খুব বুঝি। কিন্তু তুমি আহাম্মক বলেই তোমার সব কথা মেনে চলি না। কাকার তো স্যাঙাতের অভাব নেই। সবাইকে ছেড়ে কেন আমাকেই চাকরিটা দিতে চাইছে বলো! এটাকে ভগবানের আশীর্বাদ বলে ধরে নিতে পারছে না।
চাকরিটা কাকা আমাকেই দিতে চেয়েছিল প্রথমে। আমি রাজী হইনি বলে তোমার কথা তুলল।
ওই একই কথা।
কাকার ধারণা, আমি ধৰ্মভীরু লোক, টাকা এদিক ওদিক করব না।
আমিই কি তা করব?
তা বলিনি। আমি বলছি কাজটার বিপদ আছে, লোভ আছে, বিশ্বাস-অবিশ্বাস আছে।
থাকুক। বিপদের কাজগুলোও তো মানুষকেই করতে হয়, নাকি?
তা হয়। বলে নিমাই চুপ মেরে গেল।
দিন সাতেক বাদে এক সকালে নিমাই রামপ্রসাদের দোকানে বসে ছিল। দুনিয়াটা খুব অদ্ভুত। কত কী ঘটে যায়, কিন্তু জলে দাগ কাটার মতো মিলিয়েও যায়। রামপ্রসাদ একটু রোগা হয়েছে হয়তো, কিন্তু আর সবই ঠিক আছে। তাকে দেখে হাতজোড় করে বলল, রাম রাম নিমাইবাবু। বসুন।
মুখবাঁধা একটা ডালের বস্তার ওপর বসে পড়ল নিমাই। তেমনি ছায়া-ছায়া দোকানখানা, ভারি নিরিবিলি, তেমনই সব গন্ধের মিশেল দেওয়া বাতাস। নিমাই একখানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, কেমন আছেন রামপ্রসাদদাদা?
ছিনেটা চলে গিয়ে মনটা ভাল নেই দাদা। কাজ কারবারে মন ভি লাগে না।
সে তো ঠিক কথা। সময় লাগে। সময়ে সব ঠিক হয়ে যায়।
ওই শালা কাকা এক নম্বর বদমাশ লোক। কত ছেলেছোকরার সর্বনাশ করল। এখুন পাপা সিং যদি ওর কলিজাটা উপরে লেয় তো আমি খুশি হই।
নিমাই জানে বাজারে কাকার তত সুনাম নেই। সে মৃদুস্বরে বলে, পাপের ঠিকানা পাপই নিয়ে নেবে। আপনি আমি তো পেরে উঠব না।
ওটা ঠিক কথা। কিন্তু পাপা সিং কাকাকে ভি লিবে। দেখবেন।
নিমাই বসে বসে খানিকক্ষণ ভাবল। বীণাপাণি কাকার চাকরি এখনও শুরু করেনি। তবে এইবার করবে। কথা পাকা হয়ে গেছে। কাকা অবশ্য তাকে বলেছে, কাজটা তুমি নিলেই আমি বেশী খুশি হতাম নিমাই।
একটা লোক দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকাল। তারপর রামপ্রসাদকে একটা ঠিকানা জিজ্ঞেস করল। নামটা শুনেই নিমাই একটু সচকিত হল। লোকটা তারই নাম বলছে যে!
নিমাই বস্তা থেকে নেমে এসে একটু আগু হতেই চিনতে পারল। মন্ত কুটুম। বীণাপানির সেজদা রামজীবন।
আরে দাদা যে!
রামজীবন নিশ্চিন্তির শ্বাস ফেলে বলে, বাঁচা গেল। ভাবছিলাম কত না জানি খুঁজতে হবে।
চলুন, বাড়ি চলুন। রিকশা ডাকি।
বাড়ি আসতেই রামজীবনকে দেখে একদফা কেঁদে ভাসাল বীণা। এতদিনে মনে পড়ল আমাকে? আমি যে বেঁচে আছি তা জানিস তোরা?
রামজীবন যখন মদ খায় তখন একরকম, কিন্তু যখন খায় না তখন তার মতো ভালমানুষ নেই। বীণার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, কাঁদিস না! তোকে কি কেউ ভুলতে পারে? কত আদরের ছিলি। বড়দা এই কাপড় দিয়ে গেছে। দেখ খুলে।
বীণা হাত বাড়িয়ে প্যাকেটটা বুকে জড়িয়ে ধরল, বড়দা দিয়েছে?
