সেই পুরনো সাইকেলটা?
হ্যাঁ। বড্ড পুরনো। ঝা-কুরকুর শব্দ হয়।
তোর নতুন সাইকেল কিনতে ইচ্ছে করে?
করে তো।
তা হলে একটা কিনে নিস। আমি টাকা দিয়ে যাবো।
ইস। না জ্যাঠা, তোমাকে দিতে হবে না।
লজা পেলি নাকি?
পটল একগাল হেসে মাথা নামিয়ে বলে, তুমি কত দিলে সবাইকে, কত টাকা খরচ হয়ে গেল!
তোর বুঝি খুব টাকার হিসেব?
আমরা গরিব যে বড্ড।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কৃষ্ণজীবন বলে, তাও তুই ভাল আছিস। আমার মতো কষ্ট করতে হয়নি।
আমি শুনেছি জ্যাঠা, তুমি না খেয়ে স্কুলে যেতে।
রোজ নয়, মাঝে মাঝে। কষ্ট করা খুব ভাল। মানুষ কষ্ট করতে যত না চায় তত বেশী কষ্ট পায়। আমি এক সময়ে পেট ভরে ভাত খেতে পেতাম না বলেই আজও ভাতে অমৃতের স্বাদ পাই। যারা রোজ ভালমন্দ খেয়ে বড় হয় তারা খাবারের স্বাদই পায় না। কথাটা বুঝলি?
তোমার কথা আমি সব বুঝতে পারি জ্যাঠা।
খুব ভাল। তুই ভাল ছেলে। পরীক্ষায় কিরকম নম্বর পাস?
মোটামুটি।
অঙ্কে?
পঞ্চাশ ষাট।
দূর বোকা। অঙ্কে পাবি নব্বই থেকে একশ। তবে না!
কেউ শেখায় না যে!
কারও দরকার নেই। শুধু ভাববি, আমি পারব। পারব। পারব ভাবতে ভাবতে, বিশ্বাস করতে করতে পেরেও যাবি।
তুমি তাই করতে?
তাই তো। তবে যা পড়বি ভালবেসে পড়বি। যেন নিজের জন্য নয়, অন্যকে শেখানোর জন্য পড়ছিস। তাতে আত্মবিশ্বাস বাড়বে।
জলে কাদায়, আঘাটা দিয়ে, নানা অচেনা পথে বিপথে এই যে ঘুরে বেড়াল কৃষ্ণজীবন এটা যেন তার মিয়মাণ জীবনে সঞ্চার করে দিতে লাগল প্রাণশক্তি। সে একদিন ফিরে আসবেই প্রকৃতির কোলে।
তারা যখন ফিরল। তখন দুপুর। রামজীবন ফিরে এসেছে। তবু বাড়িটা কেমন যেন হাসিখুশি নয়।
ক্লান্ত কৃষ্ণজীবন উঠোন পেরিয়ে দাওয়ায় উঠে মোড়ায় বসল। নয়নতারা একটা হাতপাখ্য নিয়ে কাছে বসে বাতাস করতে লাগল।
কত কী এনেছিস বাবা! এককাড়ি টাকা খরচ হল তো!
তাতেকি মা? কিছু তো দিই না।
দেওয়া তো আছেই। বেঁচে বর্তে থাক, তাতেই আমার হবে।
রেমোকে দেখছি না। কোথায় গেল?
আছে বাবা, দেখবি। আজকের দিনটা মায়ের কাছে থেকে যা না! মায়ে পোয়ে একসঙ্গে একটু গল্প করব। কেমন সাহেব-সাহেব চেহারা হয়ে গেছে তোর। চিনতে পারি না।
সাহেব-সাহেব! কী যে বলো মা!
সত্যি রে। অনেক ফর্সা আর কেমন যেন। আগে যেমন লালমুখো সাহেবদের দেখতাম তেমনই।
রান্নাঘর থেকে খুব রান্নাবান্নার শব্দ আসছে। আয়োজন হচ্ছে বড় করেই বোধ হয়।
চানটা করে আয় বাবা।
পুকুরে যাবো।
নানা, ও পুকুরের জল বড্ড পচে গেছে। কুয়োর জল তুলে দেবেখন পটল।
ঠিক এই সময়ে হঠাৎ ওপাশের ঘর থেকে রামজীবন বেরিয়ে এল। তারপর আর্তনাদ করে উঠল, দাদা!
কৃষ্ণজীবন রামজীবনের দিকে চেয়ে একটু হাসল, আয়।
রামজীবন দাওয়া থেকে লাফ দিয়ে পড়ে ছুটে এল। তারপর দাঁড়াম করে পড়ল কৃষ্ণজীবনের পায়ে।
দাদা রে!
