চয়ন বুঝতে না পেরে বলে, আজ্ঞে?
অনেকে চাকরি পাওয়াটাকেই সাকসেস বলে মনে করে। তুমিও কি তাই মনে করো?
চয়ন খুব অপ্রতিভ হয়ে বলল, আমি ঠিক বুঝতে পারি না। একটা চাকরি হলে আপাতত বেঁচে যাই।
সাকসেস কাকে বলে জানো?
ঠিক বুঝতে পারি না।
জ্ঞানী মানুষটি হঠাৎ যেন কেমন বিষণ্ণ আর গম্ভীর হয়ে গেলেন। বললেন, ইউনিভার্সিটির ভাল ভাল সব ছেলেও আজকাল চাকরির পরিধির বাইরে আর কিছু বুঝতে চায় না। চাকরি ছাড়াও যে সাকসেস বলে আর একটা ব্যাপার আছে, তা তারা বুঝতেই পারে না।
যে আজ্ঞে।
ধরে চাকরি হল না, খুব সামান্য আয়ে তোমার চলে, কিন্তু তোমার নৈতিক চরিত্র ভীষণ ভাল, চোর ছ্যাচোড় নেও, নেশা ভাঙি করো না, পাঁচজনের দায়ে দফায় গিয়ে বুক দিয়ে সাহায্য করো এবং সবচেয়ে বড় কথা, যদি তুমি তোমার চারপাশের লোকজনকে নিঃস্বাৰ্থভাবে ভালবাসতে পারো, সেটা কি সাকসেস নয়?
আজ্ঞে তা তো বটেই।
চাকরি করাটাও একটা কাজ। প্রয়োজনীয় কাজ। রুজি-রোজগারের জন্যই এর দরকার। কিন্তু আরও একধরনের কাজ আছে। সেটা হল ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো। এমন কিছু লোককে দরকার, যারা রুজি-রোজগারের জন্য নয়, দুনিয়ার জন্য আদাজল খেয়ে লেগে যাবে। তুমি আরণ্যকে উপন্যাসটা পড়েছো?
আজ্ঞে পড়েছিলাম।
ওতে কে যেন একটা মানুষের কথা ছিল, যে-লোকটা জঙ্গলে নতুন নতুন গাছ লাগিয়ে বেড়াত। জঙ্গলটা তার নিজের নয়, গাছ লাগালে তা থেকে কোনও লাভও হত না। তবু কেন লাগাত জানো? জঙ্গলটাকে সুন্দর দেখাবে বলে। ওইটেই হল ভালবাসা।
যে আজ্ঞে।
পারবে পৃথিবীটাকে ওরকম ভালবাসতে?
চয়ন এই জ্ঞানী মানুষটিকে কি করে বোঝাবে যে, পৃথিবীর সঙ্গে তার কোনও পরিচয়ই নেই। ভূগোলের ম্যাপ ছাড়া পৃথিবীর আর কোনও চেহারা তার জানা নেই। কলকাতার বাইরে সে কদাচিৎ গেছে। তাও বাড়ি আর টিউশনির বাড়ি, নির্দিষ্ট প্রতিদিনকার যাতায়াতের পথের বাইরে এই কলকাতা শহরকেই বা সে কতটুকু চেনে? এই বিদ্বান, ভ্রমণশীল, বহুদশী মানুষটিকে সে কী করে বলবে যে, তার পরনির্ভর পরাবলম্বী জীবনে সে কেবলই গ্ৰহীতা মাত্র, দাতা নয়। প্রতিদিনকার লাঞ্ছনা, আত্মবমাননা, নিজেকে নিয়ে হাজারো সমস্যায় জর্জরিত, তার পৃথিবীর জন্য কিছু করার সাধ্যই নেই। রাস্তার যে কোনও মানুষ, একজন ঠেলাওলা কি রিকশাওলাকেও সে হিংসে করে।
কিন্তু সে একথা বলতে পারল না। চুপ করে রইল।
মানুষটি তাঁর প্রগাঢ় কণ্ঠস্বরে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, কমপিউটার হ্যান্ডেল করতে পারো?
চয়ন সভয়ে বলল, আজ্ঞে না।
শিখে নিতে পারবে?