এসেছিল হঠাৎ করে। সকলকে অনেক দিয়ে-থুয়ে গেল।
শাড়িটা খুলে মুখখানা আলো হয়ে গেল বীণাপাণি।
০৩৪. প্রিয় ঋতু
স্কুলে এবং কলেজে বরাবর পরীক্ষায় সে একটা রচনার জন্য অপেক্ষা করেছে। তোমার প্রিয় ঋতু। রচনাটা কোনওকালেই আসেনি, এলে মণীশ যা লিখত তাতে নম্বর পাওয়া যেত কিনা তা সে জানে না, তবে একটা পুরো খাতা বোধ হয় শেষ করে ফেলত রচনা দিয়েই। শরত্যাল তাকে পাগল করে দেয়, যৌবন ফিরিয়ে আনে, শৈশব এসে হাত ধরে। লোকে বসন্তের গুণগান যে কেন করে তা বুঝে উঠতে পারে না সে। কালিদাসও করেছিল। আচ্ছা ছানিপড়া চোখ বাবা, এমন শরৎ ঋতুর কাছে কি বসন্ত লাগে। বসন্তের বিরুদ্ধে তার কোনও নালিশ নেই। কিন্তু শরৎ সবার উর্ধ্বে। চির শরতের কোনও দেশ থাকলে মণীশ সেখানকার সিটিজেনশীপ নিয়ে ফেলত।
আজ যখন তার দুই মেয়ে আর এক ছেলের মা অপর্ণা সকালবেলায় জানালা খুলে দিল তখন ঘুমচোখ বুজে থেকেই সে অনুভব করতে পারল শরৎ ঋতুকে।
অপু!
বলো।
আমি যেন শরৎ ঋতুতে মরি।
মা গো! সকালে উঠেই মরণের কথা মুখে এল? তুমি কী গো?
মণীশ উঠে জানালার কাছে এসে দাঁড়াল। ডাকল, অপু, আমার কাছে এসো, এখানে দাঁড়াও।
অপর্ণা বিছানাটা দ্রুত হাতে পাট করছিল। বলল, আসছি।
এক্ষুনি।
অপর্ণা এল। পাশ ঘেঁষে সঁড়াল, কী গো?
এই শরৎকালকে কেমন লাগে বলো তো তোমার?
আহা, কেমন আবার লাগবে। আমি কি তোমার মতো ভাবের মানুষ? ঋতু কোথা দিয়ে চলে যায় টেরই পাই না।
বেশ বেরসিক আছে কিন্তু। পৃথিবীটাকে কেন অনুভব করো না বলে তো?
আমাকে অনুভব করার মতো অবস্থায় রেখেছে কিনা! যা খেলা দেখালে কয়েকদিন। ভয়ে আধমরা হয়ে ছিলাম।
তুমি এখনও শকটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি, না? কেন অপু? বিপদ-আপদ তো আসতেই পারে।
তুমি তো জানোনা, তুমি কতখানি জুড়ে আছে আমার ভিতরটা। আমাদের তুমি ছাড়া আর কী আছে বলো।
মণীশ হাসল, বলল, এটাতো ভালবাসার কথাই অপু। কিন্তু একটু স্বার্থপরতার গন্ধ আছে, তোমার জগতে মোট চারজন লোক। আমি, বুকা, ঝুমকি আর অনু। তার বাইরে আর কেউ নেই, না?
একটু গম্ভীর হতে গিয়েও অপর্ণা হাসল, এই বুঝি আমাকে চিনেছো? তুমি কি ভাবো আমি আর কারও জন্য চিন্তা। করি না।
করো। তাহলে তোমার ভালবাসার একটু কণা আজ এই শরৎ ঋতুকে দাও। কলকাতায় প্রকৃতি নেই, তবু দেখ, রোদে কী এক অদ্ভুত সোনার মতো রং। আকাশ কী রকম অলৌকিক নীল।
অপৰ্ণা মুখ তুলে দীর্ঘকায় মণীশের দিকে চেয়ে বলে, প্রকৃতি দেখতে চাও? তাহলে চলল রবিবার আমাদের জমিটা দেখে আসি। কত গাছপালা আপনা থেকেই হয়েছে। আমার লাগানো গাছগুলো কুটিপাটি হচ্ছে ফুলে। চুরি হয়ে হয়েও রাশি রাশি শিউলি ফুল ছড়িয়ে থাকে ঘাসে।
