীশের ঘর ছেড়ে ঢুকল বুকার ঘরে। ছেলেটা পাশ-বালিশ আঁকড়ে ধরে গভীর ঘুমে ঢলে আছে। মাথাটা বালিশ থেকে পড়ে গেছে নিচে। অপর্ণা ছেলের ঘুমন্ত মুখের দিকে একটু চেয়ে থাকে। ওপরের ঠোটের সীমানায় কোমল গোঁফ। গালে সামান্য দাড়ি, এখনও শেভ করতে শুরু করেনি। এবার করবে। আদরের কোলের ছেলেটা বড় হল। হোক। অপর্ণার চিন্তা অন্য জায়গায়। বোকা ছেলেটা স্কুলের বাইরে সেদিন মারপিট করে এসেছে। ড্রাগ বিক্রি করে যারা তাদের সঙ্গে। এ সব কি ভাল? আপাই বা কেন ওসব ষণ্ডাগুণ্ডাদের পিছনে লাগতে গিয়েছিল? যদি এবার তারা উল্টে মারে? যদি মেরেই ফেলে? অপর্ণার জীবনে এইসব কারণেই কোনও শান্তি নেই।
ঘটনাটা সে মণীশকে বলেনি। মণীশ আকণ্ঠ ভালবাসে ছেলেকে। শুনলে টেনশন হবে।
বুবকাকে খুব বকেছিল অপর্ণা সব শুনে। বুবা তাকে এখনও সব কথা বলে। বকুনির পর বুবকা অবোধ শিশুর মতো জিজ্ঞেস করল, তাহলে কি করা উচিত ছিল মা? আপাকে ওরা যে মারছিল! আমার কি চুপচাপ চলে আসা ভাল হত।
অপর্ণা এ প্রশ্নের সরাসরি জবাব দিতে পারেনি। শুধু বলেছিল, তোমাদের উচিত ছিল আপাকে জোর করে আটকানো, ওর এত সাহস কেন?
সাহসের জন্যই তো আপা হল আপা। আমরা কেউ আপার মতো নই কেন মা?
ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে অপর্ণা বলল, আজকাল দিন ভাল নয় বাবা, গুণ্ডারা বোমা মারে, পিস্তল চালায়, ছোরা বসিয়ে দেয়। আমি বড় ভয় পাই, তুই বরং ওই ইস্কুল ছেড়ে দে।
তুমি একদম পাগলী আছে। স্কুল ছাড়ব কেন? আমরাও পাল্টা গুণ্ডামি করব।
অপর্ণা অবাক হয়ে বলে, গুণ্ডামি করবি? ও কথা বলতে আছে?
ভেবে দেখেছি মা, গুণ্ডামি ছাড়া কিছু করার নেই। আমরা অলরেডি স্কুলে একটা প্রতিরোধ বাহিনী তৈরি করেছি।
আতঙ্কিত অপৰ্ণা বলল, না বাবা, না। তুমি ওসবের মধ্যে থেকে না। আমি আপাকেও বলব তো। ও কেন এই গণ্ডগোল পাকাল!
আপা কিছু খারাপ তো করেনি মা!
করেছে। ও তুমি বুঝবে না। ওকে আসতে বলিস তো!
বুবকা হাসল, আপা আমাদের সঙ্গে রাগ করে কথাই বলে না। ও বলছে আমরা নাকি ওর মিশনটাই নষ্ট করে দিয়েছি। আপাটা একটা ভূত।
কিছুক্ষণ বুকার শান্ত মুখখানার দিকে চেয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে এল অপৰ্ণা। অনেক কাজ। মণীশ আজ প্রথম অফিসে যাচ্ছে দীর্ঘ ছুটির পর।
মণীশ স্নান করে যখন তৈরি হয়ে এসে টেবিলে বসল তখন তাকে খাবার বেড়ে দিতে দিতে অপর্ণা হঠাৎ জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা, আপা মেয়েটাকে তোমার কেমন লাগে বলো তো!
আপা! শী ইজ এ ক্লাস বাই হারসেলফ। কেন?
এমনিই। জানো, ও নাকি ওদের স্কুলে কয়েকজন ড্রাগ অ্যাডিক্টকে ধরেছে। তাদের বাঁচাতে ড্রাগ পেডলাররা এসে আপাকে অ্যাটাক করেছিল।
মণীশ বিস্মিত মুখে বলে, সর্বনাশ! কবে?
কয়েকদিন আগে।
তারপর?
স্কুলের ছেলেরা গিয়ে পেডলারদের মেরে তাড়ায়।
দ্যাটস গুড। তাড়াল কেন? মেরে আধমরা করে পুলিশে দেওয়া উচিত ছিল। এমন কি মেরে ফেললেও ক্ষতি ছিল না। দে ডিজাৰ্ভ ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট।
ছেলেদের দলে যে বুবকাটাও ছিল।
ছিল? আই ফিল প্রাউড ফর হিম। দরকার হলে আমাকেও দলে নিতে পারে।
তুমি মারপিট করবে।
আলবাৎ। এক সময়ে আমি সেন্ট্রাল ক্যালকাটায় অলিতে গলিতে মারপিট করতাম। সিনেমা হল–এ, বাসে, ময়দানের খেলার লাইনে।
ওঃ, তাই বলো। সেইজন্যই ছেলে সেটা পেয়েছে।
কেন, তুমি কি জানোনা নাকি?
জানি। তবে মনে ছিল না।
শান্ত গৃহস্থ হয়ে গেছি সখি, কিন্তু ভিতরে এখনও আগুনটা নিবে যায়নি। খুঁচিয়ে তুললে আবার গনগনে আঁচ উঠবে।
তুমি ছেলেকে সাপোর্ট করছে?
একটু করছি। তবে আহাম্মকি বা গোয়ার্তুমি ভাল নয়। ড্রাগ পেডলাররা অর্গানাইজড ক্রিমিনালস। ওদের সঙ্গে লাগতে গেলে নিজেদেরও অর্গানাইজড হতে হবে।
শোনো, আমি বলি কি, বুকার স্কুলটা চেঞ্জ করে দাও।
কেন বলো তো! এত ভাল স্কুল।
বিপদ হতে কতক্ষণ।
