দুজনেই কাকার লোক। ছিনের বয়স উনিশ-কুড়ি। ডাকাবুকো। বেশী মস্তানি করত। দিলীপের বয়স চৌত্রিশপয়ত্রিশ। ঠাণ্ডা মাথার মানুষ। কাকার টাকা পয়সার হিসেব রাখত। যেখানে খুন হল, তার একটু দূরেই তার বাড়ি। বাড়িতে বউ আর একটা বাচ্চা।
দুটো লাশই ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে দেখে এল নিমাই। এরা সব কাকার স্মাগলিং-এর লোক। যাত্ৰাদলের নয়। পাপা সিং-ই করাচ্ছে, সবাই জানে। পাপা সিং-এর একটা লোক খুন হয়েছিল, তার বদলে দুটো লাশ নামিয়ে দিল। কিন্তু এতেও শোধবোধ হল। কিনা সেটাই বোঝা যাচ্ছে না।
নিমাই ভাবিত হয়ে পড়ল। তার চোখের সামনে সর্বদা দু-দুটো লাশের দৃশ্য ভাসে। খাওয়ায় বড় অরুচি হল। ঘুমটাও হতে চায় না। ছিনের লাশটা তাকে বেশী ঘাবড়ে দেয়। ছেলেটার গলা, পেট, বুক সব ফাঁক। আলো হাওয়া ঢুকে পড়ছে শরীরের ফুটো দিয়ে।
এ সব বুঝে উঠতে নিমাইয়ের ভারি কষ্ট হয়। মারকটি ব্যাপারটাই তার বুঝ-সমঝে আসতে চায় না। ঝগড়া-কাজিয়া, দু চার ঘা চড়-চাপড় অবধি ঠিক আছে। গালাগাল দাও, তাও না হয় সওয়া গেল। কিন্তু খুন জিনিসটা তার বোধ বুদ্ধির চৌহদিতে আসে না।
ছিনের বাবার একখানা ছোট দোকান আছে। বাজারের পিছন দিকটায়। ভাঙা কুঁড়ো ডাল, সস্তা চাল, খোল ভুসি, চিটে গুড়, নারকোলের দড়ি, তামাক, কিছু দশকর্মের জিনিস। এইসব নিয়ে দোকান। গরিবগুর্বে সব খদের তার। বিহারের লোক। নামটি রামপ্রসাদ। মাথায় একটু টাক আছে, রোগা পাকানো চেহারা। রামুর দোকানে মাঝে মাঝে গিয়ে বসে নিমাই। রামু বেশ খাতিরও করে তাকে। বসায়, নানারকম কথা হয় দুজনে। বাড়ি থেকে ঠেকুয়া বা ছাতুর লাড়ড়ু এনে খাওয়ায় ছটু পরবে বা জন্মাষ্টমীতে। ভুট্টার খই খাইয়েছিল একদিন। কিন্তু আসল কথা হল, রামু লোকটা ভাল। নিমাইয়ের গান শুনে ভারি খুশি হয়, ভাবে বিভোর হয়ে যায়। বাঙালী না হলেও বাংলা ভালই জানে। ছিনে তার দ্বিতীয় পক্ষের ছেলে। মাঝে মাঝে বলে, আমার এই তিন নম্বর ছেলেটাই হারামি। ভক্ত গোছের, সরলসোজা রামুর সঙ্গে ইদানীং বড় ভোব হচ্ছিল নিমাইয়ের। বড় দুই ছেলের একজন দেশে, ক্ষতি গেরহী দেখে, আর একজন তিনটে মোষ নিয়ে দুধের কারবার ফেদেছে এখানেই। এক বউ দেশে, আর একজন। এখানে। ছিনেকে স্বভাবের জন্য কয়েকবার বাড়ি থেকে তাড়িয়েছে রামু। ইদানীং ছিনে আর বাড়ি আসছিল না। পয়সা হচ্ছিল, তালেবর হচ্ছিল। একটু-আধটু নেশাভাঙও শুরু করেছিল বোধ হয়। রামু দুশ্চিন্তা করত।
যা যুগটা পড়েছে, ছেলে।পুলে হয়ে কোনও সুখ নেই। কোনটা পড়ল, কোনটা মরল, কোনটা গোল্লায় গেল এই নিয়ে সারাক্ষণ বুকের মধ্যে ড়ুগড়ুগি বাজে। তবু রামুর একটরে দোকানটায় গিয়ে বসলে ছায়া-ছায়া অন্ধকার কাঁচা ঘরে নানা গন্ধের মিশেল দেওয়া বাতাস শ্বাসে টেনে একটা আরাম বোধ করে নিমাই। সব জায়গা সমান নয়। এক এক জায়গা যেন অন্যরকম। মনটা যেন বেশ স্থির, ভাল হয়।
