শরীরটা সারিয়ে নেন না কেন?
এপিলেপিসি কিসারে?
তেমন করে চিকিৎসা করালে নিশ্চয়ই সারে।
তুমি জীবনের ভাল দিকগুলোকেই দেখতে পাও। এ খুব ভাল।
আপনি সবসময়ে কেন একটা হতাশার মধ্যে ড়ুবে থাকেন, মাস্টারমশাই?
চয়ন মাথা নেড়ে বলে, ঠিক হতাশা নয়। সম্পূর্ণ হতাশ হলে তো বেঁচে থাকাই কঠিন হত। মাঝে মাঝে মনে হয়, একটা কোনও অঘটন ঘটে আমার জীবনটা পাল্টে যাবে। বুঝেছো? অঘটনের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনও উপায় খুঁজে পাই না। কিন্তু মানুষের তো চান্স আর প্রোবাবিলিটি ফ্যাক্টরের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। তার দাঁড়ানো উচিত পৌরুষ, আত্মবিশ্বাস আর কঠিন শ্রমের ওপর।
ওসব বড় শক্ত শক্ত কথা।
কাজটা আরও শক্ত। আমি পেরে উঠি না। যেন একটা গর্তের মধ্যে আছি, বেরোতে পারছি না। বেরোলেই পৃথিবীর আলো, হাওয়া, আনন্দকে ছোঁয়া যাবে। কেবল হাঁচোড়-পাঁচোড় করি।
হাঁচোড়-পাঁচোড় কথাটায় খুব হাসল মোহিনী। বলল, এমন ভাব করছেন যেন আপনি প্রতিবন্ধী।
অনেকটা তাই মোহিনী। হাত পা মগজ সব থেকেও কত মানুষ যে ঠিটো জগন্নাথ হয়ে বসে আছে এদেশে!
মাস্টারমশাই, আপনার কনফিডেন্স ভীষণ কম। একটা চাকরি-টা করি। যদি হয়, দেখবেন, আত্মবিশ্বাস ফিরে আসবে।
চাকরির ব্যাপারে মাঝে মাঝে তাকে খোঁচায় মোহিনী, বাবাকে বলুন। আমার বাবার অনেক ক্ষমতা।
কিন্তু ভয় পায় চয়ন। উনি যদি বিরক্ত হন। খুব গভীর চিন্তাশীল মানুষ। ওসব মানুষের সঙ্গে আজেবাজে স্বাৰ্থ নিয়ে কথা বলতে যাওয়া মানেই সিরিয়াস চিন্তার সূত্ৰকে ছিন্ন করে দেওয়া।
মোহিনী নিজেও তার বাবাকে একটু সমীহ করে চলে। তাই সে একদিন বোধ হয় তার মাকে বলেছিল। পরদিন মোহিনীর মা এসে বললেন, চয়ন, সত্যিই তো, তুমি একবার ওঁকে বললেই তো পারো।
চয়ন সসম্ভ্রমে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, যে আজ্ঞে।
আমি ওঁকে একটু বুঝিয়ে বলে রাখবখন। এবার উনি বিদেশ থেকে ফিরলেই একবার বোলো। ওঁকে তো অনেক প্রোজেক্ট থেকে ডাকছে আজকাল। আর শোনো, সামনের মাস থেকে তুমি জিতুটাকেও পড়াও। এতদিন ওর স্কুল থেকে বলেছে যে, প্রাইভেট টিউশন যেন না নেয়। কিন্তু ক্লাস এইট থেকে এত পড়ার চাপ, অঙ্কে তেমন ভাল নম্বর পাচ্ছে না।
এই বিদ্যান্যতায় আরও বিনীত হয়ে পড়ে চয়ন। ভদ্রমহিলা অধ্যাপিকা, স্বামী অধ্যাপক। এদের ছেলেমেয়েদের ইচ্ছে কুর এরা নিজেরাই হয়তো পড়াতে পারেন। চয়নকে বাধা হয়েছে, চয়নের ধারণা, একজন গরীব মানুষকে সাহায্য করার জন্যই।
অবশেষে অবশ্য কৃষ্ণজীবনের মুখোমুখি একদিন হতেই হল তাকে। পড়াতে যেতেই মোহিনী বলল, চয়নদা আজ বাবার সঙ্গে আপনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট। বাবা বেরিয়ে যাবেন, আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান। আসুন।
বিদ্বান ও যশস্বী মানুষটির মুখোমুখি হতে সঙ্কোচে মরে যাচ্ছিল চয়ন। গিয়ে দেখল, আদুর গা, লুঙ্গি পরা উদাসীন মুখের মানুষটি, যতটা না গম্ভীর, তার চেয়েও যেন বেশী বিষণ্ণ।
বোসো।
চয়ন সঙ্কোচে বসল। প্ৰাথমিক পরিচয়ের দরকার ছিল না। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে এই টিউশনির জন্য দরখাস্ত করেছিল চয়ন। তখন ইনি তার ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন।
তার দিকে একটু চেয়ে থেকে কৃষ্ণজীবন একটু হাসলেন, চাকরি চাও?