বলে পায়ে মাথা ঘষে কান্দতে লাগল রামজীবন।
কৃষ্ণজীবন তুলতে গেল তাকে। শক্ত হাতেও পারল না।
করছিস কী রেমো?
আমাকে ক্ষমা কর দাদা। আমি কুলাঙ্গার। আমি মহাপাপী। আমি অচ্ছুৎ।
রামজীবন একবার মুখ তুলল। সত্যিকারের চোখের জলে তার মুখ ভেসে যাচ্ছে। তবে সেই চোখের জলের কতটা দাম তা কে বলবে? তার মুখ থেকে কাঁচা মদের গন্ধ আসছে। ভকভক করে।
কৃষ্ণজীবন এইবার বোধ করল তার দীর্ঘ পথ যাওয়া আসার ব্যর্থ পরিশ্রম। আর ক্লান্তি। রামজীবন সম্পূর্ণ মাতাল।
০৩২. মোহিনী অনেকদিন ধরে তাকে বলছে
মোহিনী অনেকদিন ধরে তাকে বলছে, চয়নদা। আপনি বাবাকে একবার বলুন না, বাবা হয়তো আপনাকে একটা চাকরি দিতে পারে।
সে কখনও মোহিনীকে বা আর কাউকে মুখ ফুটে চাকরির কথা বলতে পারেনি। আজও। কিন্তু তার দীনতা, দারিদ্র্য সবই বোধ হয় বিজ্ঞাপিত হয় তার পোশাকে, চেহারায়, আচরণে, চরিত্রে। তার খিদে পেলে মোহিনী ঠিক টের পায়, দৌড়ে গিয়ে মাকে বলে আসে। মোহিনীর মা এক মহান মহিলা। এ বাড়ি থেকে সে কদাচিৎ উপোসি ফিরে গেছে। এদের প্রতি কৃতজ্ঞতায় সে নুয়ে থাকে।
মোহিনীর বাবা কৃষ্ণজীবনকে সামান্যমাত্র চেনে সে। ভদ্রলোক কলকাতায় কমই থাকেন। বছরে দুবার তিনবার বিদেশে যান। তার ওপর আছে ভারতবর্ষের নানা জায়গায় কনফারেন্স। সরকার ঐকে পরিবেশ বিষয়ক উপদেষ্টা নিয়োগ করেছেন। বিদেশে বড় চাকরির লোভনীয় প্রস্তাব আসছে। তিনি যেতে চাইছেন না। কিন্তু কতদিন ঠেকিয়ে রাখতে পারবেন। বিদেশের আকর্ষণীয় আমন্ত্রণ? না, মোহিনীর বাবা হয়তো টাকার লোভে যাবেন না। কিন্তু মস্তিষ্কবান মানুষদের এদেশ ধরে রাখতে পারে কই? টাকার জন্য নয়, কাজের স্বাধীনতা, গবেষণার সুবিধা, অত্যাধুনিক সাজসরঞ্জাম ছাড়া উন্নত গবেষণা তো সম্ভব নয়। আর গবেষণার পিছনে অঢেল টাকা খরচ করার মতো তহবিলও তো এদেশের নেই। সুতরাং মোহিনীর বাবা কতদিন ঠেকিয়ে রাখবেন নিজেকে? চয়ন শুনেছে, তার বাবা সরকারকে যেসব প্রস্তাব দেন তার কোনওটাই কার্যকরী হয় না। কৃষ্ণজীবনবাবু সেই কারণেই কিছু ক্ষুব্ধ।
একদিন চয়ন মোহিনীকে বলেছিল, তোমার বাবা যদি বিদেশে চলে যান, তোমরাও তো তাঁর সঙ্গে চলে যাবে?
আমার তো যেতে একদম ইচ্ছে করে না। কিন্তু যেতে তো হবেই।
তোমাদের খুব মিস করব তাহলে। এত ভাল তোমরা!
মাস্টারমশাই, আপনার আঙ্কে যা মাথা, আর ইংরেজি যা ভাল জানেন, আপনি ইচ্ছে করলেই তো অনেক ডিগ্রি পেতে পারতেন।
মোহিনীর কিছু ঠিক নেই। কখনও ডাকে চয়নদা, কখনও মাস্টারমশাই। চয়ন ম্লান মুখ করে বলে, সকলের সব কিছু হয়ে ওঠে না। ওর জন্য দুঃখ করে লাভ নেই।
