চয়ন আবার চুপ।
জ্ঞানী মানুষটি তাঁর প্রগাঢ় গলায় বললেন, লোকে কত ভালবাসার কথা বলে, কিন্তু ভালবাসা কাকে বলে তা তার জানাই নেই। প্রেমিক প্রেমিকারা কত ভালবাসার কথাটথা বলে ঘর বাঁধে, তারপর তাদের ঝগড়ার জ্বালায় বাড়িতে কাকপক্ষী বসতে পারে না। ভালবাসার গভীরতায় যেতেই পারে না তারা। বাবা-মা ছেলেমেয়েদের কত ভালবাসে বলো তো! ভাল করে অবজার্ভ কোরো, ওই ভালবাসার মধ্যে কতখানি স্বার্থপরতার ভেজাল মিশে আছে। ভালবাসতে গিয়ে সন্তানের মনুষ্যত্বটাই পঙ্গু করে দেয়। তারা। যদি সত্যিই ছেলেকে কেউ ভালবাসে, তাহলে সেই ভালবাসার সূত্র ধরেই দুনিয়ার সব শিশুকেই সে ভালবাসতে বাধ্য।
যে আজ্ঞে।
শুধু আমাকে অন্ধভাবে সমর্থন করে যেও না। ব্যাপারটা আর একটু তলিয়ে বুঝবার চেষ্টা করো। ধরো, আমি আমার বাচ্চা ছেলেটাকে খুব ভালবাসি। সাধারণত আমরা সেই ভালবাসার জন্য কী করি? ছেলেকে এড়ুকেশন দিই, ক্যারিয়ার তৈরি করি, বিপদ-আপদ থেকে বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টা করি, খারাপ সংসর্গে যাতে না পড়ে নজর রাখি, তাকে অঢেল খেলনা দিই, পোশাক দিই, প্রশ্রয় আর আদর দিই, তাই না?
ঠিকই তো!
অথচ ছেলেকে রেখে যাবো এমন একটা পৃথিবীতে যেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে ড্রাগ পেডলার, খুনে, ছিনতাইকারী থেকে শুরু করে আরও নানা বিপদ। ছেলেকে যদি সত্যিই ভালবাসি তাহলে দুনিয়াটাকেই সাফসুতরো করে রেখে যেতে পারলে নিশ্চিন্তে চোখ বোজা যেত। তাই না?
যে আজ্ঞে।
ছেলের মুখের হাসি অনাবিল করে তুলতে প্রকৃত ভালবাসে যে বাপ সে অন্য ছেলেদেরও মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলবে। নইলে কেবল আমার ছেলে, আমার ছেলে বলে হেদিয়ে মরলে তো হবে না।
যে আজ্ঞে।
জ্ঞানী মানুষটি মৃদু হেসে বললেন, আমি আগে খুব কম কথা বলতাম। অনেকে আমাকে বোবা বলে ভাবত। কিন্তু আজকাল এত কথা চলে আসে, যে মাঝে মাঝে আমি লজ্জিত হয়ে পড়ি।
চয়ন মৃদুস্বরে বলল, আপনি যা বলছেন তা অতি সত্য।
ব্যাপার কী, জানো, আজকাল আমার মনে হয়, কিছু কথা বলে না গেলে এগুলো অকথিতই থেকে যাবে। আমার কথা লোকে মানুক বা না-মানুক, উচ্চারণ করাটা দরকার ছিল।
যে আজ্ঞে।
তুমি ভালবাসার কথাটা মনে রেখো। যা কিছু দেখবে, যাকে দেখবে, তাকেই ভালবাসবার চেষ্টা কোরো। ভালবাসা মানেই কিন্তু ভাল করা। তার ভালর জন্য কিছু যদি না-ই করলে, তাহলে ভালবাসা বন্ধ্যা হয়ে গেল, মিথ্যে হয়ে গেল।
চয়ন জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ মানুষটির দিকে খানিকটা উদ্বেগ, খানিকটা বিস্ময় নিয়ে চেয়েছিল। ইনি বিজ্ঞানী, ইনি। সারা দুনিয়ার বিশিষ্ট জ্ঞানীদের শ্রদ্ধার পাত্র, ইনি এসব নিয়ে ভাবেন কখন?