চমৎকার পেটানো স্বাস্থ্য আর সুদৰ্শন চেহারার মানুষটিকে হাসলে আরও চমৎকার দেখায়। বয়সের কোনও ছাপাই পড়েনি চেহারায়।
চয়ন মৃদুস্বরে বলল, আপনাকে বিরক্ত করার ইচ্ছে ছিল না।
জানি। তুমি খুব লাজুক। আমিও তাই।
চয়ন মাথা নিচু করে থাকল।
কৃষ্ণজীবন তার গম্ভীর গলায় বললেন, বাড়িতে কে কে আছে তোমার?
মা, দাদা আর বউদি।
বাবা নেই?
না।
মাকে কিরকম ভালবাসো? খুব?
একটু অবাক হয়ে চয়ন বলে, বাসি। ভালই বাসি।
কতটা ভালবাসো?
চয়ন অস্বস্তিতে পড়ে গিয়ে আমতা আমতা করে বলে, মা ছাড়া কেই বা আছে!
ওটা জবাব হল না। মা কারও কাছে বোঝা, কারও কাছে মাথার মণি। আজকাল মা-বোপকে ছেলেমেয়েরা তেমন ভালবাসতে পারে না। ফলে কাউকেই পারে না। এটা হল একটা পিকিউলিয়ার লাভলেসনেসের যুগ। লক্ষ করেছে। ব্যাপারটা?
আজ্ঞে, আমি আর কতটুকু দেখেছি!
আজকাল মা বাপ মরলেও ছেলে তেমন কাঁদে না, কেন বলো তো!
চয়ন একটু ভেবে সংকোচের সঙ্গে বলল, আপনি বোধ হয় ঠিকই বলেছেন। আজকাল সেন্টিমেন্টটা যেন কিছু কমে গেছে।
সেটা কি ভাল?
না বোধ হয়। আমার মা কয়েকদিন আগে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। আমার তখন মনে হয়েছিল, মায়ের আর বেঁচে থাকার দরকার কী?
কেন ওরকম মনে হল তোমার?
মা বড্ড কষ্ট পাচ্ছে। শরীরে, মনে।
তোমার সংসারটা বোধ হয় সুখের নয়, না?
চয়ন মাথা নিচু করে রইল।
কৃষ্ণজীবন নামক জ্ঞানী মানুষটি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, সব সংসোরই একটা অন্যটার কারবন কপি। কোনও সংসোরই কেন পিসফুল নয় বলো তো! আন্ডারকারেন্ট, পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ, ঘেন্না, জেলাসি। পরিবার থেকে ওটা ধীরে ধীরে সমাজেও সংক্রামিত হয়ে যায়, তাই না?
চয়ন চুপ করে থাকে। জ্ঞানী মানুষটি তাকে একটা চাকরি দিলেও দিতে পারেন, কিন্তু তার জন্য এই ভালবাসার ধাঁধা কেন? চয়ন বুঝে উঠতে পারল না।
তোমার দাদা মানুষটি কেমন?
ভাল।
বাউদি?
ভাল।
জ্ঞানী মানুষটি হাসলেন। হেসে বললেন, ভাল হলে তো ভালই। কিন্তু তোমার মুখ দেখে মনে হয় তুমি খুব মানসিক প্রেশারে আছো। সত্যি বলছি?
চয়ন মৃদু মাথা নেড়ে জানাল, সত্যি।
কৃষ্ণজীবনবাবু আচমকা তাকে আর একটা বিপদে ফেলে দিয়ে বললেন, চাকরি চাও, না সাকসেসফুল হতে চাও?