ছিনের জন্য বড় কেঁদোছে রামু। বড্ড কেন্দেছে। সেটা না হয় বোঝা গেল, বাপ হয়ে ছেলের জন্য কাঁদবে না তো কী! কিন্তু নিমাইয়ের নিজের ঘরেও কান্নার একটা ঢেউ উঠেছে। বীণাপাণি দুটো খবরেই কেঁদে ভাসাল। নিমাই যতদূর জানে, জুলু ঢুলীগের সঙ্গে বীণার তেমন ভাবসাব থাকার কথাই নয়। মেয়ের এমনিতেই একটু কাব্দে। কিন্তু সেটা একটুই। এতটা নয়।
দিলীপের খুন হওয়ার দিনটায় নিমাই বলে ফেলল, অত কাঁদছো কেন বলো তো! দিলীপের সঙ্গে মুখচেনা ছিল বই তো নয়! ছিনের বেলাতেও বড্ড কান্দলে। হঠাৎ এত কান্নায় পেল কেন তোমায়?
বীণা গম্ভীর মুখে বলে, চেনা ছিল তো!
তা থাকলেই বা!
বীণা জবাব দিতে পারল না। গুম হয়ে বসে রইল।
আর কিছু বলতে তেমন সাহস হয়নি নিমাইয়ের। ইদানীং বীণার মেজাজটা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। কিন্তু কেন হচ্ছে, তা নিমাই শত ভেবেও বের করতে পারে না। সেই যে লালনের একখানা গান আছে, সে আর লালন একখানে রয় লক্ষ যোজন ফাঁক, এ হল সেই বৃত্তান্ত। এক ঘরে বসবাস, এক বিছানায় শোয়া, মন্ত্র-পড়া বউ, তবু যেন বনগীয়ে থেকেও বীণা বিলেতের মতো দূরে। সব সময়ে নয়। এক এক সময়ে তাকে বেশ চেনা মেয়ে বলে মনে হয়। হাসি-ঠাট্টাও করে, তরল কথাটথা হয়। আদর-সোহাগও যে হয় না, তা নয়।
খুন দুটো নিমাইয়ের মাথাতেও চেপে আছে গন্ধমাদন হয়ে। তবে তার শোক নয়, ভারি দুশ্চিন্তা হয়। ভয় হয়। অস্বস্তি হয়। সে খুনের ব্যাপারটা বোঝে না। ভগবানের দেওয়া মানুষের এই শরীরখানা, এখানার ওপর ছোরাজুরি চালায় আর একজন একইরকম শরীরওয়ালা লোক-এটা ভাবতেই তার ভারি অবাক লাগে।
সে বোকা বটে, কিন্তু যতটা লোকে তাকে ভাবে, ততটা নয়। এই যে খুনখারাপি হচ্ছে এতে কাকার পায়ের তলা থেকে মাটি সরছে। এটা সে বোঝে। সে বোঝে কাকা। যদি দাঁড়িয়ে থাকতে না পারে তবে আর কারও না হোরক, তাদের কপালে কষ্ট আছে। লোকটা দিলাদরিয়া, টাকাকে খোলামকুচির সমান বিবেচনা করে। পালা যখন থাকে না তখনও দলের লোকদের দুপাঁচশো করে মাইনে দেয়। টাকাটা বড় কম লাগে না তাতে। কলকাতার পেশাদার দলের মতোই বিশ্ববিজয়কে দাঁড় করানোর ইচ্ছে তার। কিন্তু এ যা শুরু হয়েছে, কাকার অবস্থা বিশেষ ভাল ঠেকছে না নিমাইয়ের।
কথাটা কাকাও বলে ফেলল। রোববার বিকেলে। নিমাই গিয়ে বসেছিল কাকার বাজারের কাছের ঘরখানায়। ঘরে মেলা ভিড়, খুন দুটো নিয়েই নানা কথা হচ্ছিল। কাকা গুম মেরে ছিল সারাক্ষণ। বাজারে নানারকম কথা ওড়াউড়ি করছে। সবাই নানারকম বলে যাচ্ছে।