জ্ঞানী মানুষটি কিছু তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, চাকরির জন্য ভেবো না। কিছু একটা হয়ে যাবে। তোমার ঘুমন্ত অভ্যন্তরে কী আছে তা খুঁজে দেখো। যদি কিছু পাও, আমাকে নিঃসঙ্কোচে বোলো। নিজেকে খুব কম মানুষই বুঝতে পারে।
যে আজ্ঞে।
মানুষের একটা অনাবিষ্কৃত গুণ হঠাৎ আবিষ্কৃত হয়ে তাকে চোখের পলকে বিশ্ববিখ্যাতও করে তুলতে পারে। কিন্তু আবিষ্কার হওয়াটাই হচ্ছে প্ৰথম কথা।
যে আজ্ঞে।
যখন টাকার দরকার হবে, আমাকে বা মোহিনীর মাকে বোলো। লজ্জা করো না। আমরা বড়লোক নই, কিন্তু তোমার কাছের মানুষ।
আজ্ঞে, মনে থাকবে।
জ্ঞানী মানুষটি একটি বড় শ্বাস ফেলে উঠলেন। উনি এখন বেরোবেন।
বিদায় নিয়ে মোহিনীকে এসে পড়াতে বসল। সে।
মোহিনী চাপা গলায় বলল, কথা হল মাস্টারমশাই?
হল। মোহিনী, তোমার বাবা একজন গ্রেট ম্যান।
পিতৃগর্বে উজ্জ্বল হল মোহিনীর মুখ। সে বলল, কিসে বুঝলেন?
উনি একজন গভীর মানুষ। কত ভাবেন!
বাবাকে আমি খুব ভয় পাই। দূরের মানুষ তো! কিন্তু আমার বাবা যে ভীষণ ভাল তা আমি জানি।
ভাল বললে কিছু বলা হয় না। ভোলর চেয়েও অনেক বেশী কিছু।
চাকরির কথা কী হল?
চয়ন একটু হেসে বলে, ওঁর কথা শুনে আমার চাকরি করতেই আর ইচ্ছে হচ্ছে না।
ওমা! সে কী চয়নদা? এত বলে-কয়ে মাকে পটিয়ে বাবার সঙ্গে বসালাম যে আপনাকে!
চয়ন লজ্জার হাসি হেসে বলে, ভয় নেই। একটা চাকরি জুটিয়ে দেওয়া ওঁর পক্ষে শক্ত কাজ নয়। উনি সেটুকু করবেন। কিন্তু আমাকে উনি খুব প্রভাবিত করেছেন। আজ।
তাই বলুন! বলে মোহিনী নিশ্চিন্ত হল।
তুমি তোমার বাবাকে কতটা চেনো মোহিনী?
সত্যি কথা বলব? মোহিনী মৃদু হেসে বলে।
বলো।
বাবাকে একদম চিনি না। বাবা এত ব্যস্ত! কাজে, চিন্তায় আর দুশ্চিন্তায় যে, বাবার কাছে ঘোষতেই পারি না। কখনোসখনো একমাস দেড়মাসেও একটাও কথা হয় না।
বাবার কাছে চুপটি করে কখনও বসতে ইচ্ছে হয় না?–
মাঝে মাঝে হয়। সাহস পাই না। সবসময়ে দেখি, বাবা কী নিয়ে যেন খুব টেনশনে আছেন। রাত জেগে বসে ভাবেন, পায়চারি করেন। মাঝে মাঝে ছাদে চলে যান। কখনও চুপ করে চোখ বুজে অনেকক্ষণ স্থির বসে থাকেন।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চয়ন বলে, ওরকমই হওয়ার কথা।
বাবা আমাদের কথা ভাবেন না। ভবেন পৃথিবীর কথা, মহাকাশের কথা, ইনফিনিটির কথা।
তার মধ্যে তোমরাও আছো মোহিনী। সেই ভাবনার মধ্যে আমরা সবাই আছি।
০৩৩. ছিনের মরার কথা ছিল না
ছিনের মরার কথা ছিল না। রাতের শেষ বনগাঁ লোকাল চলে যাওয়ার পর স্টেশন চত্বরের একটু বাইরে তাকে রিকশা থেকে টেনে নামিয়ে চারটে লোক কচাকচ কেটে ফেলল। রক্তে ভাসাভাসি হয়ে গেল জায়গাটা। এটা হল মঙ্গলবারের কথা। শুক্রবার রাতে মরাল দিলীপ। বীণাপাণির বাড়ির কাছাকাছিই ক্ষেতের মধ্যে শনিবার সকালে মাঠ-যাউন্তি লোকেরা তার লাশ দেখতে পায়। তিন টুকরো হয়ে পড়ে আছে। মাথাটা আলের ওপর আলগোছে বসানো। মুখে বীভৎস একখানা ভ্যাংচানি স্থির হয়ে আছে।