চয়ন দ্রুত মনে মনে হিসেব করে নিল। কমপিউটার শিখতে যে টাকা লাগে, তা কি তার টিউশনি থেকে বাঁচানো টাকায় সম্ভব? না। কোনও আশাই নেই।
দুঃখিতভাবে সে চুপ করে রইল।
মানুষটি বললেন, আমাকে একটা পি সি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কম্পিউটারের ডাটা ভরবার জন্য একজন মানুষ চাই। একটু সায়েন্স জানা লোক। আমার তো সময় হয় না।
চয়ন ভাঙা বুক নিয়ে চোখ নামিয়ে রাখল। জবাব দিল না।
জ্ঞানী মানুষটি তার দিকে চেয়ে বললেন, শেখোনি, না?
আজ্ঞে না।
তোমার অ্যাকাডেমিক কোয়ালিফিকেশন কী তা জানি না। তবে শুনেছি তুমি অঙ্ক আর ইংরেজিতে খুবই ভাল। তাই কি?
কাজ চালিয়ে নিতে পারি।
যদি কলকাতা ছেড়ে বাইরে যেতে হয়, পারবে?
পারব।
মাকে কে দেখবো?
মা? বলে চয়ন চোখ তুলে জ্ঞানী মানুষটির দিকে তাকায়। উনি কিছু আন্দাজ করতে পারছেন? উনি কি তার ংসারের ভাগাভাগির কথা জানেন?
হ্যাঁ, মা। তাকে দাদা বাউদি দেখবে?
হয়তো তা দেখবে।
হয়তো কেন? তুমি কি নিশ্চিত নাও?
চয়ন আবার চুপ করে থাকে।
তোমাদের কি ভাগের মা?
চয়ন প্ৰমাদ গোনে।
জ্ঞানী মানুষটি হেসে ওঠেন, আরে লজ্জা কিসের? লজ্জা পাওয়ার দরকার নেই। গল্পটা মোটামুটি একই রকমের। তোমার মা, আমার মা, সব মা এখন ভাগের মা। এখন দেশও ভাগের মা, পৃথিবীও ভাগের মা। এ হল ভাগের যুগ।
যে আজ্ঞে।
টাইপ করতে পারো?
শিখেছিলাম। এখন বোধ হয় স্পীড কমে গেছে।
আর কী জানো?
আর! আর তো কিছু জানি না।
বয়স কত?
ঠিক হিসেব নেই। আঠাশ হতে পারে।
সার্টিফিকেট এজ কত? ওটাই দরকার।
ছাব্বিশ প্লাস।
টিউশনি করে কত পাও?
ছসাতশো টাকা হয়।
আরও বেশী হওয়ার কথা ছিল।
শরীরের জন্য বেশী পেরে উঠি না।
ওঃ, তোমার তো আবার ক্রনিক একটা ট্রাবল আছে।
যে আজ্ঞে।
তুমি আপাতত আমার মেয়েকে আর ছেলেকে পড়াতে থাকো। আমি শুনেছি। তুমি ভাল টিউটর। কিন্তু আমার আরও কিন্তু জানবার আছে।
আজ্ঞে, বলুন।
জ্ঞানী মানুষটি হাসলেন। বললেন, প্রশ্ন করে সেটা হয়তো জানা যাবে না। কিন্তু প্ৰত্যেকটা মানুষের মধ্যেই লুকোনো, অব্যবহৃত কিছু গুণ থেকে যায়। সে হয়তো সারা জীবন নিজের সেই গুণটার কথা জানতেই পারে না। গুণটা থেকেও নষ্ট হয়। তোমার ভিতর সেরকম কিছু আছে কিনা দেখতে হবে। তুমি জানো, তোমার সেরকম কিছু আছে কিনা?
আজ্ঞে না।
তুমি কি কথাটা বিশ্বাস করো?
আপনি যখন বলছেন তখন–
জ্ঞানী মানুষটি প্রশ্রয়ের হাসি হাসলেন, আমার একটা ছোট ভাই আছে, সে খুব মদ খায়, লেখাপড়া শেখেনি, খারাপ খারাপ কথা বলে। কিন্তু তার একটা সাজঘাতিক গুণ আছে। সে মা-বাবাকে ভীষণ ভালবাসে। বাবাকে পাকা বাড়িতে রাখবে বলে ধারকর্জ করে ঘর তুলছে। বাবা-মায়ের যা খেতে ইচ্ছে করে, এনে দেয়। তার অনেক বড় দোষ থাকলেও, ওই একটা গুণে এখনও সে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়নি। ওই ভালবাসা তাকে টগবগে চনমনে রাখে। ভালবাসার এই প্র্যাকটিক্যাল দিকটার কথা কেউ আজকাল ভাবে না, না?
