লোকজন সব গত হওয়ার পর কাকা আর সে রাত দশটা নাগাদ একসঙ্গে খানিকদূর এল। আর কেউ ছিল না। সঙ্গে। কাকা হঠাৎ বলল, দলটা তুলে দিয়ে এবার বোধ হয় কলকাতাতেই সটকাতে হবে।
কাকার দুটো দল। একটা ষণ্ডা গুণ্ডাদের। আর একটা নটনটীদের। কোনটার কথা বলছে তা অবশ্য বুঝতে পারল না। নিমাই। কলকাতায় সর্টকালে দুটো দলই উঠে যাবে। সে চুপ করে রইল।
কাকা বলল, শুধু নাটক আর পালা নিয়ে থাকব বলেই এখানে আসা। আর যত পাপতাপ সবই এর জন্য। কথাটা তুমি ভাল বুঝবে বলেই বলা।
নিমাই বলল, বুঝেছি।
একটা ভুল থেকে কত ফেঁসো বেরোলো দেখ। পগাকে খুন করাটাই মস্ত ভুল হয়েছে। তার পর থেকেই অশান্তি।
আপনার সময়টা খারাপ যাচ্ছে।
সময় ভাল আর পড়ল কবে? বরাবরই খারাপ।
নিমাই সন্তৰ্পণে বলল, পুলিশ কিছু করবে না?
পুলিশ! বলে কাকা একটু চুপ করে থেকে বলল, ওইজন্যই তো বলি, তুমি বড্ড ভোলমানুষ। কোন রাজ্যে থাকো? পুলিশকে তো আমি এ বেলা কিনি তো ওরা ওবেলা কেনে। এ দেশে থানা পুলিশ নিলাম হয়, বুঝলে? যার দর যত বেশী ওঠে, পুলিশ গিয়ে তার কাছে স্বয়ংবরা হয়।
নিমাইকে যতটা বোকা ভাবে লোকে, সে ততটা নয়। পুলিশ সম্পর্কেও নিমাইয়ের কিছু জানা আছে। কথাটা এমনি বলার জন্যই বলে ফেলেছিল। এবার বলল, আপনি তাহলে কীই বা করতে পারেন!
বনগাঁ সেই আগের মতো তো আর নেই! পাল্টেছে। পাপা সিং টাকা ঢালছে। ছেলেছোকদের ভিড়িয়ে নিচ্ছে দলে। খুটা যা দেখলে তার চেয়েও খারাপ জিনিস আছে। এরপর দলের ছেলেরা গবে। তখন আরও বিপদ।
আপনি আর কিছু করতে পারেন না, না?
দুনিয়াতে আমি একটা জিনিসই পারি। তা হল যাত্ৰা-থিয়েটার আর অভিনয়। ওটাই আমার কাজ। আর যা করি তার খানিকটা পেটের দায়ে, খানিকটা যাত্ৰাদলের স্বার্থে।
এসব নিমাইয়ের শোনা। সে একখানা ভাওয়াইয়া গান শুনেছিল, ফালে পড়িয়া বগা কান্দে রে। কাকার অবস্থা এখন তাই। এ লোকটার জন্য মায়া হয় তার।
একখানা তত্ত্বকথা বলব কাকা।
বলো না! তোমার কথা আমার ভালই লাগে।
মনে রাখতে হয়, দুনিয়ার সবটুকুই আমার নয়, অন্যেরও ভাগ আছে। তেমনটাই ধরে নিন না।
ওটা কেমন কথা হল!
সোজা কথাই। এই যেমন আপনি আছেন, তেমনি পাপা সিংও আছে। সবাই ভাল হোক মন্দ হোক কিছু করে বাঁচবে। তাই না? তা ধরে নিন, সব লড়াইতে কিছু হার কিছু জিত আছেই। এক এক সময়ে হারটাকেও জিত বলে ধরতে হয়। নইলে কঠিন হবে।
কথাটা বড্ড ধোঁয়াটে হয়ে গেল।
আজ্ঞে, আমি কথাগুলোকে তেমন গুছিয়ে বলতে পারি না। ওইটেই আমার দোষ। থাক, ভেবেচিন্তে পরে একসময়ে বলবখন।
তা বোলো। তোমাকে বুদ্ধি পরামর্শ দিতে বলি না। সে সব বিষয়বুদ্ধি তোমার ঘটে নেই, জানি। তবে তোমার লাইনের কথাই যদি বলে যাও আমার খারাপ লাগবে না।
তা জানি। আপনিও ভাল লোক। কিছুদিন গা-ঢাকা দিলে হয় না!
