মেলা টাকা নাকি?
তা একটু বেশী তো বটেই।
আমার তো ভাঙা ঘর। চোরের লাথিতে বেড়া ভেঙে পড়বে।
টাকা আমার সিন্দুকে থাকবে। হিসেব রাখাটাই ওর কাজ।
বলবখন।
কাকাকে বাড়ি অবধি এগিয়ে দিয়ে একা যখন আঁধার পথে বাড়ি ফিরছিল নিমাই তখনই ঠিক করেছিল, বীণাকে প্রস্তাবটা দিয়ে দরকার নেই। বীণার সব ভাল, কিন্তু দুর্বচিত্ত। লোভ সামলাতে পারবে না।
বীণা সম্পর্কে কথাটা হঠাৎ কেন মনে হল, তা ঠিকঠাক বলতে পারবে না নিমাই। বীণাকে সে কখনও সেরকম কিছু করতে দেখেনি। তবু কথাটা মনে হল। সে প্রস্তাবটা বীণাকে না দিলেও কিছু নয়। কাকা হয়তো কালই বীণাকে নিজে থেকেই চাকরির প্রস্তাব দেবে। তখন?
বাড়ি ফিরে রাতে শোওয়ার সময় সে বলেই ফেলল, কাকা তোমাকে একটা কাজের কথা বলতে পারে। কাজটা নিও না।
কী কাজ?
যে কাজটা দিলীপ করত।
বলো কী! আমাকে কাকার অত বিশ্বাস হবে?
নিমাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, কাজটা আমাকে দিতে চেয়েছিল। আমি রাজী হইনি। ও কাজ ভাল নয়।
কত মাইনে দেবে।
নিমাই নিস্তেজ গলায় বলে, তুমি কাজটা নেবে বলে ভাবছো নাকি?
তবে কি হাত-পা কোলে করে বসে থাকব? পুজোয় মোটে তিনটে না চারটে বায়না হয়েছে। অপেরার অবস্থা তো ভাল নয়। পেট চলবে কি করে?
তা বটে।
মাইনের কথা কিছু বলেনি?
বলেছে। হাজার টাকা।
ও বাবা! তা হলে তো চমক্কার প্রস্তাব। হ্যাঁ গো, এতেও তোমার গোমড়া মুখে হাসি ফুটছে না?
বড় ভয় পাই যে।
তুমি ধৰ্মভীবু মানুষ, বেশ কথা। কিন্তু ভেবে দেখ তো, আমি কি স্বাগলিং করতে যাচ্ছি? আমি তো শুধু হিসেব রাখব। টাকা পয়সা শুনে-গেঁথে তুলে রাখা এ তো আর কোনও পাপের কাজ নয়!
ও কথাটা ঠিক হল না। যত সাদামাটা ভাবা যাচ্ছে ততটা সাদামাটা নয়। এতে করে তুমি কাকার আগলিং-এর দলের লোক হয়ে যাচ্ছে। ওদের সঙ্গেই ওঠাবসা করতে হবে।
তা তত এমনিতেও হয়। কাকার দলের গুণ্ডারা কি আর ঘোমটা দিয়ে থাকে নাকি? পাগলু, বিশ্বনাথ, চারু ওরা তো আগলিং করে আবার যাত্রা করে।
তবু একটু ভেবে দেখো। ঠাণ্ডা মাথায় ভাবো।
শোনো গো যুধিষ্ঠির, আমাদের টাকার দরকার। টাকার গায়ে পাপ-পুণ্য ছাপ মারা থাকে না। আর যদি পাপ হয় তো আমার হবে, তোমার তো হবে না! তুমি আমার শালগ্রাম শিলাটি হয়ে থেকো। উঃ, হাজার টাকা মাইনে, গুনেই আমার গায়ের রোয়া দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।
লোভে পড়লে বীণাপাণি! একটু ভাবো।
অনেক ভেবেছি। ডেবে ভেবে মাথা ঝাঁঝরা হয়ে গেল।
পাপ ছাড়াও কথা আছে। সেটা হল বিপদ-আপদ। পাপা সিং কাকার পিছনে লেগেছে দেখছো তো! দু-দোটো মার্ডার হয়ে গেল। এ সব মনে রেখে তবে কাজটা নেবে কিনা ঠিক কোরো।
বিপদের কথা বলছে! বিপদ তো আমাদের বন্ধু মানুষ। কবে বিপদ ছিল না আমাদের? তুমি এত ভগবান মানো আর এটা জানোনা, আমাদের ভাল মন্দ যাই হোক ভগবান ভরসা। বিপদ হলে তিনি দেখবেন। জেনেশুনে তো আর পাপ করতে যাচ্ছি না।
তা বটে। তবে পাপের কাছ ঘেঁষেই বাস করতে হবে। আমার বড় ভয় করে।
বীণাপাণি তাকে জড়িয়ে ধরে একটু আদর করে বলে, তোমাকে আমার এইজন্যই মাঝে মাঝে বড় বকতে ইচ্ছে হয়। তুমি এমনধারা কেন গো! সব সময়ে পাপের ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে, জড়োসড়ো হয়ে থাকো! আচ্ছা একটু পাপ-টাপ না করলে পুণ্যির জোরটাই বুঝবে কি করে?
