মা তো তোমার সঙ্গে যেতেই বলেছে।
আসি হে পঞ্চা।
আসুন দাদা। আমার সঙ্গে দেখা হলে খবর দিয়ে দেবোখন যে আপনি এসেছেন।
তারপর খেতখামার আর কাদামাটির মধ্যে নেমে পড়ল কৃষ্ণজীবন।
বিষ্টুপুর তোর কেমন লাগে রে পটল?
ভাল লাগে জ্যাঠা। খুব ভাল লাগে।
কেন ভাল লাগে বল তো!
পটল ভাবিত হয়। কেন ভাল লাগে? সত্যিই তো! সে তো জানে বিষ্টুপুরে তেমন কিছু নেই। এ নাকি গরিবদের জায়গা। কিন্তু তার তবু ভাল লাগে যে।
পটল বলল, এমনিতেই বেশ ভাল লাগে। মা আছে, ঠাকুমা আছে, গোপাল আছে, ইস্কুল আছে।
কলকাতায় কবার গেছিস?
দু-তিনবার হবে। তোমার বাড়িতেও তো গেছি জ্যাঠা, তোমার মনে নেই?
আমার সব মনে থাকে। সাততলার বারান্দায় রেলিং-এর ওপর উঠতে গিয়েছিলি বলে বকুনি দিয়েছিলাম।
ফ্ৰাণে কী উঁচুতে তোমরা থাকো। ইচ্ছে করলে তো তোমরা উড়ন্ত ঘুড়ি ধরে ফেলতে পারে, না?
তা পারি।
ধরো না?
না। আমার কি আর তোর বয়স আছে?
আচ্ছা, ভূমিকম্প হলে বাড়িটা পড়ে যাবে না তো!
পড়তেও পারে। বিষ্টুপুর ছেড়ে তোর কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না?
খুব করে। যদি তোমার মতো লেখাপড়া শিখতে পারি। তবে তো! শিখতে পারলে বিলেত যাবো।
এই যে বললি বিষ্টুপুরকে ভালবাসিস, তা হলে বাইরে যাবি কেন?
এখানে কিছু নেই যে! কিলেজ অবধি নেই।
একদিন হবে। গায়ের দুঃখ কী জানিস? যারা ভাল কিছু করে তারা আর গায়ে থাকে না। সবাই বলে, গায়ে কিছু নেই।
তোমার কি বিষ্টুপুর ভাল লাগে জ্যাঠা?
খুব লাগে। গাঁয়ে কিছু নেই, এ কথা ভাববি কেন? গীয়েই তো ভগবানের সম্পদ ছড়িয়ে আছে। গাছ আছে, মাটি আছে, মস্ত আকাশ আছে। আমি তো ভাবি, একদিন কলকাতা ছেড়ে গায়ে চলে আসবো।
আসবে? বিস্মিত পটলের চোখ বিস্ফারিত হয়।
খুব ইচ্ছে করে।
তা হলে কী মজাই না হবে! তুমি এলে আর ছোট জ্যাঠায় আর বাবায় ঝগড়া হবে না, বাবাও মদ খেয়ে গোপালকে মারবে না, আমি তোমার কাছে কত কী শিখতে পারবো।
তুই আম্বেদকরের নাম শুনেছিস?
না তো! কে?
একজন পতিত লোক ছিল। সে বলেছে, আগে আমাদের গাঁগুলো ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ, স্বনির্ভর। মানে জানিস?
ঠিক জানিস তো, নাকি ভয়ে বলছিস?
জানি জ্যাঠা। বইতে আছে।
ভাল। আগে আমাদের গ্রামগুলোতেই সব থাকত, কামার, কুমোর, তাঁতি, জোলা, জেলে, চাষা, কবিরাজ, সব।
গল্পের গন্ধ পেয়ে পটল বলল, হু।
তারপর ইংরেজ এল, রাস্তাঘাট করল, আর বড় বড় কল বসাতে লাগল। গ্রামগুলো জুড়ে ছিল গোটা দেশটার অর্থনীতির সঙ্গে। কী হল তাতে জানিস?
না তো!
বড় বড় কলে কাপড় বোনা হতে লাগল, জিনিস তৈরি হতে লাগল, বিলেত থেকেও আসতে লাগল। তাতে কামারের ব্যবসা মার খেল, তাতি মাথায় হাত দিয়ে বসল। যে ছোট্ট গ্রামখানা একদিন ডগমগ করত তা হারিয়ে গেল বিরাট দেশের অর্থনীতির সঙ্গে একাকার হয়ে। তোর কি বুঝতে শক্ত লাগছে?