হয়। সেইজন্যই কলকাতায় যাওয়ার কথা ভাবছি।
সেটা ভাল বিবেচনা করলে যাবেন।
আমাকে চিৎপুরের দল সবসময়েই ডাকে। মোটা মাইনে, খাতির-যত্ন সব পাই। কিন্তু তাতে আর মন লাগে না। আমি হলাম একটা যাত্ৰাদলের মালিক, এর স্বাদই আলাদা।
আজ্ঞে।
দিলীপের বিয়ে হল এই সেদিন। আমার ভরসায় বিয়ে করেছিল। সে ঠাণ্ডা লোক। নিজে কোনও বিপদের কাজে যেতে সাহস পেত না। তবে বিশ্বাসী ছিল খুব। দু পাঁচ লাখ টাকা ফেলে দিয়েও নিশ্চিন্ত। দিলীপ গিয়ে আমার অনেক ক্ষতি হল। একটা কাজ করতে চাও?
কী বলুন না!
তুমি তো ধাৰ্মিক মানুষ।
নিমাই লজ্জা পেয়ে বলে, কী যে বলেন আজ্ঞে। ধর্মটা করতে দেখলেন কখন!
দেখতে হয় না। মুখ দেখেই বোঝা যায়।
কাজটা কী?
দিলীপের কাজটা করবে?
বাপ রে!
ভয় পেলে নাকি?
ওটা পেরে উঠব না।
হাজার টাকা মাইনে পাবে। কাজ শুধু হিসেব রাখা আর বখরাটা গুনে ভাগ করে দেওয়া।
ওটি পারব না। মাপ করতে হচ্ছে।
পাপের টাকা বলে আপত্তি হচ্ছে তো! নিমাইচাঁদ, পাপের টাকাটাতেই জগৎসংসার চলছে।
নিমাই ভারি সংকুচিত হয়ে পড়ল। কথাটা বড় বাটি। কলিযুগে পাপের টাকার ছোঁয়াচ বাঁচানো শক্ত। ও শালা কলেরার মতো সবাইকে ধরে ফেলে। সে একটু সংকোচের সঙ্গে বলে, কথাটা কি জানেন। আমার ইচ্ছে হয় একটু আলগোছ হয়ে থাকি। সব কাজে মনটা সায় দেয় না। নইলে আমিই কি একটা খুব সাধু? আপনারা আমাকে ভাল দেখেন সে আপনাদের গুণ। আমার নয়।
বুঝেছি। তুমি ভাল।
নিমাই সবেগে মাথা নেড়ে বলে, ভাল কথাটা বলবেন না। বরং বলুন বোকা। আমি বোকা লোক। আজকাল ভাল হতে চাইলেই বোকা। বউয়ের পয়সায় খাই, বনের মোষ তাড়াই। মাঝে মধ্যে আবার ভাবি, বউ পয়সা পাচ্ছে কোত্থেকে? না যাত্রা থেকে। তা যাত্রায় পয়সা আসছে কোত্থেকে? না আগলিং থেকে। তাহলে হরেন্দরে কাশ্যপ গোত্রই দাঁড়ায়। ও যদি পাপ হয়, তবে আমিও পাপের পয়সাতেই প্রতিপালন হচ্ছি। তাই না?
অন্ধকারে ভাল বোঝা গেল না, তবে কাকা বোধ হয় একটু হাসল। বলল, এই হচ্ছে তোমার লাইনের কথা। কাজের নয়, তবে শুনতে ভাল।
আজ্ঞে।
একটা কথা বলি নিমাই।
বলুন না!
তুমি না করো, কাজটা বীণা করুক। ওর হিসেব নিকেশের মাথা আছে। তোমার আপত্তি নেই তো?
বীণা কি আমার কথামতো চলে নাকি? তার ইচ্ছে হলে করবে।
তুমি একবার বলে দেখো।
আজ্ঞে বললেই রাজী হবে। তার অত শুচিবায়ু নেই।
ওকে আমার বেশ বিশ্বাস হয়। তেমন কিছু করতে হবে না। টাকাটা হেফাজতে রাখবে। প্রয়োজনমতো দেবে একে ওকে। যেমন আমি বলব।