কত পাপ আপসে মাপ হয়ে যাচ্ছে। পায়ের তলায় পিপড়েও তো কত মরে। মশা মারতে ইচ্ছে যায় না, তবু দেখ, চুলকোতে গেলুম, আঙুলে লেগে পুচ করে একটা রক্তে টুপটুপে মশা মরে গেল। এরকম তো কত হয়।
উঃ, তোমাকে নিয়ে আর পারি না আমি। পাপ-পাপ করতে করতে মাথাটা না খারাপ হয়ে যায়। ওগো, সেই কিসে যেন আছে না, একবার কৃষ্ণনামে যত পাপ হরে, মানুষের সাধ্য নাই তত পাপ করে।
আছে। বোধহয় চৈতন্যচরিতামৃতে।
তাহলে? তুমি তো সারাদিনে কতবার হরির নাম করো, কৃষ্ণের নাম করো। তোমার কি আর পাপ থাকে? তুমি হলে গঙ্গাজল। যতই ময়লা ফেল গঙ্গাকে কি অপবিত্র করতে পারবে?
ও শুনলেও পাপ হয়। আমাকে সবাই সাধু ভাবে কেন বুঝি না! অত সাধু তো আমি নই।
নিমাইয়ের নাকটা আদর করে টিপে ধরে বীণাপাণি বলে, সাধু না, তুমি হলে একটি বিচ্ছ। তবে বিষ নেই।
তা বটে।
আমি যখন পাপ করব তখন তুমি কৃষ্ণনাম কোরো। তাহলে আমার পাপও কেটে যাবে। সাধুর বউয়ের পাপ হয় না।
নিমাই অন্ধকারে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
বীণাপাণি বলল, ও কি? অত বড় দীর্ঘশ্বাসটা ফেললে কেন শুনি? কী এমন খারাপ কথাটা বললাম?
চাকরিটা কি সত্যিই নেবে বীণাপাণি।
তুমি ওরকম কোরো না তো। হাজারটা টাকা মাসে মাসে যদি হাতে আসে তাহলে কত কী করা যাবে! এবার তোমার দোকানটার কথাও ভাবতে হবে। একদিন যদি দোকানটা দাঁড়ায় তাহলে সব ছেড়েছুঁড়ে দেবো, দেখো।
কথাটা শুনতে সুন্দর, কিন্তু সত্য নয়। নিমাই জানে, বীণাপাণি ঘর গোরস্থালির মধ্যে নিজেকে আর আঁটিয়ে নিতে পারবে না। তা সেও সইবে নিমাইয়ের। কিন্তু কাকা যে চাকরির কথা বলছে তা যে বড় যন্ত্রণা দিচ্ছে তাকে।
নিমাই খুব মৃদুস্বরে বলে, কি জানো বীণাপাণি, বেকার লোকদের কোনও মতামত থাকে না। সে হল খাঁচায় পোষা পাখি। যে দানাপানি দেয়, সে যা শেখাবে তাই বলতে হবে।
বীণাপাণি একটু চুপ করে থেকে ঝাঁঝালো গলায় বলে ওঠে, বলতে পারলে তুমি কথাটা? মুখে এল? তোমার জন্য এত করার পরও এই তার প্রতিদান?
নিমাই খুব করুণ গলায় বলে, রাগ কোরো না বীণাপাণি। তোমার রাগকে আমি বড় ভয় পাই। আমার অবস্থাটা কি তুমি বোঝে না?