না। একটু একটু বুঝতে পারছি।
এখন একটুই বুঝে রাখ। বড় হয়ে ভাল করে বুঝবি। এই যে বিষ্টুপুর, একে তো তুই ভালবাসিস!
খুব বাসি জ্যাঠা।
কী করলে বিষ্টুপুরের ভাল হয় তা জানিস?
না তো!
ভাববি। খুব ভাববি। তোকে ভারতবর্ষ নিয়ে ভাবতে হবে না। শুধু বিষ্টুপুরের যদি ভাল করতে পারিস তা হলেই হবে। ভাবছি বিষ্টুপুরের দারিদ্র্য ঘোচাবে, এখানে তাঁত বসাবো, কামারশালা বসাবো, বিষ্টুপুরের মানুষের তৈরি জিনিসই শুধু বিষ্টুপুরের মানুষ ব্যবহার করবে।
এখন যে সব মনোহারি জিনিস কলকাতা থেকে আসে!
আসবে। কিছু তো আসবেই। কিন্তু যা গায়েই হয় তা বাইরে থেকে আনবি কেন?
তাতে ভাল হবে জ্যাঠা?
তাতেই ভাল হবে। কিন্তু হবে কিনা তা কে জানে! কিন্তু একবার যদি গায়ের মানুষ সবাই মিলে ভাবে আর কাজে নেমে পড়ে তা হলে বেশ হত। পরের মুখ চেয়ে থাকতে হত না।
আম্বেদকর কি এই কথা বলেছেন?
বড় হয়ে পড়িস। বুঝবি। হ্যাঁ, আম্বেদকর বলেছেন। আরও সব বড় বড় লোক এখন বলছেন।
কী বলছেন জ্যাঠা?
বড় বড় কলকারখানা কমিয়ে দিতে। ধরা যদি জাহাজও তৈরি করতে চাস তা হলে তার নানা অংশ তৈরি করার ভার দিয়ে দিলি ছোট ছোট সব কামারশালায়, ছোট ছোট কারিগরদের হাতে। সব যখন তৈরি হল তখন একটা জায়গায় এনে সেগুলো জুড়ে দিলি, এভাবে কত বড় কাজ হয়। কিন্তু এ দেশে তো সেরকম হল না। ইংরেজরা যন্ত্র আনল, আমরা আরও বড় যন্ত্র বানাতে লাগলাম। যন্ত্রে যন্ত্রে দুনিয়াটা ভরে গেল। বাতাস বিষিয়ে গেল। তেল ফুরিয়ে গেল, তোদের জন্য আর পৃথিবীটা তেমন সুন্দর রইল না। তুই বুঝতে পারছিস না, না?
পারছি জ্যাঠা। তুমি বলো না!
বিষ্টুপুর খুব সুন্দর একটা গ্রাম। এটাকে খুব ভালবাসিস।
বাসিই তো জ্যাঠা।
শুধু ভালবাসলে হয় না। যাকে ভালবাসিস তার ভালর জন্য কিছু করতেও হয়। করবি?
করব জ্যাঠা। তুমি বলে দিও কি করতে হবে।
বলব। আমি সবাইকে শেখাতে চাই। সবাইকে বলতে চাই। কেউ শোনে না।
আমি শুনব।
পিপুলপাতিতে পৌঁছতে পাৰ্কা একটি ঘণ্টা লাগল তাদের।
ছোট গ্রাম। খোঁজখবর করতেই একজন চাষী বলল, রামজীবন? হ্যাঁ চিনি। ওই তো বিধুবাবুর বাড়িতে যাতায়াত। ওই সাদা পাকা বাড়ি।
বিধুবাবুর বাড়িতেই খোঁজ পাওয়া গেল। রামজীবন কাল রাতে থেকে গিয়েছিল। খুব জলঝড় হচ্ছিল বলে ফিরতে পারেনি। একটু আগে বেরিয়ে গেছে।
স্বস্তির শ্বাস ফেলল কৃষ্ণজীবন।
পটল!
কী জ্যাঠা?
হেঁটেই ফিরে যাই চল।
চলো না। আমি খুব হাঁটতে পারি।
সাইকেল চালাতে পারিস?
পটল সাইকেলের কথায় টগবগ করে ওঠে। আমি তো সাইকেলের রেস করি। বিষ্টুপুরে কেউ আমার সঙ্গে পারে না।
